কস কী?
তখন দুপুর। সুরতুন উঠোনের একপ্রান্তে বসে শুকনো ডালপালা কেটে কেটে লকড়ি তৈরি করছিলো। ফতেমা রান্নার জোগাড় করে নিয়েছিলো। রান্না ফেলে সে সুরতুনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, শুনছো না, সুরো, বায়েনের খুব অসুখ।
সে কি যাতে কইছে? সুরতুন প্রশ্ন করলো।
কী কস, ইজু? ফতেমা ইয়াজকে প্রশ্ন করলো।
না। আমি যাওয়াতেই রাগ করছে। ইয়াজ বললো।
তবে? সুরতুন প্রশ্ন উত্থাপন করলো।
ফতেমা বললো, কিন্তুক তার যদি ভারি ব্যারাম হয়?
সুরতুন অত্যন্ত মৃদুগলায় বললো, সে যদি রাগ করে তাইলে আমরা যায়ে কী করি?
সে মুখ নিচু করে আবার লকড়ি কাটতে লাগলো।
ফতেমা চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে বললো, না গেলি হয় না, সুরে, যাওয়াই লাগে।
সেদিন ফতেমাদের বাড়িতে আহারাদির কোনো ব্যবস্থা হলো না। কিছুক্ষণ পরেই সুরতুন ও ফতেমা ইয়াজকে নিয়ে দিঘায় রওনা হলো।
ফতেমারা যখন মাধাইয়ের ঘরে গিয়ে পৌঁছলো তখন বেলা পড়ে আসছে। মাধাই তার ঘরের মধ্যে শয্যায় বসে উড্ডিত জানুতে কপাল রেখে করুণ স্বরে হা-হুঁতাশ করছে।
সুরতুন বললো, ভাবি, এখন কী করবা?
কী করতে কস?
ফতেমা আর-একটি মুহূর্ত চিন্তা করলো, তারপর দ্বিধা ত্যাগ করে মাধাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার পিঠে হাত রাখলো।
মাধাই চমকে উঠে মুখ তুললল। একডালি চুল, একমুখ দাড়ি, চোখ দুটি লাল।
ফতেমা বললো, কী হলো, ভাই?
ইয়াজ বলেছিলো মাধাই রাগ করবে, কিন্তু সে দু হাত বাড়িয়ে দিলো ফতেমার দিকে, ভঙ্গিটা যেন শিশুর কোলে উঠতে চাওয়ার মতো। ফতেমা আরও কাছে সরে দাঁড়ালো, মাধাইয়ের মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে সে বলতে লাগলো, ভয় নাই, ভয় নাই।
কিছুক্ষণ পরে মাধাই বললো, বুন, চলো আমরা বাইরে যায়ে বসি।
মাধাই বারান্দায় এলো। সে মাটিতে বসতে যাচ্ছিলো, ইয়াজ এগিয়ে এসে একটা চট পেতে দিলো।
ফতেমা বললো, ভাই শোও, একটুক ঘুমাও; না হয় শুয়ে শুয়েই কথা কও।
মাধাই অত্যন্ত বাধ্য একটি কিশোরের মতো শুয়ে পড়লো। ইয়াজ কিছুদূরে মাটিতে বসেছিলো, তাকে দেখিয়ে মাধাই প্রশ্ন করলো, আমার ভাগনা বুঝি?
সুরতুন বারান্দার উপরে চটের একপ্রান্তে বসেছিলো, মাধাই অনেকটা সময় তার দিকেও চেয়ে রইলো। মনে হলো, মাধাইয়ের দেহ-মন স্নিগ্ধ হয়েছে, এবার সে একটু ঘুমোলেও পারতো। কিন্তু বকবক করতে লাগলো। পুরনো কথা উত্থাপন করে যেন তার স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা দিচ্ছে। একসময়ে সে বললো, আমার কি এত লোক?
সন্ধ্যার আগে চাঁদমালা এসেছে। সে যেন আরও স্থূলাঙ্গী হয়েছে। একটি রঙিন শাড়ি তার পরনে। এজন্য তার খরচ হয় না। যে কাপড় সে কাঁচতে আনে প্রয়োজনতো তার মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে সে পরে। চোখে সে কাজল দিয়েছে। দু হাত ভরা রেশমি চুড়ি। ঘরে ঢুকে একটা ঝোলা থেকে গুটিকয়েক মাটির খুরি, একটা দেশী মদের বোতল নামিয়ে রেখে সে ঘরের মধ্যেজ ঘুটঘাট করে কাজ করতে শুরু করলো।
মাধাই বললো, দেখছোনা, ওই আমার চাঁদমালা। বড়ো ভালোমানুষ। সব ব্যবস্থাই ও করে। র্যাশন আনে, বাজারে বেশি দামে বাড়তি র্যাশন বেচে। ওর কোনো খরচাই নাই। শুধু সাঁঝে এক বোতল ঢকঢক করে খায়ে ঘুমাতে পারলি মহা খুশি। যেন কত কাল ঘুমায় না। ও নিজেও কাপড় কাঁচে, যে টাকা পায় তাও আমার জন্যিই খরচা করে।
এসব কথা চাঁদমালার সাক্ষাতেই হলো। প্রত্যুত্তরে কোনো কথা বলা দূরের কথা, যেন সে শুনতেই পায়নি এমনিভাবে ঘরের যে কাজটুকু অবশিষ্ট ছিলো তা করে একটা কালি-পড়া টোল-খাওয়া কেটলি নিয়ে চলে গেলো আবার।
মাধাই বললো, ফতেমা, এবার তোমাদের যাওয়া লাগে।
কেন্? চাঁদমালা কি রাগ করবি?
তা করে মিয়েমানুষরা, কিন্তুক চাঁদমালা তা করবি নে। মুখ দেখে মনে হয় আজ সারাদিন তোমাদের খাওয়া হয় নাই। এখন বাড়ি যায়ে সেসব করো গা। যখন কাঁদে কাঁদে ভগোমানেক ডাকতেছিলাম তখন আসে বড়ো ভালো করছিলা। আমাক জানা থাকলো, আমার মড়া শিয়াল কুকুরে খাবি নে।
এমন কথা কয়ো না। চাঁদমালা যদি তোমার বউ, তবে তোমার চিকিচ্ছা করায় না কেন?
মাধাই একটু চিন্তা করে বললো, চিকিচ্ছা করায়ে কীহবি, তাতে কি আমার চাঁদমালা সারবি?
বুঝতে না পেরে ফতেমা বললো, চাঁদমালার কী হইছে?
মাধাই যা বলতে চেয়েছিলো সেটা বলার আর চেষ্টা করলো না সে। কথাটা বলেই বরং অকারণে কটু কথা বলার অনুশোচনা হলো তার। চাঁদমালাকে রোগজ্ঞানে পরিত্যাগ করার কোনো না যুক্তিই এখন আর নেই তার পক্ষে।
কিন্তু ফতেমা যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে নির্মম ও ভয়লেশশূন্য না হলে চলবেনা, এমনি ভঙ্গিতেই সে বললো, ভাই, তুমি চাঁদমালায় সুখ পাতেছো না আর। সে তোমার মুখ দেখে বুঝবের পারি। সুরোকে নিয়ে থাকো। দুইজনাই সুখী হবা।
কথাগুলো শুনে উদ্যত কান্না নিয়ে চোখ-মুখ আড়াল করলো সুরতুন কিন্তু তার মনে হলো যেন বলপ্রয়োগ করা দরকার কোনো কোনো বিষয়ে। ফতেমা ঠিকই বলছে, এখন আর চুপ করে থাকার সম
উত্তর দিতে সংকোচ বোধ হয়েছিলো মাধাইয়ের, পরে সে বললো, এখন আর তা হয় না। কিন্তু সে লক্ষ্য করলো সুরতুনও তার মুখের দিকে চেয়ে আছে। এতক্ষণে একটি কথাও সে বলেনি। সে তখন বললো, আয় সুরো, আমার কাছে আয়।
দিনের আলোয় আর পাঁচজনের চোখের সম্মুখে প্রিয়জনকে আদর করায় রুচিহীনতাই সূচিত হয়। কিন্তু এটা যেন কোনো সন্ন্যাসীর নিস্পৃহতা এবং ঔদাস্য, সাধারণের হিসাবে যা মাপা যায় না। ফতেমা, এমনকী ইয়াজ পর্যন্ত অত্যন্ত আগ্রহের দৃষ্টি দিয়ে মাধাইয়ের এ ভঙ্গিটিকে সমর্থন করতে লাগলো।
