সান্যালমশাই বললেন, দর্জি এসেছে সদর থেকে। রূপুর কী কী বানাতে হবে বলে দিয়ে যাও।
অবশ্য দর্জির ব্যাপারটা এমন কিছু জরুরি নয়।
কিন্তু মনসা এলো পুঁথিঘরে যেখানে সান্যালমশাই ও অনসূয়া ছিলেন। শুধু সিঁথি, কষ্টি ও বাজুবন্দে নয়, সে তার মুখের হাসিতেও ঝকঝক করছে।
কোথায় গিয়েছিলি?
দাদার ঘরে একটা পার্টি ছিলো।
তা অমন একগাল পান মুখে দিয়ে পাগলির মতো হয়ে না বেড়িয়ে এমন করে থাকলেই তো পারিস।
মনসা বললো, তা থাকবো। হ্যাঁ জেঠিমা, তুমি নাকি রূপুকে যেতে দেবে না? দাদাকেও নিষেধ করেছে?
অনসূয়া চট করে উত্তর দিতে পারলেন না; হাসলেন।
এ কি তুমি ভালো করলে? দাদাকে আটকাও, কিন্তু রূপুকে যেতে দিয়ো।
তা যাবে বৈকি।
তাই বলল। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে বলবো বউদির বাপের বাড়িতে চিঠি দিতে, যাতে ওরা এসে নিয়ে যায়। এখন সাহস পাচ্ছি না।
অনেকদিন একটানা আছে এখানে, তাই নয়?
তা বৈকি। তাছাড়া ওদের তরফেও তো ছেলেটাকে দেখতে ইচ্ছে হতে পারে।
তা পারে।
তাহলে কাল চিঠিটা লিখে দিয়ো।
মনে করিস কাল।
আর তাছাড়া, আমার মনে হয়, দাদারও বাইরে ঘুরে আসা মন্দ নয়। সেই কবে থেকে সরকার ওর পিছনে লেগে ছিলো, ম্যালেরিয়ার মতো ধরেছে পূর্ণিমায়-পূর্ণিমায়।
অনসূয়া আবার হাসলেন। একটু পরে বললেন, রূপু যাবে, নৃপকেও যেতে দেবো। কিন্তু, মনসা, ছেলে বড় হলে তুই বুঝবি, কখনো কখনো ছেলেদের সম্বন্ধে বিচলিত না হয়ে পারা যায় না।
৩৬. আর একটি ধানের খন্দ
আর একটি ধানের খন্দ এসেছে এবং চলেও গেছে। ইয়াজ ভেবেছিলো সে খুব একটা কিছু করেছে, কিন্তু জমিদারের ফসল তুলে দিয়ে, লাঙল জোয়ালের জন্য ধার শোধ করে যা অবশিষ্ট আছে তাতে আর এক ধানের খন্দ পর্যন্ত সংসারকে এগিয়ে নেওয়া যাবেনা। সংসারটা খুব ছোটো নয়, ফতেমা, সুরতুন, রজব আলি এবং সে নিজে।
ইয়াজের গায়ে গ্রামের শ্যাওলা পড়েছে। যখন সে শহরের একান্ত দুঃসহ দারিদ্র্যের মধ্যে কাটাতো তখন তার চেহারায় ও অভ্যাসে কিছু শহুরে ছাপ ছিলো। তার চুল কাটার কায়দা দর্শনীয় ছিলো, একটা রঙিন সিল্কের ছেঁড়া-ছেঁড়া গেঞ্জি সে গায়ে দিত, কখনো কখনো ডোরাকাটা কাপড়ের পায়জামা পরতো, বিড়িটা সিগারেটটা খেতো। এখন তার ধূলিমলিন একমাথা চুলে সেসব দিনের জুলফির কায়দা ডুবে গেছে। পরনে অধিকাংশ সময়ে একটা গামছা থাকে, নেহাৎ যদি কোনদিন দিঘায় যাওয়ার দরকার হয় একটি খাটো মলিন মমাটা থান কাপড়ের কয়েক হাত সে ব্যবহার করে।
কিন্তু তার ছনমন করে বেড়ানোর স্বভাব যায়নি। তার সঙ্গে আর একটি ভাব যুক্ত হয়েছে, সেটা হচ্ছে কী করি–কী করি। আলেফ সেখের গোরুগাড়ি চালানোর কাজ হয়েছে তার। তার জন্য পারিশ্রমিক কী পায়, সে-ই জানে। কিন্তু যখন সে দিঘা থেকে ফিরে আসে তখন মনের। স্ফুর্তি চেপে রাখতে না পেরে উঁচু গলায় গান জুড়ে দেয়। সে গানের ভাষা দুর্বোধ্য, সুর ভয়াবহ। সে তার এই অপূর্বর্গঠন পরিবারটিকে একটি জেলের পরিবারে রূপান্তরিত করবে এমন সম্ভাবনা। দেখা দিয়েছিলো একসময়ে। এখন সেটা নেই, কিন্তু জলের উপরে এবং তা থেকে জালের দিকে টানটা থেকে গেছে। একটা খ্যাপলা জাল সে নিজেই বুনেছে। গাব দিয়ে সেটাকে মাজবার সময় একটা কলহ হয়েছিলো। সুরতুন বলেছিলো, আমার অকাজের সময় নাই। মনে হলো ইয়াজ একটা খুনই করে ফেলবে। সে জালটিকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার জন্য ঘর থেকে দা হাতে নিয়ে বেরুতেই ফতেমা এসে দাঁড়ালো, তার হাত চেপে ধরলো, দা কেড়ে নিলো। ধমক দিয়ে বললো, দূর হও, বজ্জাত কোথাকার। তুমি মানুষ কাটবা!
ইয়াজ রাগের মাথায় চিৎকার করে কী বললো তা বোঝা গেলো না। অত চিৎকার করতে গেলে স্পষ্ট করে চিন্তা করাও যায় না। কিন্তু মনে হলো সে বলছে, তুমি কি আমার আপন মা যে অমন করে গাল দিবা?
কিছুদিন সে সুরতুনের সঙ্গে কথাই বললো না।
কিন্তু একদিন সন্ধ্যার পর, আকাশে গুমোট মেঘ, ইয়াজ বললো, সুররা, আজ মনে কয় মাছ ভাসবি।
ধরো গা।
তার আগে তোমাক ধরবের চাই। তুমি একটু চলো, একলা ভয় ভয় করে। জালেরা নাকি তুক করে রাখে।
মাছ ধরতে গিয়ে বিপদই হলো সেদিন। প্রথম টানেই জালটা আটকে গেলো এক বাঁশের খোঁটায়। সুরতুনকে নামতে হলো গলা জলে, জালের দড়ি ধরে দাঁড়াতে হলো। ততক্ষণে ডুব দিয়ে দিয়ে ইয়াজ জাল ছাড়িয়ে দিলো খোঁটা থেকে।
কিন্তু আসলে সেদিন কপাল ভালো ছিলো। পাটকাঠির মশাল হাতে বালির পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে ভিজে কাপড়ে সুরতুন ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো বটে, ইয়াজ নানা জাতের ছোটো ছোটো মাছে খালুইটা ভরে তুলো।
এমন মাছ সে অনেকদিন পায়নি কিন্তু তার চাইতে অন্য আর একটি কারণে সন্ধ্যাটা গুরুত্ব অর্জন করলো। পাশ দিয়ে গেলে মানুষ বলে মনে হয় কিন্তু লোক চেনা যায় না অমনি অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্য দিয়ে দুজনে চলছে। ঠাণ্ডা লাগানোতে জ্বর হতে পারে কিনা তাই নিয়ে কথাটার সূত্রপাত।
জ্বর হলে আর কী হবি, না-হওয়া কালে ভয়। মরতি পারলে সব ফরসা। বললো সুরতুন।
লঘু পরিহাসের ভঙ্গিতে ইয়াজ সুরতুনকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে হাসির সঙ্গে মিশিয়ে বললো, ষাট, বালাই, মরবা কে? কেউ বিয়ে করবের চায় না বলে?
বড়ো বলে মানো না, কেন্?
