আমি তোমাদের এর আগে বলিনি–
না বলে ভালোই করেছে। নতুবা সব সময়েই মনে হতো তুমি দুদিনের জন্যে এসেছে। কিন্তু এই সেদিন বেরিয়েছে, এরই মধ্যে আবার কী প্রয়োজন হলো রাজনীতির?
বর্তমানে কিছু নয়। শাসনভার যে আমাদের হাতেই আসছে এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।
তুমি কী করতে চাচ্ছো?
স্টাডির ম্লান স্নিগ্ধতায় এই কথা কয়েকটি নৃপনারায়ণের চোখের সম্মুখে স্থাপিত করলেন সান্যালমশাই।
ভারতবর্ষের সমস্ত গ্রাম দেখবো এমনটা সম্ভব নয়। এক-একটি বড়ো শহরকে কেন্দ্র করে সেই শহরের রসদ জোগায় যে গ্রাম কয়েকটি, প্রত্যক্ষভাবে যদি সেগুলোর পরিচয় পাই তা হলেই মোটামুটি আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে বুঝতে পারবো। তুমি একে পলায়নবৃত্তি বলতে পারো।
তোমাকে কি এখনই যেতে হবে? অনসূয়া প্রশ্ন করলেন।
এখনই যেতে হবে এমন কথা নয়।
সান্যালমশাই আবার কথা বললেন। অনসূয়া লক্ষ্য করলেন তার গলা অদ্ভুতরকম একটানা শোনাচ্ছে, উঠছে না, নামছে না।
সান্যালমশাই বললেন, কিন্তু তুমি কি পায়ে হেঁটে বেড়াবে?
যেখানে যানবাহন আছে সেখানে নিশ্চয়ই তা করবো না। তাই বলে যানবাহনের কোনো আড়ম্বর থাকবেনা। অনেকসময়েই আমার মনে হয়েছে কোনো কোনো মতবাদকে সত্য প্রতিপন্ন করার জন্যে কতগুলো মিথ তৈরি করে তাতে বিশ্বাস করছি। কাল্পনিক কিছুকে আমরা মানুষ বলছি। মানুষকে যেন ছকে ফেলা যায়। যদি পারি, মানুষ সম্বন্ধে কিছু জানবার চেষ্টা করবো।
সান্যালমশাইয়ের গড়গড়ার শব্দ শুনে তাঁর পরিচিত যে-কেউই বুঝতে পারতো তিনি গভীরভাবে বিষয়টিকে অনুভব করার চেষ্টা করছেন।
তিনি প্রশ্ন করলেন, তুমি কি রাজনীতি নিয়েই থাকবে?
হ্যাঁ। হয়তো সেটাকেই উপজীবিকা করতে হবে।
উপজীবিকা? থামো, থামো।
সব দেশেই যেমন পাণ্ডিত্যকে উপজীবিকা করে একদল লোক আছে, তেমনি আছে রাজনীতিকে উপজীবিকা করে।
কিন্তু উপজীবিকা হিসেবে রাজনীতি ভাড়াটে সৈন্যের মতো ব্যাপার নয় কি?
আমাদের দেশে এখনো হয়নি কিন্তু রাজনীতিতে অগ্রসর দেশে হয়েছে। প্রফেস্যনল রাজনৈতিক কর্মী না হলে অর্থাৎ পুরো সময়টা রাজনীতিতে না দিলে অন্য সব বিষয়ের মতো এতেও সিদ্ধি নেই।
আচ্ছা নৃপ, তোমার যখন টাকা রয়েছে, না হয় অ্যামেচার রাজনৈতিক হয়ে থাকো।
টাকা আছে, এ আমি অস্বীকার করি না। বরং সেটাই প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাকে বেশি শক্তি দিচ্ছে। আমার আদর্শবাদ তাদের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আশা রাখি। আমরা এখনো কিছুদিন ইংরেজী ধারায় চলবো। ইংরেজের দেশেও রাজনীতিওয়ালারা পৈতৃক সম্পত্তিতে অবলম্বন করে কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর প্রফেস্যনল হয়।
সান্যালমশাই চোখ তুলে দেখলেন নৃপ তার কথা শোনার জন্য বসে আছে। তিনি বললেন, তোমার চিন্তায় সততা আছে; স্পেডকে তুমি স্পেড বলতে পারো।
এরপর নৃপনারায়ণ কথা ঘুরিয়ে নিলো। সান্যালমশাই লক্ষ্য করলেন সেটা এবং সহজ হয়ে রইলেন। রূপুর কথায় পৌঁছলো আলাপটা। রূপুকে ছ-সাত বছর কিংবা তারও বেশি সে দেশে থাকতে হবে। বড়ো জোর মাঝে মাঝে ছুটিতে আসবে।
অনসূয়া এতক্ষণ কথা বলেননি। এবার তিনি বললেন, অথচ আমি ভেবেছিলাম, রূপু যখন এবার দূরে যাচ্ছে তুমি আমাদের কাছে থাকছে।
সান্যালমশাই ভাবলেন, রাজনৈতিক মত পরিবর্তন নয়, রাজনীতির প্রতি অতি পরিচয়ের অবহেলা ছিলো নৃপনারায়ণের কথার সুরে।
.
স্বভাবতই মনসা আর সুমিতির অনেকটা সময় একত্র কাটে। মনসার দু’একদিনের মধ্যে ফিরে যাওয়ার কথা, কিন্তু তার দেরি হতে লাগলো। তার মনে ছিলো, অন্য আর একদিন সাজিয়ে। দেওয়ার কথা বলতে সুমিতির গলাটা ক্লান্ত শুনিয়েছিলো, কিন্তু ক্লান্তির চাইতেও বেশি কিছু ছিলো তার ভঙ্গিতে। গত কয়েকদিনে খুব সাধারণ সহজ কথায় বিষয়টাকে সে বুঝতে চেষ্টা করেছে। তার আর সুমিতির বিবাহ দু রকমের। ভালোবাসা আর বিবাহ নিয়ে সেই পুরনো কথা। সে ব্যাপারে সুমিতির মতো সাহস প্রমাণ করার সুযোগ তার জীবনে হয়নি। কোনটা আদর্শ হওয়া উচিত তা নিয়ে সে তর্ক করেনি, কিন্তু বিশেষ করে সুমিতির ভালোবাসার ব্যাপারটাকে সে সহানুভূতি তো বটেই, শ্রদ্ধা দিয়ে বিচার করেছে।
কিন্তু বাইরের ঘটনা কী এমন প্রভাবিত করতে পারে যে সেই ভালোবাসা ইতিমধ্যে প্রাণহীন? একথা কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না, নৃপনারায়ণের মতো একজনের উপর থেকে ভালোবাসা ফিরিয়ে নেয়া যায়।
একদিন মনসার মনে হলো : তুলনা দেওয়া ভালো নয়। তুলনা ছবি তৈরি করে, আর সেই ছবি অবলম্বনহীন আত্মার মতো যেখানে-সেখানে দেখা দিতে পারে। গড় শ্রীখণ্ড ধান আর পাটের হিন্টারল্যান্ড হতে পারে, তাহিতি দ্বীপ নয়। কিছু এক সৃষ্টির জন্য বউদির গ্রামে আসা কি গর্গার প্যারি-পালানো হয়? এখন এই গড় শ্রীখণ্ডে বউদির পক্ষে কিছু আর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কী এক শক্তি অথবা প্লাবন এখন দাদপুরকে ভাঙার মতো গড় শ্রীখণ্ডকে ভাঙবে মনে হচ্ছে। তাহিতি সমুদ্রোচ্ছ্বাসে ডুবে গেলে গর্গাকে তো ছবির বদলে শুধু রোগ নিয়ে ফিরতে হতো। কিন্তু তুলনাটা নেহাত অসম। বউদির প্রেমের ব্যাপারটা গর্গার ছিলো না নিশ্চয়। সেই প্রেম কি যথেষ্ট যুক্তি নয় সবকিছুর?
অন্য একদিন আলাপে আলাপে তারা পুরুষদের পরিমণ্ডল থেকে সরে গিয়ে মেয়েদের নিজেদের ব্যাপার যেন আলাদা করে নিচ্ছিলো। তখন মনসা বললো, ঠিকই বলছে। বউদি, আমরা প্রায় দু টুকরো হয়ে যাই। পুরুষদের উচ্চাভিলাষ আর বাস্তব কৃতিতে যে পার্থক্য আমাদের এই টুকরো দুটোতে পার্থক্য তার চাইতে বেশি যেন। আমাদের আত্মা আর শরীর আলাদা হয়ে যায় না? তুমি শরীর না বলে প্রবৃত্তি বলবে? নাকি প্রকৃতি, নিয়তি এই সব? নাকি, সন্তানপরম্পরার বৃত্ত?
