আমার সঙ্গে শৈবলিনীর মিল আছে কিনা বলা শক্ত, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, শৈবলিনীর ননদের নাম মনসা রাখলেই ভালো হতো। তুমি যখন উলু দিয়ে উঠলে তখন তোমাকে দেখে ভাবলাম, এই মেয়েটিই কি নুলো বিপিনকে দিয়ে বাজি পটকা তৈরি করিয়েছিলো।
খবরটা তোমার জানার কথা নয়।
কিন্তু এসব খবর রূপুর কাছে গোপন থাকে না। আমার পরে মনে হয়েছে, সেদিন যখন তুমি এসেছিলে তখন যেন তোমার পরনে রাজপুতানি ঘাগরা ছিলো, পাল্কিতে লুকোনো তরোয়ালও ছিলো।
মনসা হাসলো। সে বললো, এবার আমায় বল, বউ, দাদা কী ফুল ভালোবাসেন?
কেন?
আমরা গেঁয়ো মেয়ে, বাসর সাজাতে ভালোবাসি। অবশ্য আড়ি পেতে শোনার অভ্যেসও আছে।
তোমার দাদার পছন্দ তোমারই বেশি জানার কথা।
রসিকতাটা উপভোগ করলো মনসা; কিন্তু সে বললো, বউদি, বউভাতের দিন যে গহনাগুলো পরেছিলে সেগুলো বার করো, আমি তোমাকে সাজিয়ে দেবো। দাদার বেশভূষার পরিবর্তন হয়েছে, এখন তোমাকে দেশসেবিকাদের মতো নিরাভরণ দেখতে ভালো লাগছেনা।
সুমিতি মুখ নামালো। অনেকক্ষণ ধরে সে নিজের হাত দুখানার দিকে চেয়ে রইলো। মনসার মনে হলো তার চোখের পাতার দীর্ঘ পক্ষ্মগুলো তার গালের উপরে ছায়া ফেলে মুখটাকেই শ্যামলা করে দিচ্ছে। কথা বলা যাচ্ছে না, এ রকম অনুভব করলো মনসা। অবশেষে সুমিতি বললো, আর একদিন। আজ নয়। সেদিন তোমাকে সাজিয়ে দিতে বলবো।
.
মনসা সেই প্রাসাদে নানা দিক ঘুরে বাড়িভরা লোকজনের মধ্যে কথা বলার মানুষ পেলো না। শেষে সে অন্দর আর কাছারির সংযুক্ত সীমায় একতলার পশ্চিম অংশে সদানন্দর ছোটোমহলে উপস্থিত হলো। তখন বিকেলের আলো আরো আধঘণ্টা থাকবে। সে দেখলো পশ্চিমের জানলার আলোয় ছবি আঁকছে সদানন্দ। অথবা ঠিক আঁকা নয়। বাঁ হাতে তুলির গোছা, ডান হাতের তেলোয় তৈরি শঙ্খে ঠোঁট-চিবুক ডুবানো, ইজেলে লটকানো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ সে।
পায়ের শব্দে সদানন্দর স্বপ্ন ভাঙলো না। তখন মনসা এগিয়ে তার হাত দু-তিনের মধ্যে দাঁড়িয়ে বেশ স্পষ্ট করে বললো, এল গ্রেকো?
সদানন্দ চমকে ঘুরে দাঁড়ালো, মনসাকে দেখে হাসতে গিয়ে থেমে প্রশ্ন করলো, নকল বলছো?
তা কি করে হবে? তার সময়ে বউদি ছিলো না স্পেনে, যে নকল করবেন। কিন্তু মানুষটার তুলনায় লম্বা দেখাচ্ছে না?
সদানন্দ সুমিতির পোরট্রেটকে একবার খুঁটিয়ে দেখলো, বললো, বলছো? দীঘল হয়েছে? বল্লী ব্রততী মনে হয়? অর্কিডের মতো?
সদানন্দ তুলির গোছা পেলেটের পাশে রেখে বললো, হয়েছে তা হলে? থ্যাঙ্কু।বলল এবার। কবে এলে? বিপিনের তুবড়ি-ফটকা কি করলে?
বোধ হয় মায়া পড়েছে, নষ্ট করতে চাইছেন না। দাঙ্গার পরে ছ মাস যায়, আপনার স্কুল খুলতে পেরেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করেছেন।
কোডে খবর নিচ্ছে দেখছি। বলে দিও এরপরে এখানে সরকারি স্কুল ছাড়া কারো স্কুল চলবে না। তোমাকে বলতে পারি, তা যদি বলল, সুমিতির স্কুলও হবে না।
সুমিতির স্কুলের কথা শুনে মনসা অবাক হলো। কিন্তু যা সুমিতি তাকে নিজে বলেনি তা এভাবে জানতে অনিচ্ছা হলো তার। সে বরং বয়োবৃদ্ধ বন্ধুস্থানীয় মাস্টারমশাইকে খোঁচাতে বললল, সে রকম স্কুল না হওয়ার নিশ্চয় কারণ আছে, যা এখন আপনার মাথায় আসছে না।
সদানন্দ বেশ অবাক হয়ে বললো, কে বলেছে মাথায় আসছে না? সরকারের রেশম বিদ্যালয়ে পাস করা শিক্ষকই উপযুক্ত বেতন দিয়ে আনা যায়। যারা রেশমের সুতো কাটে, তাঁত চালায় সেরকম কয়েকটি পরিবারকে এনে লাখেরাজে বসানো যায়। এসবই ভাবা হয়েছে। রেশম দামী বলে মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারে, সুতোর খদ্দর যা পারে না। কিন্তু…
মনসা সুমিতির পরিকল্পনার আন্দাজ পেয়ে অবাক হচ্ছিলো, কিন্তু তা সদানন্দকে বুঝতে না দিয়ে রহস্য করে বললো, তাহলে বউদি পিছিয়ে যাচ্ছেন কেন? লোকে নিন্দা করবে ভয়ে?
নিন্দা? কৃষকদের তো লাভই হতো, বিশেষ কিষাণীদের।
যদি বলে সামন্ততান্ত্রিক ক্ষয়িষ্ণু লোভকে আড়াল করতে তা শুধু একরকম মুখোস পরা?
সদানন্দ হো-হো করে হেসে উঠলো। যা, এরকম আমি বলিনি কখনও। তা এরকম বলে বটে। আসলে, মাথায় না আসার কথা বলছিলে। তা হবে কেন?, দাদপুরী কৈবর্তদের দেখে শিখেছি। ওদের জমিটমি বাড়ানো, ঘরদোর তোলা, ছেলেমেয়ের বিয়ে এসব কল্পনা ছিলোই। পদ্মায় ভাঙতে ভাঙতে সেসব পরিকল্পনা আর নেই কারো। খোঁজ করে দেখো।
মনসা কিছুনা বলে ভাবতে থাকলে সদানন্দ আবার বললো, তুমি আজ খুবই অমনোযোগী। আচ্ছা, বেশ, শাহাজাদপুরের কথা মনে করো। এখন সেখানে অবশ্য ঠাকুরদের জমিজমা কোর্ট অব ওয়ার্ডসে। মনে করো সেখানে ছিলো শান্তিনিকেতন। কী হতো তার এখন? রসো, এঁকেনি আলো থাকতে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে সদানন্দ তুলির গোছা আর পেলেট সংগ্রহ করলো।
ধুতি-পাঞ্জাবির রূপকে অভ্যস্ত হতে হবে প্যান্ট-কোট-টাইয়ে। তার নিত্য ব্যবহারের জন্য সিল্কের স্যুটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার নালিশ, সেগুলো তাকে আড়ষ্ট করছে। নতুবা নতুন পোশাকে তাকে ভালোই দেখায়।
ওদিকে মন্মথ রায় তাগাদা দিয়েছে যাত্রার দিন স্থির করে। সান্যালমশাইকে লেখা চিঠি, কাজেই রসিকতার সঙ্গে মিশিয়ে লিখেছেন, রূপুকে যেন অবশ্যই আগে থেকে কলকাতায়। পাঠিয়ে দেওয়া হয় টেবল ম্যানার্স শিখবার জন্য।
