সুমিতি সাড়া দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মনসা বললো, তুমি অনেকদিন বাপের বাড়ি যাওনি, বউদি।
কথাটা আমিও ভাবছিলাম। বলে সুমিতি কথাটাকে আঁকড়ে ধরলো।
মনসা বললো, তোমাকে দেখলে মনে হয় তোমার স্বাভাবিক জীবনে বেড়ানোর একটা স্থান ছিলো। যা এই প্রাচীরঘেরা প্রাসাদে চেপে যাচ্ছে।
আমিও ভাবছিলাম ঘুরে আসা মন্দ নয়। কিন্তু খুব ভালো লাগে যদি তুমি আমার সঙ্গী হও।
মনসা হেসে বললো, এই দেখো, তোমাদের সেই হনিমুনে গেলাম কেন? আচ্ছা, কোথাও আস্তানা করে খবর দিয়ে। চেষ্টা করবো যেতে। যদি তুমি বলো, আমি জেঠিমাকে বলতে পারি, তোমার বাপের বাড়িতে কোনো কৌশলে খবর দিয়ে তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে।
সুমিতি একটু ভেবে বললো, তাই দিও।
কোনো কোনো দিন কারো মনের অবস্থা রোজনামচা লেখার মতো হয়। সাধারণত যেটা লেখা হয়ে যায় সেটাতে আত্মরক্ষার বুদ্ধি এসে জোটে, অনেক মিথ্যাও রেখে যায়। বরং চিন্তা করার সময়ে কেউ কেউ দুঃসাহসী হতে পারে।
মনসা চলে গেলে সুমিতি যখন আবার একা হলো, সে ভাবতে বসলো। প্রায়ই দেখা যায় চিন্তাটা যখন নিজেকে নিয়ে তখন সেটা একটা কিছুকে কেন্দ্র করে পাক খেতে থাকে, যেন নানা দিক থেকে কেন্দ্রে থাকা সেটিকে দেখা হচ্ছে। সুমিতির মনে হলো এখানে আসল কথাটা আধুনিকতা।
সে অনুভব করলো, সে কি উঁচু দেয়ালে ঘেরা এক কলেজ-হস্টেলে আছে, যার চারিদিকে অর্ধসভ্য গ্রামগুলি! না না। তা হবে কেন? এমন কী এটা মনসার তুলনার তাহিতি দ্বীপও নয়।
আধুনিকতা, যদি বলল তা, দারিদ্র্য দূর না হলে কোনো গ্রাম আধুনিক হয় না।
এই আধুনিকতা, অদারিদ্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করতেই কি তার আধুনিক হওয়া নয়? কিংবা আধুনিক হওয়া আর আধুনিকতা সৃষ্টি করা একই মানুষের সংস্কৃতির দুই প্রকাশ। তার বিয়ের ব্যাপারে প্রথা না মানা, তেমন করে নিজে থেকে এ বাড়িতে আসা কি লজ্জা হয়ে যায় না যদি আধুনিকতা সৃষ্ট না হয়?
এখানে তেমন করে আসতে গিয়ে সে কি নিজেকে মর্যাল কারেজের কথা বলেছিলো? না, সে দিক দিয়ে তার তেমন অসুবিধা হয়নি। এই শ্রীখণ্ডের পুরনো গড়ে যেন একরকমের আধুনিকতা আছে। তা যেন এই, সামান্যমাত্র চঞ্চল হয়ে জীবন যেমন চলেছে তাকে সে রকম চলতে দেয়া। যেন বলেছে, তোমার জন্য আমরা পৃথক মহল করে দিতে পারি, একেবারে আধুনিক পৃথক একটা বাড়িও। এদের যতটুকু মধ্যবৃত্ত ততটুকুই কি চঞ্চল হয়েছিলো প্রথার কথা ভেবে? কিংবা বলা যায়, এদের প্রথার আবরণে তার অভিনবত্বকে আড়াল করেছে এরা যাতে তা রগরগে হয়ে চোখে না পড়ে।
একদিন মনসা চোখ বড় বড়ো করে বলেছিলো, ও মা সে কী! দাদা কিভাবে রমণী সংগ্রহ করবে, কাকে ভালোবাসবে, তা কি আর কারো ভাবার বিষয়? সেই সময়ে সে হাসতে হাসতে বলেছিলো, তুমি তো বিবাহিতা,বউদি। তুমি বাঈজী হলেই বা কি করতাম? সেই সময়েই বোধ হয় সে বলেছিলো, পিতার উপপত্নী থাকতে পারে। ছেলেমেয়েরাও তাতে ভ্রুক্ষেপ করে না।
মনসা ধারালোভাবে তুলেছিলো কথাটা। কিন্তু এই সহনশীলতা মিথ্যা নয় যেন এদের সংস্কৃতির। মনসা আর রূপুর মতো আর কেউ কি তাকে ভালোবাসে? এই সহনশীলতাকে আধুনিকতা বলা হবে কি, আধুনিক সংস্কৃতি?
সুমিতির মনে পড়লো, সেদিন টেবল-ম্যানার্সের কথায় দুরকম সংস্কৃতিকেই ঠাট্টা করেছিলো নৃপ। কী উদ্ভট উপমান যে জোগাড় করতে পারে নৃপ!
কিন্তু সুমিতি হাসতে পারলো না। তার মুখ বরং উদাস হলো, বিশীর্ণ হলো। সে ভাবলো : সত্যকে, অহিংসাকে নির্ভর করা, মানুষের জীবনকে স ধর্ম, সব থিয়োরির চাইতে বেশি মূল্য দেয়া কি আধুনিকতানয়? অর্থর চাইতে বিদ্যা কি বেশি আধুনিক নয়? মিল ফ্যাক্টরির অজস্র মসলিনের তুলনায় কারিগরের হাতে তৈরি খদ্দরের অপ্রতুলতাকে কি আধুনিকতর বলা হবে না আর?
সুমিতির চোখে বেশ বড়ো দু ফোঁটা জল দেখা দিলো। সে তাকে তাড়াতাড়ি গোপন করে হাসতে চেষ্টা করলো। মনে মনে বললো, এটা ভালোই হচ্ছে তার এই প্রথাসিদ্ধ সাধারণভাবে ফিরে যাওয়া।
.
আচ্ছা, নৃপ যখন হলো তখনকার দিনের ফটো-অ্যালবাম যদি একটা থাকতো? সান্যালমশাইকে অনসূয়া প্রশ্ন করলেন।
কী হতো তবে?
কারো কারো কৌতূহল নিবৃত্তি করতো।
সান্যালমশাই কথাটায় বিস্মিত হলেন। অন্যের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য ফটো তুলে রাখার মতো একটি মহিলা নন অনসূয়া।
অনসূয়া বললেন, আচ্ছা, এ কথা কি সত্যি যে মা না থাকলে নৃপকে আমি বাঁচাতে পারতাম না? (মা বলে অনসূয়া তার শাশুড়িকে নির্দিষ্ট করলেন)।
এতদিন পরে এ সমস্যা সমাধানের কোনো সূত্রই যে নেই। কিন্তু এ কথা তোমার মনে হলো কেন?
কথাটা যেন রায় দেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু। মনে মনে বাক্যটা তৈরি হয়ে গেলেও আবার যেন সেটা পড়ে দেখলেন অনসূয়া; স্বতোৎসারিত বাক্যটিকে অসংখ্য অর্ধোফ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিন্তার সাহায্যে মার্জিত করে বললেন অবশেষে, আমি ছেলে মানুষ করতে জানিনি।
আবেগের উত্তাপ নিয়ে সান্যালমশাই বললেন, এটা তোমার অকারণে আত্মপীড়ন, আমি তোমার পুত্রগর্বে গর্বিত।
সহসা চোখে জল এলো অনসূয়ার। পরাজিতের মতো, আত্মপক্ষ সমর্থন করা যার পক্ষে সময়ের অপব্যয়মাত্র তার মতো বললেন, আমরা তখন হয়তো পরস্পরকে বেশি ভালোবাসতাম। ছেলে গৌণ ছিলো। তাই নৃপ কখনো আমাদের ভালোবাসতে পারলো না।
