এরফানের বড়োবিবি ফিসফিস করে বললো, আমি পারবো নে।
আচ্ছা তুমি জোগাড় করে নাও, আমি যাচ্ছি।
কী করবা? আলেফ প্রশ্ন করলো।
চা।
আলেফ চাকরির সময়ে মাঝে মাঝে চা খেতে বটে। রাত জেগে কাজ করতে হতো, তখন মাঝে মাঝে দোকান থেকে আনিয়ে নিতো। এখনো সদরে মামলা করতে গেলে পথের ধারের ছোটো একটা দোকানে বসে সে খায় কখনো কখনো। তাই বলে নিজের বাড়িতে? এ যেন সাহেবের বাড়ি হতে চললো। একটু ইতস্তত করে সে বললো, আমাকেও একটু দিয়ে।
এরফানের বড়োবিবি চা করতে উঠে গেলে ছেলে বললো, একটা অন্যায় করে ফেলেছি, বাজান।
কী অধম্ম করলা?
অধর্ম নয়, এটা কিনেছি, দাম দেওয়া হয়নি। এবার ফিরে গিয়ে দিতে হবে।
কতকের?
এটা পুরনো। যার কাছে শিখছি এটা তারই জিনিস। সামান্য দাম ধরে দিলেই হবে।
তাও কত?
সত্তর-আশি টাকা দিলেই হবে।
হঠাৎ আলেফ বুক চিতিয়ে দেওয়ার মতো সুরে বললো, তোর যত লাগে নিয়ে যাস। ট্যাকা, ট্যাকা তো মানুষের সুখের জন্যি। তুই কষ্ট করে পড়িস, আর তোর বাপ বুঝি বসে থাকে!
.
চার-পাঁচ দিন পরে এরফান বাড়ি আছোবলে এরফানের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো আলেফ।
বড়োভাই যে!
হয়, তামুক খাও।
তামাক পুড়তে পুড়তে ফুর্সির নলটা যখন গরম হয়ে উঠলো, তখন আলেফ নিজের মনে একটু হেসে নিয়ে বললো, এক কেচ্ছা জানো? এক ছাওয়ালেক তো তার বাপ টাকা খরচ করে পড়ায়। ছাওয়াল পড়া শেষ করে ডিটি হল। ঢাকার লবাব-বাড়ির এক মিয়েক বিয়ে করে শহরে থাকে। এদিকে ছাওয়ালের মায়ের কান্নায় বাড়ি টেকা যায় না। না থাকতি পারে বাপ গেলো শহরে ছাওয়ালের খবর করবের এক ধামি চিড়ে আর এক হাঁড়ি খেজুরের গুড় নিয়ে।
গল্পটি এরফানেরও জানা ছিলো, সেও যোগ দিয়ে বললো, ছাওয়াল কলে বউকে-বাজান বাড়ি থিকে চাকর পাঠাইছে।
দুজনেই হাসলো। এরফান বললো, ছাওয়াল কলে নাকি কিছু?
কবি কি ছাওয়াল? আমি তোমাকে কতে আলাম, যায়ো সন্ধ্যায় আমার ওখানে।
মেঠাই খাওয়াবা বুঝি?
তা খাও না কেন্ একদিন।
আসলে আলেফ ছেলের বিষয়ে পরামর্শ করতে গিয়েছিলো, কিন্তু দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারলো না। সন্ধ্যায় এরফান এলে আলেফ বললো দু’একটা সাধারণ আলাপের পর, ছাওয়ালের কী করবা ভাবছো?
কী ভাবি কও? ছাওয়ালের দুই চাচী ভাবে। ছোটোচাচীকয় ছাওয়াল গাডের চাকরি করুক। সে চাকরিতে এখন তো পয়সা আছেই। পরে আরও অনেক হবি। তার দাদা নাকি তাক কইছে। বড়োচাচীকয় ছাওয়াল ডাক্তার হবের চায়, হোক না কেন। লোকের প্রাণ বাঁচাবি। লোকে দোয়া দিবি।
তুমি নিজে কী কও?
ডাক্তার হওয়া খারাপ না।
ছাওয়াল নিজেও ডাক্তার হবের চায়। ইন্টাব্যুনা কী যে দিয়ে আসছে। কেবেলে পড়বি। আমিও কই পড়ুক।
ভালো। বংশের এক ছাওয়াল পড়ুক না কেন্। এরফান বললো।
তাই কও। ডাক্তার সৈয়দ সাদেক আলি নাম ভালোই শুনতে হবি।
কিন্তুক সবদিকে ভাবে দেখছো? নগদ টাকার কথা ভাবছো?
সে আর কত?
কত না, ঢের। মাসে মাসে সত্তুর-আশি টাকা করে দিতে হবি। সেখানে তো মামুর বাড়ি নাই। হোটেলে থাকা লাগবি।
আলেফ চিন্তা করলো, সেই অবসরে এরফান বললো, আদ্দেক পড়ায়ে থামলিও চলবি নে। ধরো যে চার-পাঁচ বছর একনাগাড়ে পত্তি মাসে ওই টাকা দিবের হবি। আদ্দেক পড়ায়ে থামলি । ছাওয়াল নষ্ট, ট্যাকাও গুনাগার।
আলেফ গুম হয়ে বসে রইলো।
এরফান আবার বললো, আমি ভাবছি ছাওয়ালেক যদি পড়বের পাঠাও অন্তত এক বছরের টাকা বাঁধে নিয়ে কামে হাত দেও। সে টাকায় ঠেকা না হলে হাত দেবা না, তারপরেও পত্তি মাসে টাকা পাঠাবা জোগাড় করে। আর-এক কথা, মানুষের পরমাইনা কবরখানার চেরাগ। কবে আছি কবে নাই। টাকা তোমার ঠিক করে রাখা লাগে। বাপচাচা নাই, পড়লাম না, এ যেন না হয়।
এরফানের যুক্তি অখণ্ডনীয়। এ তো বড়োমানুষের সখ করে চলা নয়, কৃষকের ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগোনো। ধানের সুগন্ধে যাদের মাথা ঘুরে যায় তেমন কৃষক নয় অবশ্য, ক্ষেত মজুরের থেকে ক্রমোন্নতিতে যারা ভূস্বামী হয় তাদের মতো পাকা চাল যেন এরফানের।
কথা কলে না?
এক বছরের ট্যাকা ধরো হাজারের কাছে।
তা হবি।
সোভানাল্লা!
কেন্, হাজার টাকা কি তোমার নাই?
কিন্তু মানুষের তো অন্য কাম আছে। তা ছাড়া পত্তি মাসেও তো পেরায় একশ। পত্তি বছরেই ধরো যে হাজার।
তা তো হিসাবেই পাওয়া যায়।
ইন্সেআল্লা!
আমিও তাই কই। বুড়া হলে খোদাতালাক ডাকো। আহিঙে কমাও। দেখো ছাওয়ালেক পড়ান কঠিন হবি নে।
তুই দিনরাত আহিঙের কথা কস। কী আমার আহিঙে দেখলি? আমি পত্তি বছরে নতুন বিবি আনতিছি, না ঘোড়া কিনতিছি?
সে সব কথা কই নাই, বড়োভাই। তুমি ইসমাইলেক আগের জুম্মাবারে জোলার জমির বায়না দিবের চাইছে। ধরো যে সেখানে তোমার দেড় হাজার খরচ। তাতে তোমার দুর্ভাবনা নাই, ছাওয়ালের পড়ার খরচে এক হাজার বাঁধবের কলাম তো মুখ হাঁড়ি করলা।
ইসমাইল?
হয়, ইসমাইল! জোলার জমি বেচার খবর দিতে আসছিলো।
তারপর?
তারপর আর কী। ভাবছিলো বোধায় দু’এক টাকা দাম চড়ালেও চড়াতে পারি।
তার পাছে? আলেফ ভ্রূকুটি করলো।
এরফান হেসে বললো, তোমার বড়ো সন্দেহ বাতিক বড়োভাই। ইসমাইলের কথা সেজন্যিই আমাক কও নাই। ভাবছিলা ভাগ বসাবো। তা আমি তাক কলাম চরনকাশির বড়োসেখ যা কইছে তার থিকে বিঘা প্রতি দশ টাকা কম দাম ধাইরয্য থাকলো ছোটোসেখের। শুনে ইসমাইল হাসতে লাগলো।
