অনসূয়ার বসার ঘরে তখন অনসূয়া চিঠিটা পড়ে নিয়ে রেডিও খুলেছিলেন। নৃপ আসতে রেডিও বন্ধ করে চিঠিটা তাকে এগিয়ে দিলেন।
নৃপ বললো, দেখো কাণ্ড! ছেলে বিদেশে যাবে বলে এমন দিনরাত রেডিও খুলে বসে থাকতে হয়?
রূপু অনসূয়ার পাশে বসেই স্কেচ করছিলো। খুব যথাযথ না হলেও ধরা যাচ্ছে তা ছেলে কোলে করে বসা সুমিতির। রূপু বললো, তাই বলছো? আমি ভাবছিলাম যে বুঝি মার বড়োছেলের সঙ্গীসাথীরা দিল্লি আর কলকাতায় কী হুইহাই হুটহাট করছে তার খবর নিতে।
নৃপ হো হো করে হাসলো, বললো, রূপু, সত্যি তুই তাহলে বড়ো হলি।
সে চিঠিটা পড়লো। সেটাকে অনসূয়াকে ফিরিয়ে দিলো। বললো, রায়মামা একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছে। তা মিথ্যে নয়তো, দু’দুটো নাবালক সঙ্গে নিয়ে চলা যে।
একটু হেসে আবার বললো, ওটাও এক ফ্যাসাদ, রায়মামার এক কাকিমা মেম বটে, আর রায়মামার এক ভাগ্নী অনেকদিন বিলেতে থেকে ফিরেছে। আমি শুনেছি সেই কাকীমা সে দেশে স্কুলে পড়াতেন, আর সেই ভাগ্নী লন্ডনের ইকোনমিকসের স্কুলে পড়েছে। কেমন টেবল ম্যানার্স যে রূপ শিখবে?
সুমিতির পাশে থেকে মনসা বললো, তাদের টেবল ম্যানার্স ভালো নয় বলছে!
দেখো, দেখো, নেহাৎ মধ্যবিত্তর চাইতে বেশি কিছু কি তা হতে পারে? কপট দুশ্চিন্তায় নৃপ বললো, কী যে হবে রূপুর।
রূপু বললো, দাদা, তুমি ভীষণ সামন্ততান্ত্রিক। আমাদের শিবনারায়ণ বড় হলে যে তুমি কী করবে?
নৃপ বললো, যতদূর মনে পড়ে সামন্ত কিছু মেদিনীপুরে থাকলেও থাকতে পারে। আমরা তো সান্যাল। আর তোমার শিবনারায়ণ কি ওইটি? তা, ওর জন্য যা ভাবনার ভার তা অনেকদিন থেকেই তোমাকে দেয়া হয়েছে। তুমি ভেবে দেখো, ওকে লখনৌতে রাখা যায় কিনা। আমার মনে হয়, দিল্লি বা মুর্শিদাবাদে কিছু এখন নেই আর টেবিল ম্যানার্স।
অনসূয়া বললেন, আমি কিন্তু একটা কথা খুব ভাবি। রূপুকে ওরা কালো বলে ঠাট্টা করবে না তো?
তা একটু করবে। সুমিতি বললো, আপনার ছেলে তো সত্যি দুধে-আলতা নয়।
না হয় রংটা চাপাই হলো, অনসূয়া বললেন, কিন্তু এমন দুটি চোখ, এমন নাক?
মনসা বললো, তুমি ওর হাসির কথাও বলতে পারো। বিলেতের কিশোরীরা হাসি শিখবার জন্য ওকে মাইনে দিয়ে রাখবে দেখো!
রূপু খিল খিল করে হেসে উঠলো।
সুমিতি বললো, নিজের ধনদৌলত দেখিয়ে বেড়ানো—
কিন্তু রূপু আরও জোরে হেসে উঠলো।
নৃপ বললো, জোরে হাসা নাকি ইংল্যান্ডে নিষেধ।
অনসূয়া এই সুখটুকুকে সঙ্গী করে সংসারের তদ্বির করতে গেলেন। সেদিনই সন্ধ্যার আগে লাইব্রেরি আর নৃপর ঘরের সামনে দূরে এক ব্যালকনিতে মনসা নৃপকে আটক করলো। বললো, কথা বলি দাঁড়া। দাদা, তোকে এ পোশাকে ভালো দেখায় না। তুই কি সিল্কের স্যুটও পরবি?
বাহ, খারাপ দেখাবে কেন? সিল্কে খারাপ দেখায়? তুই কড়িয়াল পরে আছিস না? বিয়ের সময়ে বেনারসী পরিসনি?
দেখ্, দাদা, ছোটবেলায় মিথ্যা বলার জন্য তোর কাছে বেশ মার খেয়েছি। আমি জানি মিথ্যার উপরে তোর রাগ দিশেহারা। সত্যি করে বল, তুই এমনকী বিয়ের দিনও সিল্ক পরেছিলি? তা আর হতে হয় না। বউদির নিজের তো খদ্দর। আর সে বলমাত্র তুই সিল্ক পরলি?
যা-যা, কি কথা!
বল্, খুব ভালোবাসিস বুঝি? সেজন্য এমন সেজে থাকিস? কিন্তু শোন্, এভাবে তোকে শুধু বড়লোকের ছেলে মনে হয়। সত্যি করে বল্, খবরের কাগজ পড়ে পড়ে তোর এই দশা? এত রাগ?
এর মধ্যে খবরের কাগজ কেন? কী থাকবে কাগজে? সিল্কের বিজ্ঞাপন? আজকাল কাদোয়ায় বুঝি খুব খবরের কাগজ পড়া হয়?
না হয় আমার ছোট্ট গ্রামে তোর গ্রামের তুলনায় কাগজ খুব কম যায়। তোর গ্রামেও জেঠামশাইয়ের গুলোকে বাদ দিলে কখানা শুনি? তুই আজকাল কথাও কম বুঝিস বুঝি?
নৃপ মনসার সঙ্গে সিল্কের আলোচনায় একরকম লজ্জা বোধ করছিলো। সে তাড়াতাড়ি গ্রামে আসা খবরের কাগজের সংখ্যাকে চেপে ধরলো। বললো, কাগজ না পড়া একদিক দিয়ে ভালো কিনা বল্? গ্রামে রেডিও নেই এটাও ভালো।
কেন ভালো?
অশান্তি নেই। গ্রামে ঘুরে দেখ।
মনসা যেন সিল্কের কথা ভুলে গেলো। সেও তো নিজের মনে আনন্দকে খুঁজে পাচ্ছে না। অশান্তি আর আতঙ্কই আছে সেখানে, যার উপরে যেন হাসি ফুটিয়ে রাখা মুখে, আর তা বাড়ির আর সকলের জন্য। স্বাধীনতা যেন আলোর মতো কিছু নয়, যেন নিছক এক লজ্জায় কিছু দূরে সরা। না, উৎসব কোরো না। যে কথা সে ভাবতে চায় না তাই যেন মনে পড়ে গেলো। সে বললল, আচ্ছা, দাদা জানিস, বিপিনবাবু বলছিলো–যারা দাঙ্গা করেছিলো তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে দাঙ্গার দর্শনই প্রতিষ্ঠা পায়।
দু’এক মিনিট নৃপ উত্তর দিলো না। সেই সুযোগে মনসা মনটাকে আবার গুছিয়ে নিলো। বললো, তোর এখন মুড নেই। যা। বউদি এখনই গা ধুয়ে এসেছে ঘরে। রজনীগন্ধার ঝাড়ের পাশে একটা চাপার মালা রেখে এসেছি। ব্যবহার করিস। যা। আমি কফি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
.
একদিন নৃপনারায়ণ অন্য আলাপ করতে করতে কথাটা পাড়লো। রূপুর সঙ্গে কে কে যাচ্ছে?
সদানন্দ যাবে বন্দর পর্যন্ত। আর কেউ নয়? অবিশ্যি আমি যেতে পারি।
সান্যালমশাই বললেন, বেশ তো, সস্ত্রীক যাও না। ঘুরে আসাও হবে। রূপুরও ভালো। লাগবে।
সুমিতি হয়তো অন্যত্র যেতে চাইবে।
আমি ভেবেছিলাম তোমরা এখন এখানেই থাকবে কিছুদিন। সান্যালমশাই বললেন।
