আলেফ কথাটা সোজাভাবে না নিয়ে বাঁকাভাবে নিলো। সে খানিকটা মেজাজের সঙ্গে বলে বসলো, কেন রে, খুব যে ঠাট্টা করিস। তুই বুকে হাত রেখে কবের পারিস জোলার জমিতে তোর লোভ নাই?
লোভ ছাড়া আমজাদের পয়দা হয় নাই। ইসমাইলের জমির পাট্টা কবুলতি দেখছো?
নাঃ, না দেখেই আমি জমি কিনতাম!
তা তো গিছলাই কিনবের। যদি দেখে থাকো তো আরও খারাপ। ইসমাইল তার ভাবির হক বেদখল করে খাতেছে। সব জমি ইসমাইলের না। তার ভাবীর মামলার ট্যাকা নাই।
জমিদারে তার ভাবির অংশ খাস করে নিয়ে তাকেই পত্তন করছে।
কথাটা ভাবে দেখো বডোভাই। ইসমাইল যে ট্যাকায় পত্তননজর দিলো সে ট্যাকাও তো তার ভাবির।
কোটে প্রমাণ হবি?
অন্য সময়ে এরফান চুপ করে যায় কিন্তু আজ সেও যেন মরিয়ার মতো হয়ে ধরেছে বিষয়টাকে। সে বললো, কও বড়োভাই, কোট বড়ো না হক্-বেহক্ বড়ো?
এবার আলেফ ক্রুদ্ধ হলো। সে বেশ চড়া গলায় বললো, তুই চিরকালই বাগড়া দিবি। বাগড়া দেওয়াই তোর স্বভাব। এর আগেও জমি কিনবের যতবার গিছি বাধা দিছিস। এবার তোর কথা শুনবো মনেও ভাবিস না। তোর কথা শুনলে রহমৎ খন্দকারের জোলা অ্যাদ্দিন আমার হলেও হতো। আলেফ দু হাতের বুড়ো আঙুল তুলে এরফানের মুখের সম্মুখে নেড়ে দিলো। এরফান বললো, ছাওয়াল বাড়িতে, চেঁচায়ো না। আমি তোমাক কহ, বড়োভাই, ছাওয়ালেক পড়াবা, জমি কিনবা, এসব একসঙ্গে সামলাতে পারবা না।
এরফান অপ্রসন্ন মুখে বিদায় নিলো। আলেফও ঝাজের সঙ্গে উঠে তার বাইরের ঘর আর মসজিদের মধ্যের ব্যবধানটুকুতে দ্রুতপদে পায়চারি করে বেড়াতে লাগলো।রাত্রিতে ভালো ঘুম হলো না আলেফের। সকালে উঠে মুখ হাত ধুয়ে বাইরের ঘরের বারান্দায় বসে তামাক খেলো সে। প্রথম তামাকের পর দাওয়া থেকে নেমে একপাক ঘুরে এসে আবার সে তামাক সেজে নিয়ে বসলো। দ্বিতীয়বার তামাক খেয়ে অনেক বেলা হয়েছে স্থির করে সে যখন এরফানের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলো তখন সে বাড়িতে মাত্র দু’একজনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এরফানের বড়োবিবি বোধহয় রাখালকে হুকুম করছিলো গাই বলদ সম্বন্ধে।
আলেফ ডাকলো, এরফান!
রাখাল সাড়া দিতে এলে আলেফ বললো, ডাকাডাকির কাম নি, তামাক সাজে দিয়ে যা।
অতঃপর আলেফ এরফানের দাওয়ায় বসে তামাক খেতে লাগলো।
অনেকটা সময় পরে এরফান এলো। এত সকালে যে?
ইসমাইলের জমি নেওয়ার কাম নি, কী কস?
এরফান উত্তর না দিয়ে মৃদু মৃদু হাসলো।
কলি নে কিছু?
কাল ভাবে দেখলাম জমির লোভ আমারও কম না। আমি চাপে রাখি। তুমি রাখো না। বুঝবের পারি নে; মন কয় নগদ টাকার উপর আমার মায়া বেশি, সেজন্যেই চাপে রাখি। বোকা বোকা মুখ করে এরফান বললো।
আলেফ বললো, তবে যে? তা শোনেক, আমিও কাল ভাবে ঠিক করলাম, ইসমাইলের জমি নেওয়ার কাম নাই। আর নেওয়াই যদি হয় তবে জমির দামই দেবো। দুই সনের ফসলের দাম আগাম দিয়ে এই সনেই জমি খালাস করার কাম নাই। দুই সন জমি আমার নামে যদি থাকে তবে ইসমাইলের ভাবি যা করার করবি। তারপর আর কী?
এরফান বললো, তা করো। ছাওয়ালেক তাইলে কিছু দিবের পারবা।
হয়, যা তুই কস, বাঁধে থোবো। কনে থুবি তাই থুস।
আমি এক কথা কই।
কী কবা আর?
ইসমাইলের জমি আর যে নেয় নিউক, তোমার নেওয়া লাগে না। জোলার জমি চাও আমি জোগাড় করে দিবের পারি। মুখ নিচু করে এরফান বললো।
আবার ফজরেই ঠাট্টা লাগালি?
ঠাট্টা না। কাল বড়োবিবির সঙ্গে কথা কলাম। সেই-ই কলে।
কী কলে?
কয় যে, ইসমাইলের জমি না কিনে সেই দেড় হাজার ভাসুর ছাওয়ালের নামে বাঁধে থুক, তার বদলা–
কী তার বদলা?
তার বদলা আমাদের এজমালি জোলায় আমার অংশ তোমাক দিবো।
অল্-হম্-দলিল্লা!
না। বড়োভাই, ভাবে দেখলাম বড়োবিবির এ বুদ্ধি ভালো। তোমারও জোলায় জমি হলো, ছাওয়ালের ট্যাকাও বাঁধা হলো। কিন্তুক এক শর্ত থাকবি কয়ে দিলাম।
ঠাট্টা করিস কেন্?
ঠাট্টা না। তুমি শর্ত মানলি আমি লিখে-পড়ে দেবো। শর্ত এই–যদি বাঁচে থাকো ছাওয়ালের পড়া বন্ধ করবের পারবা না।
অভিভূত আলেফ নির্বাক হয়ে এরফানের মুখের দিকে চেয়ে রইলো।
কোনো কোনো খবর প্রথমে এমন অভিভূত করে দেয় যে তার সবটুকু মাধুর্য সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করা যায় না। তারপর মাটির তলা থেকে পাওয়া যখের ঘড়ার মতো যত মাজা যায় তত চাদিটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। প্রথম দুদিন আলেফকে বিশ্বাস করার জন্য চেষ্টা করতে হলো। হেলাফেলার জিনিস নয়, পৈতৃক, জোলার জমি। এরফানের মনেও যে জমির লোভ আছে, এ কথা সে নিজেই বলেছে অকপটে। কীসের জোরে এমন দানটা করা যায় আলেফ ভেবে পেলো। না। ছেলেকে টাকা দেওয়াই যদি উদ্দেশ্য হলো জোলার জমিটুকুর স্বামিত্ব ত্যাগ না করে নগদ টাকাই সে দিতে পারতো। এ যেন বাধা দিয়ে দিয়ে আলেফের জমি কেনার সুযোগ নষ্ট করার খেসারত দেওয়া। এ যেন দেখিয়ে দেওয়া, বড়োভাই, জমিতে লোভ ছাড়তে বলেছি তোমাক, লোভ ছাড়তে এই দ্যাখো আমি পারি।
জমি কেনার ব্যাপার নিয়ে এ পর্যন্ত আলেফের যত কথা হয়েছে সে সবই একসঙ্গে মনে পড়লো। যোগ-বিয়োগ করে ফলে আলেফের লাভই দাঁড়িয়েছে। বিনা টাকায় জোলার সবচাইতে ভালো জায়গায় জমি হয়েছে তার।রহম খন্দকারের অভিসম্পাত লাগেনি,হাজিসাহেবের কাছে। মুখ ছোটো হয়নি, আর চিকন্দির ছেলেরা গান বাঁধেনি তার নামে। ভাবো দেখি যদি ওরা গান বাঁধতো আর সে গান শুনতো ছেলে!
