ভোর হচ্ছে তখন, মাধাই বললো, একটু জল দে, খাই।
সুরতুন জল এনে দিলো।
আরো জল দে।
দ্বিতীয়বার জল এনে দিয়ে সুরতুন বললো, কেন বায়েন, জ্বর আসছে?
মাধাই কথা বললো না, ক্লিষ্টমুখে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, একটা কিছু দে, পরি।
সুরতুন দড়ি থেকে মাধাইয়ের একটা কাপড় এনে দিলো। মাধাই বিছানায় বসে জামা খুললো, জুতো খুললো, কাপড় পাটে বিছানায় শুয়ে পড়ে চোখ বুজলো।কিন্তু অস্বস্তি গেলো না, এপাশ ওপাশ করতে লাগলো সে, তার কপালে বিনবিন করে ঘাম ফুটে উঠলো। সুরতুনের মনে হলো ঘামের জন্য মাধাইয়ের কষ্ট হচ্ছে কিন্তু দড়ির আলনা থেকে গামছা নিয়ে এসেও ঘাম মুছিয়ে দিতে সাহস পেলো না। মাধাই একবার তার লাল টকটকে চোখ মেলে সুরতুনকে খানিকটা সময় দেখলো। সে দৃষ্টিতে অনুভূতির কোনো চিহ্ন ছিলো না। কিন্তু হাত বাড়িয়ে সুরতুনের একখানা হাত টেনে নিয়ে নিজের কপালের উপরে রেখে আবার সে চোখ বুজলো।
দুপুর গড়িয়ে গেলে মাধাই উঠে বসে ডাকলো, সুরো রে।
কী কও, বায়েন?
বেলা পড়ছে?
তা পড়লো।
কেউ আসছিলো?
না। আপনে কিছু খালে না বায়েন?
না। মনে কয় জ্বর আসছে। তুই কি খাওয়া দাওয়া করছিস? তাই কর গা। সাঁঝের আগে ডাকে দিস। মাধাই আবার শুয়ে পড়লো।
সুরতুন বারান্দায় এসে চুপ করে বসলো। দুপুরের রোদে পুড়ে আসছে বটে বাতাসটা, তবু মিষ্টি লাগলো। সে এই প্রথম অনুভব করলো তার চোখ দুটি জ্বলে যাচ্ছে।
মাধাই তাকে আহারাদি করতে বলে দিয়েছে। আহারের প্রয়োজন নিজেও সে অনুভব করছিলো, কিন্তু মাধাইকে একা রেখে যেতেও মন সরলো না। তার কী প্রয়োজন তা কিছুই সে বুঝতে পারছে না। হয়তো তার শিয়রে বসে তার কপালে হাতটা রাখা উচিত ছিলো। এখন কি সে যাবে? না, এখন আর যাওয়া যায় না।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে সুরতুনের মনে হলো ঘরের মধ্যে মাধাই চলে বেড়াচ্ছে। মাধাইও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, জাগছিস?
শরীর ভালো বায়েন?
হয়।
ডিটিতে যান?
হয়। সি দেবো। ছুটি নিবো। মনে কয় কাল থিকে তুইও খাস নাই।
কুণ্ঠিত বোধ করে সুরতুন মুখ নামিয়ে নিলো।
মাধাই ছুটি নিয়ে ফিরে এলে কী ব্যবস্থা হবে, কী করা সম্ভব হবে তার পক্ষে এ সব ভাবতে লাগলো সে। ঘটনাটা কোনদিকে গড়াতে পারতো এ অবস্থায় তার আলোচনার দরকার আছে বলে মনে হয় না। কারণ মাধই চলে যেতে যেতে ফতেমা এলো।
কী হইছে রে বায়েনের?
তবে তুমি খবর পাইছিলা?
হয়। বায়েন কেমন?
এখন মনে কয় ভালোই আছে। পরশু রাত, কাল সারাদিন রাত কী যে তার হলে বুঝবের পারি নাই।
অনেকক্ষণ ধরে ফতেমা সুরতুনকে মাধাই সম্বন্ধে প্রশ্ন করলো।
মাধাই ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরে দেখলো ফতেমা বসে আছে, সুরতুন নেই। মৃদু হেসে সে বললো, কাল যাক দেখছিলাম সে ফতেমা, না, সুরো?
ফতেমা বললো, সুরোক বাজারে পাঠাইছি। খাতে হবি তো। একটু থেমে সে প্রশ্ন করলো, অসুখ করেছে ভাই?
মাধাই মাথা নাড়লো। কিন্তু সুরো ধরতে না পারলেও ফতেমার চোখে ধরা পড়ে গেলো–মাধাইয়ের চোখ দুটি তখনো লাল, মাথার চুলগুলো বিশৃঙ্খল, চোখ-মুখ বসে গেছে। ফতেমা তার কথায় নিবৃত্ত হলো না; মাধাই ঘরে ঢুকে বিছানায় বসেছিলো, সে এগিয়ে গিয়ে তার চুলে হাত রাখলো, না ভাই, অসুখ তোমার করেছে।
কিন্তু শুধু অসুখই নয়তো, ফতেমা এবার আরও লক্ষ্য করলো মাধাইয়ের পায়ের একটা আঙুলে ন্যাকড়া জড়িয়ে বাঁধা, কপালের বাঁ পাশটা তামাটে রঙের হয়ে ফুলে আছে। সে আকুল হয়ে উঠলো, কান্নাকাতর স্বরে বললো, কিও সোনাভাই, কী হয়েছে তোমার?
তার সোহাগের স্বরে মাধাইয়ের অপূর্ব অনুভূতি হলো। রেল হাসপাতাল থেকে সদ্য ব্যান্ডেজ বাঁধা নিজের পায়ের দিকে একবার, আর একবার ফতেমার মুখের দিকে চেয়ে ছেলেমানুষি স্বরে বললো সে, অন্যাই করছি। নেশা করছিলাম।
নেশা তো বেটাছাওয়াল করেই, অন্যাই কু করছে। প্রবোধ দিলো ফতেমা, কিন্তুক এমন করে নেশা করবের নাই। দ্যাখো তো পায়ের কী দুর্গতি করছো!
মাধাইয়ের মুখ অত্যন্ত বোকা বোকা দেখালো।
ফতেমা আবার হাসলো, বললো, তা হঠাৎ নেশা করলা কেন্?
মাধাইয়ের মন খালি করে কথা বলতে ইচ্ছা হলো। একটু ইতস্তত করে সে বললো, ভালো ঠেকে না। কেমন যেন একা একা লাগে।
ফতেমা খানিকটা সময় ভাবলো কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পেলো না। একটু থেমে সে বললো, আমি রান্নার জোগাড় করি, তুমি ছান করে আসো। শরীর সুস্থ হবি। চা না কী খাও, তা খাইছো?
ফতেমা নিজে থেকে মাধাইয়ের র্যাশানের ঝোলা খুঁজে চাল বার করলো। কুলোয় করে চাল নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বাছতে বসলো।
ঘরের মধ্যে কিছুকাল খুটখাট করে, জামা খুলে মাধাইও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। ফতেমা তাকে আসতে দেখে চোখের দৃষ্টিতে স্বাগত করলো, মুখেও বললো, আসো।
তোমার সাথে কথা কওয়ার জন্যি আলাম।
আসবাই তো। বোসো। জিরাও।
ফতেমা মুখ নিচু করে পটু হাতে চালের ধান কাঁকর বেছে ফেলতে লাগলো, মাধাই খুঁটিতে হেলান দিয়ে অন্যমনস্কভাবে কাজ দেখতে লাগলো তার।
ফতেমা বললো, বিড়ি খালে না, সোনাভাই?
মাধাই বিড়ি ধরালো। বিড়ি ধরানোর পর বিস্ময় বোধ হলো তার। বাড়িতে অভ্যাগত এলে পুরুষের পক্ষে এরকম অনুরোধ করা স্বাভাবিক, কিন্তু ফতেমা কোথায় শিখলো এমন করে বলতে? টেপির মা নিজে বিড়ি খায় বলে তার মুখে এটা কতক মানাতো। কিন্তু ফতেমা তো বিড়ি খায় না।
