রমজান ভীত হলো না।
এরপরে ইয়াকুব এবং ফতেমা জেবু ও রমজানের জন্য একখানা ঘর তুলে দিয়েছিলো। বাঁশঝাড় থেকে কুড়িয়ে-আনা কঞ্চি এবং নদীতীর থেকে সংগ্রহ করা কাশ দিয়ে দেখ-দেখ করে ঘর উঠলো একখানা। বেল্লালের বাড়ির বুড়োকুকুরটা যৌতুকের মতো জেবুর সঙ্গে এসেলিল।
কিন্তু দুর্ভিক্ষের প্রথম পদসঞ্চারে জেবু ও রমজানের মৃত্যু হলো। ডুবন্ত অবস্থায় তারা পরস্পরকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো।
ফতেমার ব্যাপার চিন্তা করতে গিয়েই সুরতুনের এত কথা মনে পড়েছে। ফতেমা জেবুনয়। অনেক অভিজ্ঞতা সে অর্জন করেছে এই জীবনে, কিন্তু তবু এবার ধান কাটার দিনে ফতেমার পায়ের তলা থেকে শক্ত মাটি যেন সরে-সরে যেতে লাগলো। এ বিষয় নিয়ে সুরতুন ফতেমার সঙ্গে আলোচনাও করেনি। কিন্তু একসময়ে সুরতুন স্থির করেছিলো ফতেমা যদি তার সঙ্গে চলেও যায় তবুও ফতেমা উধাও হয়ে যাওয়ার এক মুহূর্ত আগেও এ ব্যাপারটির কথা কারো কাছে সে বলবে না।
সেই লোকটির মতো কাউকে এ অঞ্চলে চোখে পড়ে । সে যেন সান্যালবাড়ির কেউ, এমনি তার গায়ের রং। আর তার চোখ দুটি অবিস্মরণীয়।নীল চোখ,নীলের মধ্যে যেন পাটকিলে রঙের আঁশ। তার চোখের দিকে চোখ পড়লেই মনে হতো, রোজ যাদের দেখা যায় এ যেন তাদের কেউ নয়। ধান কাটতে এসেছিলো। নিতান্ত দরিদ্র ভূমিহীনদের একজন। এদিকের চলিত প্রথা অনুসারে বুধেডাঙার এই বাড়িটাতে দু কাঠা ধান দেওয়ার কড়ারে ধান কাটার দিন পনেরো থাকবে এই ব্যবস্থা হয়েছিলো।
এদিকে সুরতুনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো ফতেমা নিজেই, কথা দিয়ে নয়, কাজে। একটা রঙিন তফন কিনে এনে সে সুরতুনের হাতে দিয়ে বলেছিলো–বাঙালেক ডি । দিশেহারা না হলে এমন দয়া আসে না মনে।
চলে যাওয়ার সময় হলে সে লোকটি বললো–আমি আবার আসবো।
ফতেমা ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো। খানিকটা চিড়ে-গুড় একটা ছোটো পুটুলিতে বেঁধে এনে লোকটির সম্মুখে রেখে এই কথাটা সে শুনতে পেলো। অদ্ভুত একরকম নিঃশব্দ হাসিতে আচ্ছন্ন হয়ে ফতেমা বললোতা আসবের হবে কেন্ যদি কাজ না থাকে?
ইয়াজ বললো–আপনে ঘাটে যান মোসাহেব। আপনের ধানের বস্তাগুলো আমি দিয়ে আসতেছি।
রজব আলি লোকটার সঙ্গে গল্প করতে করতে পদ্মার ঘাটে যেখানে লোকটির দলের নৌকাটা বাঁধা ছিলো সেখানে গিয়েছিলো।
বাড়ির সকলেই যেন লোকটির গুণে মুগ্ধ হয়েই তাকে সমাদর করতে লাগলো।
তফাত এই, ভাবলো সুরতুন, একটা সংসারকে যে চালায়, বহন করে, ধরে রেখেছে, সেই ফতেমা জেবুর মতো হাহাকার করতে পারে না, অনুশোচনাতেও ভেঙে পড়ে না। অন্য কথায়, অর্ধেক ভেঙে ভেঙে পড়তে পড়তে কোনো কোনো গাছ যেমন কোনো গোপন শিকড়ের জোরে সামলে নেয় ফতেমা যেন তেমন কিছু করেছে।
কিন্তু ‘হা অন্ন’ ‘হা অন্ন’ করাই যেন যথেষ্ট কষ্ট নয়, তাই এ বেদনাও মানুষকে সইতে হয়।
.
এখন ইয়াজ বুঝতে পেরেছে, সুরতুন ও ফতেমা একই যৌথ কারবারের অংশীদারের মতো পাশাপাশি চললেও সুরতুন যেন কোনো কোনো ব্যাপারে এখনো সংকুচিত। ইয়াজের উপার্জনের কিছুমাত্র তার ব্যবহারে লেগেছে, এ ভাবতে গিয়ে যেন সেকুণ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে সে এই পরিবারের কেউ নয় এ ভাবটি তার এতদিনেও যায়নি। ইয়াজের ইচ্ছা হয় সে সুরতুনের মনোভাব দূর করবে। তার ইচ্ছাটা হয় এবং সে অনেক সময়ে বলে, কী ভাবো সুরো?
এবং সে দিঘায় গেলে সময়ের একান্ত অভাব না হলে মাধাইয়ের খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। মাধাই এবং সুরতুনের মধ্যে একটি যোগাযোগ স্থাপন করার ব্যাপারে সে ক্রমশই উৎসাহিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু কাজে ডুবে থাকতে হয় তাকে, কাজেই সব সময়ে সুরতুনের অন্তরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করতে সে পারে না। তবু বাল্যে আকাশের মেঘ দেখে যেমন কৌতূহল হতো তার, তেমনি হয় সুরতুনকে নিঃশব্দে আঙিনায় চলে-ফিরে বেড়াতে দেখলে।
এরকম মনোভাব থেকেই একদিন ইয়াজ রজব আলিকে জিজ্ঞাসা করলো,কে,নানা, সুরো তোমার ভাইয়ের বিটি, তাক বিয়া দিবা না?
নতুবা এমন অভিভাবকসুলভ আলাপ করার পক্ষে ইয়াজের বয়স যথেষ্ট নয়। বয়সের হিসাবে ইয়াজ সুরতুনের চাইতে ছোটোই হবে।
আবার যেদিন ইয়াজের সঙ্গে সুরতুনের নির্জনে দেখা হলো, দুজনে হাট থেকে ফিরছিলো, ইয়াজ বললো, সুরো, আমার মনে হয় তোমার বুকের মধ্যে কী আছে তা দেখি।
কেন্, এমন হয় কেন্?
আমার যেন মনে হয় তোমার সুখ নাই। তোমাক যেন চিনবের পারলেম না।
মানুষ চেনা কি সহজ? সুরতুন হাসিমুখে বললো। টেপির মায়ের সেই বাবাজির গানের । একটা কলি তার মনে এসেছিলো।
আচ্ছা, সুরো–
এমন রূপ তোমার, লোকে তোমাক নিবের চায় না কেন্?
ছাই!
কথাটা মিথ্যা নয়, সুরতুনের রূপ যেন পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। দেহবর্ণ মলিন হয়েছে, ধানহীন দিনে স্বাভাবিকভাবেই মেদহীন হয়েছে তার দেহ, স্তন শুকিয়ে গেছে চৈত্রের মাটির মতো, তবু সেই করুণ মুখে টিকলো নাকটি আছে, এবং টানা টানা দেখায় চোখ দুটি, আর সেই চোখের কোলে ক্লান্তির কালিমা।
কও কী? ইয়াজ বললো, আমার মনে কয় তোমার কী কী অভাব জানে নিই। নতুন কাপড়েও তোমার রূপ যেন বাড়ে না, ঢাকা পড়ে।
সুরতুন বললো, এমন কথা কী কয়?
.
ইয়াজ দিঘায় গিয়েছিলো এবং সাধ করেই সে মাধাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলো। বাড়িতে ফিরে সে অন্য কোনো কথা বলার আগেই ফতেমার কাছে গিয়ে বললো, মাধাইয়ের খুব অসুখ। বাঁচে কি না বাঁচে।
