ওই দ্যাখো আবার রাগ করলা? ঠাট্টা করলাম তাও বোঝো না? বড়োই তো। অনুপ্তের মতো বললো ইয়াজ।
কিছুদূর যাওয়ার পর ইয়াজ বললো, আচ্ছা, সুরো, একটা কথা কবা? তুমি মাধাইয়ের ঘরে থাকলা না কেন?
পরের ঘরে থাকবো কেনে?
মিয়েমানুষ তা থাকে। এখানে কৈল তোমার বড়ো কষ্ট।
কষ্ট আর কী, দুনিয়ায় তা নাই কনে?
তাইলেও এমন চেহারা তোমার তখন হয় নাই। যেদিন তুমি আসলা সেদিন যেন রূপ ফাটে ফাটে পড়ে। আর এখন শুকায়ে কী হইছে।
সুরতুন নিরুত্তর।
কলে না?
কী কবো? তুই একখান শাড়ি কিনে আনিস, পরবো। সুরতুন হাল্কা কথায় চিন্তা ঢাকতে চেষ্টা করলো।
গোরুগাড়ি হাঁকিয়ে ইয়াজ সপ্তাহে একদিন দিঘায় যায়। একবার সেখান থেকে ফিরে সে বললো, মাধাই বায়েনের সঙ্গে দেখা হইছিলো।
ফতেমা বললো, কেমন দেখলি?
তা সেইরকম। শিস দিয়ে বাজারের মধ্যে ঘুরতিছিলো।
তোকে কিছু কলে?
না। আম্মা, তোমার জয়নুল-সোভানেক দেখলাম। তারা তাগরে আব্বার দোকান জাঁকায়ে বসেছে। একজন কলে, কসাই আবার নিকা করছে, কিন্তু ধরছে ক্ষয়কাশ।
জয়নুল-সোভানও তোকে কিছু কলে না?
আমি তাদের সামনে গিছি? দূর থিকে দাঁড়ায়ে দেখলাম।
এবার গেলি কথা কয়ে আসিস। ফতেমা বললো।
কিন্তু মাধাইয়ের সম্বন্ধে সে কিছু সংবাদ সংগ্রহ করেছিলো। বাঁশ, নলখাগড়া প্রভৃতির সাহায্যে তার নিজের জন্য যে কুঁড়েটা সে তুলেছে সন্ধ্যার পর সংবাদটা দেওয়ার জন্য সুরতুনকে সেখানে ডেকে নিলো ইয়াজ, কিংবা ছল করে সুরতুনই গেলো সেখানে।
মাধাই দেখলাম সুখেই আছে। চাঁদমালা না কে একজন তার সঙ্গে ছিলো। দেখলাম মাধাই তাকে বাজার সওদা করে দিলো।
আর কিছু কবি?
সুরতুন উঠে দাঁড়ালো। সে বৃথাই ভেবেছিলো, বাইরেটা শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনের ক্ষতটিও শুকিয়ে গেছে।
.
সুরতুনের মনে হয়, অন্য কারো জন্য প্রাণ পোড়া কিছুনা। সেটা একটা খেয়ালের খেলামাত্র। কিন্তু অদ্ভুত নেশা তার। একটা পুরনো ঘটনাও মনে পড়ে গেলো সুরতুনের।
বেল্লাল সান্দারের জেবু নামে এক মেয়ে ছিলো। জ্বরে ভুগে ভুগে জীর্ণ-শীর্ণ, মাথার চুলগুলিও তেমন করে আর বাড়েনি। শুকনো চেহারার পনেরো-ষোলো বছরের একটি মেয়ে ছিলো সে। পাড়ার মেয়ে স্বজাতীয়দের মেয়ে ছাড়াও সুরতুনের সঙ্গে নিকট-পরিচয় হওয়ার আর একটু কারণ ছিলো। ফসল উঠে যাওয়ার পর সুরতুন-ফতেমার সঙ্গী হয়ে ভোররাতে সে ধান কুড়োতে যেতো।, ধানের কাজ শেষ করে তখন বাঙালরা চলে গেছে, এমন এক সন্ধ্যায় পা টিপে টিপে অতি সন্তর্পণে জেবু এসে দাঁড়িয়েছিলো ফতেমার কাছে।
–কেন রে জেবু?
–ও যে চলে যাবি।
–কেডা যায়?
জেবু ফেঁপাতে ফেঁপাতে বললো–রোমজান।
–তাতে তোর কী? ধানের সময় নানা দেশের লোক আসে যায়। ধান নিয়ে পলাইছে?
–না। আমার কী হবি?
জেবুর একটি ভ্রান্ত ধারণা হয়েছিলো যে সে প্রজাবতী।
কথাটা শুনে প্রথমে খানিকটা নির্দয় রঙ্গ করলো ফতেমা। তারপর জেবুন্নিসাকে আসন্ন মাতৃত্বের লক্ষণগুলি বুঝিয়ে দিতে গিয়ে সে দেখলো, নিজেও সে সে-বিষয়ে অত্যন্ত কম জানে।
সেবার সেসব পুবদেশী বাঙাল এসেছিলো তাদের মধ্যে একজন ছিলো রমজান। বছর কুড়ি বয়স হবে কি না-হবে, কিন্তু এত লম্বা যে মানুষ একশো বছরেও তেমনটা হয় কিনা সন্দেহ। সেই দৈর্ঘ্যের ফলে তার হাত দুটো লটপট করতো, পা দুখানা ন্যাকপ্যাক করতো। চটে জড়ানো একটু পুটুলি,একটা মাথাল, একটা কাস্তে নিয়ে সে এসেছিলো ধান কাটতে সেই যেবার দুর্ভিক্ষের আগে ধানের বান ডেকেছিলো।
সড়কের ধারে বলে বেল্লালের বাড়িতেই সে তামাক খেতে ঢুকেছিলো। তার সঙ্গীরা ততক্ষণে এগিয়ে গিয়ে চিকন্দি ও সানিকদিয়ারের খেত খুঁজে কাজ ঠিক করে নিয়েছে। তখনকার দিনে বাঙালদের অনেকেই বুধেডাঙায় সান্দারপাড়ায় তাদের দাওয়ার আশ্রয় নিতো। এটা একটা প্রথায় দাঁড়ানোর মতো ব্যাপার হয়ে উঠেছিলো। বাড়ির মালিককে তারা এক কাঠা করে ধান দিতো। রমজান বেল্লালের বারান্দাতেই বসে রইলো। সন্ধ্যার পর একবার বেরুলো সে।কাছে যে খেতটা পেলো তার মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি না করে মালিক যা বললো তাতেই রাজী হয়ে আবার। বেল্লালের বাড়িতে ফিরে এলো সে।
দেখা গেলো নোকটা ধানের কাজে যতই আলস্য দেখাক, আসলে কাজ না করে থাকতে পারেনা। ধান কাটার পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে এসে একটু জিরোতেনা-জিরোতে সে বলে–আজ বুঝি দড়িদড়া পাকান নাই?
বেল্লাল হেসে বলে–তোমাদের দেশে সাঁঝেও বুঝি লোকে বিচ্ছাম করে না?
এমন না হলে জেবুকে ধান কুড়োনোর জন্য ভোররাতে ফতেমার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় পায় সে।
ক্ষেতের ধান ঘরে উঠেছে। নদীর ঘাট থেকে বাঙালদের ধানবোঝাই নৌকাগুলো রওনা হয়ে যাচ্ছে। ঋক বেঁধে উড়ে আসে এরা, তেমনি চলে যায়। ঝকছাড়া দু-একটা বোকা পাখি যদি পড়ে থাকে, তবে সেটা ডানায় যত না জোর তার চাইতে বেশি তোড়জোড় করে উড়তে, তেমনি করতে লাগলো রমজান।
তখন ফতেমা ইয়াকুবকে বলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলো। ইয়াকুব প্রথমে রাজী হয়নি কিন্তু ফতেমা বাপের বাড়ির দিকে চলে যাবে শুনে সে লম্বা লম্বা পায়ে দৌড় দিলো হাঁক দিতে দিতে। কুস্তির প্যাঁচে ঘায়েল করে চোর ধরার মতো রমজানকে সে ধরে আনলো। নিজের আঙিনায় পৌঁছে ইয়াকুব বললো–শালা, পলাও কেন্ চুরি করে?
