সুরতুন ভয়ে ভয়ে বলেছিলো, ভাবি, ভাবি, তুমি কি মরে যাবা?
সুরতুন ভেবেছিলো–যা এতদিনের মধ্যে একদিনও ঘটেনি সেটা এমন আকস্মিকভাবে আজ ঘটলো কেন? ইয়াকুবের জন্য ফতেমার অন্তরটা এত কাতর এ বুঝবার কোনো উপায়ই ছিলো না।
পরে ফতেমা বলেছিলো, যাবো মোকামে, কিন্তু এখন সেখানে ধানের দাম চড়া। কয়দিন যাক।
কিন্তুক বসে বসে কয়দিন খাবো? লাভের ট্যাকা শেষ হবি, চাল কেনাবেচার ট্যাকা থাকবি নে।
তা ঠিক।
তবুও ফতেমার এই নিষ্ক্রিয়তার যুক্তি খুঁজে পায় না সুরতুন। মানসিক ক্লান্তির সঙ্গে তার পরিচয় নেই যে সেটা ফতেমাতে আরোপ করবে। ফতেমাই বরং উৎসাহের আকর। ফুলটুসির ছেলে দুটিকে সে যেভাবে আদর করে দিঘায় গেলে, তাতে মনে হয় না পৃথিবীতে তার কিছুমাত্র দুঃখ আছে। ভাবো দেখি,শুধু আম্মা বলে ডাকা নয়, ফুলটুসির ছোটোছেলে ফতেমার বুকের কাপড় সরিয়ে তার বন্ধ্যা স্তনে মুখ ঘষতে থাকে। এর আর-একটি দিকও আছে। প্রতিবারই যাওয়া-আসার পথে ফুলটুসির ছেলে দুটিকে রান্না করে খাওয়ায় ফতেমা। অর্থব্যয় হয়। সুরতুন একদিন এ কথা উত্থাপন করায় ফতেমা বরং বলেছিলো, যতদিন ব্যবসা চলে ভাবনা কী।
সাহস সংগ্রহে বাধ্য হয়ে সুরতুন একদিন দিঘায় এলো একা একা। সে আশা করেছিলো টেপির মায়ের খোঁজ পাওয়া যাবে। তা গেলো না, কিন্তু বন্দরের পূর্বপরিচিত এক মহাজনের আড়তে একটা কাজ জোগাড় হলো। সকাল থেকে কাজ আরম্ভ-মহাজনের গুদামঘরে নিভৃততম অংশে বসে কেরোসিন কুপির স্বল্প আলোয় বস্তাপচা চাল থেকে পোকা ঝেড়ে ফেলার কাজ। দু’বেলা খাবার জন্য ওই চাল থেকেই কিছু কিছু পায় সে। যদি সে এক মাস কাজ করে, আর এক মাস কাজ থাকে, তবে নগদ তিনটে টাকাও পাবে।
দিনের বেলায় বাজারের বটতলায় সে রান্না করে। সে এ বিষয়ে একা নয়। বটগাছটার আর এক দিকে একটি সংসার আছে। একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত কৃষক, তার স্ত্রী, একটি শিশু ও একটি বুড়ি। এত দুঃখেও এরা একসঙ্গে আছে।
কিন্তু রাত্রির আশ্রয় নিয়েই হচ্ছে মুশকিল। বটতলায় একা একা রাত কাটাতে তার সাহস হয় না। মাধাইয়ের ঘরের বারান্দা আছে, কিন্তু সে ঘর থেকে মহাজনের আড়ত প্রায় এক ক্রোশ পথ, সন্ধ্যার পরে আড়ত থেকে বেরিয়ে পৌঁছতে রাত হয়ে যায়। যে পথটায় অনেক রাত পর্যন্ত আলো থাকে ছোটো ছোটো দোকানগুলিতে, স্বভাবতই সুরতুন সেটাকে বেছে নিয়েছিলো। কিন্তু দিনেক দু’দিনে সে ভুল বুঝতে পারলো। প্রথম দিনেই সে যে বিপন্ন হয়নি, এ তার ভাগ্য বলে মনে হলো। পথটা শহরের কুৎসিত পল্লীর প্রান্ত দিয়ে গেছে। একটা সুফল হয়েছে–জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খানাখন্দ বেয়ে চলা জনমানব পরিত্যক্ত একটা পথ সে খুঁজে পেয়েছে। রাত্রিতে আন্দাজে হাতড়ে একলা একলা পথ চলতে গায়ে কাঁটা দেয়। উপায় কী, এই ভাবে সুরতুন–এ পথে মানুষ অন্তত নেই।
মাধাইয়ের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয় না। দৈবাৎ দেখা হলে মাধাই অভ্যাসমতো বলে, কী খবর, কবে আসলে? কিন্তু উত্তর শোনার জন্য দাঁড়ায় না। একদা সুরতুনকে পাশে বসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মাধাই গল্প করেছিলো ভোর রাত্রির অস্পষ্ট অন্ধকারে, সেটা যে ব্যতিক্রম তা সুরতুনও জানে। বিনা প্রয়োজনে এর আগে সে অনেক কথা সুরতুনদের সঙ্গে বলেনি, তারা নিজে থেকে প্রশ্ন করলে উত্তর দিয়েছে। তবু এরই মধ্যে কিছু একটা সুরতুন অনুভবও করলো। বন্দরে গিয়ে কাজ শুরু করার আগে একবার, দুপুরের পরে রান্না করতে এসে আর একবার সে গ্রামের লোকদের খোঁজ নিলো একদিন। চেনা চেনা লাগলো একজনকে। তাকে জিজ্ঞাসা করতেই সে বললো–সে চিকন্দির লোক, ঘাস বিক্রি করতে এসেছে। সুরতুন তাকে বলে দিলো সে যেন চিকন্দি যাওয়ার পথে বুধেডাঙায় দাঁড়িয়ে রজব আলি সান্দারের বেটাবউ ফতেমাকে বলে যায়, মাধাই রাগ করেছে, সে যেন আসে। এ খবর পেয়েও ফতেমা আসেনি, এবংনা আসায় একরকম ভালোই হয়েছে, হয়তো মাধাই রাগ করেনি, ফতেমার কাছে আর একবার সে নির্বোধ প্রতিপন্ন হতো। এই ভেবেছে সুরতুন।
মহাজনের গুদামে চালের কাজ তিন সপ্তাহে শেষ হয়ে গেছে। সে আবার একেবারে বেকার বসে। সমস্তদিন সে মোকামের অন্য কোনো যাত্রী আছে কিনা তার খোঁজখবর নিয়ে কাটিয়েছে। এদের মধ্যে দু’একজন বলেছে, তারাও আবার মোকামে যাবো যাবো করছে। অন্যান্য দিনের চাইতে কিছু আগে সুরতুন মাধাইয়ের বারান্দায় এসে বসেছিলো। মাধাইয়ের অনুমতি নেওয়া দরকার।
সন্ধ্যার পরই মাধাই এলো কিন্তু তাকে লক্ষ্য করলো না। বারান্দার অন্যপাশে বসে সে আপন মনে একটা বোতল থেকে কী খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে উঠে মাধাই ঘরের মধ্যে চলে গেলো। ঘরের দরজা খোলা রইলো। আরও কিছুক্ষণ পরে শিশি বোতল পড়ার মতো কীসের একটা শব্দ হলো, তারপর একটা ভারীনরম জিনিস পড়ার শব্দ হলো। সুরতুন সন্তর্পণে উঠে দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলো মাধাই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার প্রাণের মূল দেশটা শূন্য হয়ে গেলো। সে ঘরে ঢুকে আবার তেমনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো। হায়, হায়, কী করতে পারে সে। নিজের সমস্ত চিন্তাশক্তি একাগ্র করেও সে প্রতিকারের কোনো পথ খুঁজে পেলো না। অথচ মাধাইকে সাহায্য করার জন্য তার সমস্ত প্রাণ ব্যথিত হয়ে উঠেছে। সে এগিয়ে গিয়ে মাধাইয়ের শিয়রের কাছে বসে মৃদুস্বরে ডাকতে লাগলো, ভাই, বায়েন। কিন্তু মাধাইকে স্পর্শ করার সাহস সে কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারলো না, উঠে এসে তার পায়ের কাছে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। এমনি করে প্রায় সারাটা রাত কাটলো। একবার মাত্র দুলুনি এসেছিলো তার, সঙ্গে সঙ্গে নিজের তিরস্কারে সে খাড়া হয়ে বসলো। শেষ রাতের দিকে মাধাই পাশ ফিরে শুলো। সুরতুনের মুখে একটা ক্ষীণ আনন্দ ফুটে উঠলো।
