কিন্তু পরক্ষণেই অনসূয়া চোখের জল ও চশমার বাষ্প মুছে ফেললেন। একটু গভীর সুরে বললেন, তুমি বলবে অনেক দিক দিয়ে নৃপ আদর্শ পুরুষ হয়েছে, তুমি বলবে অনেক দিক থেকে সে আমাদের তুলনায় অগ্রসর, কিন্তু এ কথা স্বীকার করবে কী করে নৃপ আমাদের কেউ নয়? কিংবা এ হয়তো আমার শহুরে আচার-আচরণের ফল।
সান্যালমশাই হাসলেন গড়গড়ার নল সরিয়ে, বললেন, আমি জানি না, আমার বা তোমার মন অন্য কারো মন হয় কী করে। তোমার মনের কথা আমি ভাবিনি এমন নয়। আচ্ছা প্রকৃতিঠাকরুণের কথা ভাবো, যার সাধারণ নাম এখন ঠানদিদি। নৃপ জন্মানোর আগে, কতই বা বয়স তখন তোমার, তুমি তাকে তোমার এই বাড়িতে অন্যান্য পরিজনের মধ্যে আশ্রয় দিয়েছিলে। হিসাব সই করতে গিয়ে জানতাম পিতার আমলে মঞ্জুর করা মাসোয়ারাটা যায়। সে তোমাকে বয়সের ভার, দুঃস্থতা জানিয়ে চিঠি দিয়ে থাকবে। তুমি তাকে এই বাড়িতে পৃথক ছোটমহলে নিজের মতো থাকতে দিয়েছে। মনে পড়ছে, বলেছিলে, হতে পারে ঠাকুরের বিবাহিতানয়, কিন্তু তাকে স্ত্রীই বলা যায়। একেই হয়তো অমধ্যবিত্তদেরনলেস অলিজ বলে। হাসতে লাগলেন সান্যালমশাই।
সান্যালমশাই যেন অনসূয়াকে তার আত্মগ্লানি থেকে রক্ষা করছেন না মাত্র, নিজের অন্তরের স্বরূপও যেন ধরতে পারছেন না। তিনি বললেন, তুমি কি বলতে পারো, কিংবা আমি কি নিজেই জানি কোনোদিন আমি নৃপর মতো হতে চেয়েছিলাম কিনা? হয়তো তাকে প্রতি রক্তকণায় বাঁচাতে চাওয়া বলে।
অনসূয়া একটু চেষ্টা করে দৈনন্দিন কথায় চলে গেলেন। কিন্তু তার মনে হলো ‘সুমিত বাংলো’টায় কন্ট্রাক্টর এখনো কাঁচের কাজ করছে বটে, কিন্তু সেটা যেন ফাপা কিছু। সান্যালমশাই স্বেচ্ছায় যে স্তব্ধতার দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সেদিকেই যেন কেউ তাকে জোর করে ঠেলে দিলো ঠিক যখন সান্যালমশাই অন্য জীবন কামনা করছিলেন।
তখন সন্ধ্যা হয় হয়। রূপু এবং নৃপ আলাপ করতে করতে তার ঘরের কাছে এসে দাঁড়ালো। তারা দুজনেই ‘মা’ বলে উল্লেখ করে কী একটা বিষয়ে আলাপ করছিলো। কথাগুলোর সবটুকু কানে গেলো না তাঁর, কিন্তু ‘মা’ শব্দটা কানে গেলো। ব্যাপারটা নতুবা হয়তো এমনটা হতো না যেমন হলো। এ কথাও তিনি ভেবেছিলেন, তার শক্তির চরম প্রকাশ নিজের বিরাগ জানান, কিন্তু তার কি কিছু মূল্য আছে আর?
নিজের ঘর অন্ধকার ছিলো। সম্বিৎ পাওয়ার মতো ভঙ্গিতে আলো জ্বেলে অনসূয়া ছেলেদের ডাকলেন। ছেলেরা এলে বিছানা দেখিয়ে দিয়ে তাদের বসতে বললেন এবং নিজে গিয়ে দাঁড়ালেন ড্রেসিং টেবিলের কাছে।
নৃপ, তুমি শিকারে গিয়েছিলে!
নৃপ লক্ষ্য করলো প্রচলিত সম্বোধনটা ব্যবহার করলেন না অনসূয়া। তবু সে হাসিমুখেই বললো, তাকে শিকার বলে না, আমার নিজের বন্দুক নেই।
অনসূয়ার বক্তব্যটা খাপখোলা তলোয়ারের মতো ঝিকিয়ে উঠলো, যে-প্ৰাণীহত্যা জীবনের পক্ষে অপরিহার্য নয় সেটা মানুষকে টেনে নামায় বলেই এখনো আমার ধারণা।
অনসূয়া ড্রেসিং টেবিলে দুহাতের ভর রেখে দাঁড়ালেন, যেন তিনি একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন। মানুষের নীতিবোধের তারতম্য, পারিবারিক প্রথার প্রতি মমতা প্রভৃতির কথা বলতে বলতে আকস্মিকভাবে তিনি বললেন, মানুষকে সংবেদনশীলও হতে হয়। তোমরা কি ভেবে দেখেছো, তোমাদের এই চলে যাওয়াও আর একজনের প্রাণে কত বড়ো আঘাত হয়ে লাগতে পারে–যে শুধু তোমাদের ভালোই বেসেছে, শাসনের জন্যে তিরস্কার করেনি?
রূপু বললো, আমি যাবো না, মা। বাবাকে কষ্ট দেওয়া আমার ইচ্ছে নয়।
নৃপ হাসিমুখে কী বলতে যাচ্ছিলো। তার মুখটা একবার লাল হয়ে উঠলো।
সংসার স্বাভাবিকভাবেই চলছে, কিন্তু পরদিন সকালে দরজা খুলে দিতে গিয়ে অনসূয়ার মনে হলো, একটি কুণ্ঠার অবগুণ্ঠন যেন কে পরিয়ে দিয়েছে বাড়িটাকে।
তিনি রান্নার মহলে অন্যদিনের তুলনায় আগে গেলেন। কিছুক্ষণ এটা-ওটা দেখে, এর-তার সঙ্গে দু-একটা কথা বলে তিনি দাসীকে দিয়ে বলে পাঠালেন, একটা বড়ো মাছের দরকার, জেলেদের খবর দেওয়া হোক। সুমিতি ওদের প্রাতরাশ নিয়ে দুজন দাসীকে সঙ্গে করে যাচ্ছিলো অন্দরমহলে। অনসূয়া বললেন, সুমিতি, মাছের কালিয়াটার ভার আজ তোমার উপরে রইলো। রাঁধুনীদের তোমার পরামর্শ নিতে বলেছি।
আসছি, বলে সুমিতি চলে গেলো।
জেলেরা পুকুরে অন্যদিনের তুলনায় আজ ভালো মাছ পেলো। এতে অনসূয়ার সুবিধাই হলো।
কিন্তু নিজেকে শত কাজে ব্যাপৃত রেখেও তিনি ভুলতে পারেননি, কথাটা যখন তিনি বলেছিলেন, খুব কম সময়ের জন্য হলেও লাল হয়ে উঠেছিলো নৃপর মুখ। সে কি অপমানিত বোধ করেছিলো? ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক হলে সে কি মায়ের শাসনে অপমানিত বোধ করে? সমস্ত দিনে মনে মনে অন্তত পাঁচ-ছ বার নৃপনারায়ণের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।
আত্মগ্লানিতে তার মন ভরে উঠলো। যেন তার বাড়িটার এখানে-ওখানে অজস্র ফাটল দেখা। দিচ্ছে, যেন তার সংসারের কোথাও কোথাও পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে, আর তিনি উপযুক্ত প্রতিপক্ষ না পেয়ে নিজের আপনজনগুলিকে আঘাত করছেন। নিজের মনের গভীরে নিয়ে ক্ষোভকে বদলে দিতে পারেননি, নিরুপায়ের হিংস্রতায় তা প্রকাশ হয়ে গেছে। এ লজ্জা তিনি কী করে ঢাকবেন?
সন্ধ্যার পর রূপু এসে যখন খবর দিলো, মা ঘরে নেই, তখন অন্য কাউকে না পাঠিয়ে সান্যালমশাই নিজেই অনসূয়াকে খুঁজতে বার হলেন। কাউকে কোনো প্রশ্ন করলেন না, চটির শব্দ তুলে অন্দরমহলে একটু ঘুরলেন, তারপর রান্নার মহলে গেলেন। দু-একজন তাকে দেখে কী করবে ভেবে পেলো না। কিন্তু তিনি অনসূয়াকে আবিষ্কার করলেন। অনসূয়া তখন মন্দিরের বারান্দায় অস্পষ্ট হয়ে বসে আছেন।
