একদিন সন্ধ্যায় জমি থেকে ফিরতে ফিরতে আলেফ এসব কথাই ভাবছিলো। আগামীকাল ছেলে কলকাতায় যাবে। তার ডাক্তারি পড়াই স্থির হয়েছে। দূর থেকে মসজিদটাই চোখে পড়লো আলেফের। সে ভাবলো স্বগতোক্তির মতো করে–কেন্ রে, জমি দিছিস, দিছিস; তাই বলে কি তোক ঠকাবো? জমিতে খাটবো-খোটবো, খরচা করবো। ফসল উঠলি নেয্য ভাগ তোক । দিবো। তফাৎ এই, জমিটার সবটু আমার নামে হবি। তোর হক দাবায় কে। ফসলের আদ্দেক যদি তোক না দিছি কইছি কী। তুই ছোটোভাই হয়ে জমি দিবের পারিস আর আমি ফসল দিবের পারি না।
একটা তীব্র চিৎকারের আকস্মিক শব্দে চমকে উঠে আলেফ থেমে দাঁড়ালো। পরক্ষণেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হাসি হাসি মুখে বললো সে নিজেকে শুনিয়ে, কে, আজান দেয় নাকি? খোদার কাছে ডাকতেছে ফকির। দ্যাখো দেখি কাণ্ড!
১৭. নৃপনারায়ণের চিঠি এসেছে
নৃপনারায়ণের চিঠি এসেছে–এ সংবাদটা অনসূয়া পেলেন রূপুর মুখে। এ চিঠি রোজ আসে না। নৃপনারায়ণ বলেছিলো–যে চিঠি অন্য লোকে পড়ে, যার যাওয়া-আসা অন্য কারো মর্জির উপরে নির্ভর করে তার আদান-প্রদান বন্ধ থাক। মা চোখের জল চেপে বলেছিলেন–কোনো পক্ষ অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে এর ব্যতিক্রম করতে হবে।
চিঠির খবরে অনসূয়া বিচলিত হলেন সুতরাং। নৃপ কি রাজরোষমুক্ত হয়ে চিঠি দিতে পেরেছে কিংবা সে কি অসুস্থ? একটি আনন্দের আশা এবং একটি আশঙ্কার দুশ্চিন্তায় তিনি বললেন, তুই তো খুব দুষ্টু হয়েছিস রূপু; কই, চিঠি দে।
‘তোমাকে কী করে দেবো? বউদির চিঠি যে।
ও। অনসূয়া খবরে কাগজের পাতা ওল্টালেন।
রূপু তবু দাঁড়িয়ে রইলো।
অনসূয়া বললেন, আর কিছু বলবি?
দাদা ভালো আছে, মা। নাগপুরের কাছে কোথায় অন্তরীণ হয়ে আছে। বউদি বললেন তোমাকে খবর দিতে।
মনে হলো অনসূয়া কিছু বলার জন্যই মুখ তুললেন, কিন্তু কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, রূপু, রামনন্দনকে একটু ডেকে দিয়ো। মণিমালার বাড়িতে যেতে হবে।
ঘণ্টাখানেক পরে রূপু সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলো–রামনন্দন খাজাঞ্চিখানা থেকে কামদার ঝালর এনে পাল্কির ছাদের উপরে বিছিয়ে দিতে দিতে অন্দর থেকে অনসূয়াও বেরিয়ে এসে পাল্কিতে চড়লেন। রামনন্দন আর তার ছেলে পাল্কির দু পাশে চলতে লাগলো।
মণিমালার বাড়িতে যাবার কথা ছিলো বটে; কথাটা ছিলো রূপুও সঙ্গে যাবে। অনসূয়া রূপুকে বলতেই যেন ভুলে গেলেন।
সদানন্দ মাস্টার সাতদিনের জন্য অন্যত্র গিয়েছে। রূপুকে সে সাত দিন ছুটি দিয়ে গেছে। বিকেলের দিকে রূপু পায়ে পায়ে সুমিতির ঘরে গিয়ে দাঁড়ালো, সুমিতি তখন ব্যালকনিতে বসে একটা সেলাই নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।
এসো, ছোটোবাবু। মা বুঝি নিয়ে গেলেন না?
তা নয় ঠিক। ছুটি আছে, বেড়াতে গেলে ভালোই হতো।
চলো না হয় দুজনে বেরিয়ে পড়ি।
যাবে তাই? যতক্ষণ না পাল্কি ফিরতে দেখি চলতে থাকবো। মার সঙ্গে সঙ্গে ফেরা যাবে।
মন্দ কী, এখানে এসে এসে এ পর্যন্ত বেরুইনি।
আমি আসছি। বলে রূপু চলে গেলো।
প্রস্তাবটা করার সময়ে সুমিতি হাল্কাভাবেই বলেছিলো, কিন্তু রূপু যখন অত তাড়াতাড়ি কথাটাকে কার্যকরী করতে ছুটলো তখন তাকেও কাপড় পাটে প্রস্তুত হতে হলো।
ঘর থেকে বেরুতে সুমিতি বললো, তোমার ভয় ভয় করবে না তো?
আমার? কেন?
আমার একদিন করেছিলো, যেদিন প্রথম গ্রামে আসি। বললো সুমিতি।
রসো, আসছি। বলে কথার মাঝখানে রূপু দৌড়ে চলে গেলো।
রূপু একটি রিভলবার নিয়ে ফিরে এলে সুমিতি বললো, ও কী, ও তুমি চালাতে জানো নাকি?
এটা টিপলেই চললো।
সুমিতি কপট গাম্ভীর্যে বললো, তাহলে তো বড়ো ভালো জিনিস। কিন্তু এ তোমাদের বাড়িতে আছে, এ যে বিশ্বাসই হয় না। আর থাকলেই-বা তুমি পেলে কোথায়?
ফিরে এসে বাবাকে বলবো, তাঁর দেরাজ থেকে নিয়েছি। তখন দেখো তিনি খুশি হবেন। তুমি সঙ্গে আছো বলেই ভাবনা।
তা বটে। সুমিতি গম্ভীর হয়ে রূপুর ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকে ধন্যবাদ দিলো, পরক্ষণেই বললো, কিন্তু কথাটা ভাবো। যার দাদা রাজদ্রোহী বলে অন্তরীণ, তার হাতে রাজা রাখছে বিপ্লবের অস্ত্র। এরাজ্যে এও সম্ভব।
রূপু পরিহাসের সুরটুকু ধরতে পারলেও সহসা উত্তর দিতে পারলো না। তার মনে পড়লো এরকম কথা একবার সে মামার বাড়িতে গিয়েও শুনেছিলো। সেখানে কথা হয়েছিলো-ভাগ্নে বিপ্লব করে বেড়ায় আর মামা করেন রাজ্যরক্ষা। সান্যালমশাইয়ের পরিহাস থেকেই কথাটা উঠেছিলো। সুমিতির পরিহাসটা প্রায় সেরকম বলে ঘটনাটা মনে পড়লো রূপুর। সে বললো, আমার যেন মনে পড়ছে আমাদের বন্দুকগুলোর লাইসেন্স নিয়ে মাঝে মাঝে কী গোলমাল হয়, আর নায়েবমশাই সদরে ছোটেন। তারপরে সব ঠিক হয়ে যায়।
নায়েবমশাই সেখানে গিয়ে কী বলেন তা কি জানো?
অবশ্যই আত্মরক্ষার কথা বলেন।
এমন যদি হয়নায়েবমশাই তোমার দাদার চাল-চলনের সংবাদ দিয়ে তার বিনিময়ে লাইসে ঠিক রাখেন?
তা কখনো হতে পারে?
পারে।নায়েবমশাই জমিদারির কাজে যা সব করেন তার সবগুলো ন্যায়সংগত নয় এ তো তুমিই বলেছো। সুমিতির লুকোনো হাসি রূপুর চোখে ধরা পড়লো না।
তাহলেও–আচ্ছা, আজই আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করবো।
কী সর্বনাশ! লক্ষ্মীভাই!নায়েবমশাই প্রকৃতপক্ষে অতি ভালোমানুষ এতে আর সন্দেহ কী? তার চাইতে এ আমরা কোথায় এলাম তাই বলল। ডান দিকে তো তোমাদের বাগানই চলছে। বাঁদিকে জঙ্গলটা কীসের? আমার মনে হচ্ছে তোমাদের সদর দরজা থেকে চারশ গজের মধ্যে এ জায়গাটায় পৌঁছেও আমার গা শিউরে উঠেছিলো। অবশ্য তখনো সদর দরজা চোখে পড়েনি।
