এইসময়ে থিসিস শেষ করে সে নিঃশাস নিচ্ছে যেন স্বাভাবিকভাবে, ঠিক তখনই শুভ্র খদ্দরে মণ্ডিত দীঘল চেহারার হিবিয়াস কর্পাসের মামলায় হাইকোর্টের রায়ে সেদিন সদ্য বেরিয়েছে এমন নৃপনারায়ণ এসেছিলো তাদের বৈঠকখানায়। কাকারই মক্কেল, কাকা পরিচয় দিয়েছিলেন আমাদের সুকৃতির বড় জায়ের ছেলে। সেদিনের সন্ধ্যাতেই একবার, পরে রাতে ঘুমোতে গিয়ে আবার মনে হয়েছিলো সুমিতির, পুরুষ কখনো কখনন, (দেখো কাণ্ড) খদ্দরের মতো শুভ্র আর পবিত্র হতে পারে!
আর কথার আলোয় ঝকঝকে চোখ নয়, বরং রাত্রির আকাশের মতোরব্ল্যাক আর ভাবনায় গভীর; এত লম্বা যে চিতার মতো রোগাটে মনে হয়, পাতলা ঠোঁট দুটোয় লিপস্টিকের ব্যবহার হয়েছে সন্দেহ হয়; তাড়াতাড়ি চোখ নামালে, মস্তবড়ো দুখানা ধুলোমাখা স্যান্ডেলের উপরে প্রায় লাল এমন মস্ত দুখানা পা।
না, সুমিতি ভাবলো, এরকম সে প্রায় তিনমাস পরে দেখেছিলো। আর তা তাদের কলেজে ছাত্র ধর্মঘটের পরের দিন বিকেলে। ছাত্রছাত্রীরা যখন পড়বেইনা, তখন অধ্যাপিকার বসে থেকে কী লাভ? সুমিতি ছাত্রছাত্রীর জটলার পাশ কাটিয়ে রাস্তায় পড়তে গিয়ে নৃপকে দেখেছিলো বক্তৃতা শেষ করতে। পরদিন বিকেলে নৃপ এসে বলেছিলো, আমাকে ডেকেছেন? সুমিতি যেন লজ্জায় মরে যাচ্ছিলো তা শুনে। তাহলে সে কি মনে মনে শুনছেন’বলার সঙ্গে হাত তুলে কিংবা চোখের ইশারা করেছিলো! যা, এমন নিলাজ সে কী করে হয়!
একদিন নৃপ বলেছিলো, আমাদের দেশ আর সমাজ নিঃশব্দে, সোরগোল না তুলে এত অজস্র আমাকে দিয়েছে, আমি তাদের জন্য তেমনইনীরবে একান্তে কিছু তৈরি করে যেতে চাই। আর এরকম ধরনের কথা যখন সে বলে, তখনই বোঝা যায়, তার গলার স্বর কেমন নিভাঁজ আর গভীর।
আর এমন সব তৈরির কথা, সৃষ্টির কথাই তো জীবনে যা কিছু সুস্বাদ তা এনে দেয়। ভালোবাসা আর সৃষ্টি, একটা গৃহ, একটা গ্রাম, আর সেখানে কিছু সৃষ্টি করার সুযোগ, গড়ে তোলার সুযোগ।
সুমিতি মাস তিন-চারের মধ্যেই বলেছিলো, আপনাদের গ্রামে, আপনাদের বাড়িতে যেতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে।
নৃপ, বোধহয়, বলেছিলো, এখন কি গ্রামে যেতে সুবিধা পাবো?মনে হচ্ছে কলকাতার বাইরে গেলে ওরা এখনও আমাকে বাইরে থাকতে দেবে না। আপনি যদি একা বেড়াতে যেতে চান…
এরকম কোনোসময়েই, বোধহয়, আমি প্রোপোজ করি…বলে সুমিতি মুখ লাল করে উঠে পালাচ্ছিলো।
নৃপ বলেছিলো, এ তো, আস্থা, সাগ্রহে। বলে সে হাত বাড়িয়ে সুমিতির হাতের পিঠে হাত রেখেছিলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলো, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ কিন্তু জজেরা সদয়, এমন নয়। হতে পারে, পুলিস জানতে চায় কার কার সঙ্গে সদ্ভাব, কার কার সঙ্গে ওঠাবসা করি।
কিন্তু এখন? শুধু খবরের কাগজের ঘটনাগুলোকে পড়তে থাকলে কি বোঝা যাবে কেন। এমন হচ্ছে? নৃপ যেন আহত কেউ, যখন ভালোবাসার কথা মনে আনাও হৃদয়হীনতা। ভাবো, তেমন পুরুষ যদি আহত হয় যুদ্ধে।
নৃপর বিলে যাওয়ার প্রস্তাব শুনে কয়েকদিন ধরে ভেবে সুমিতি স্থির করলো, তারও যাওয়া দরকার। হয়তো নৃপকে সেখানে পাওয়া যাবে নিভৃতে, সেখানে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। হয়তো বা সেখানে তার কোনো নতুন রূপ ফুটে উঠবে। আর সেই নতুন নৃপকে নিয়ে আবার তেমনি দিশেহারা হতে পারবে সে। একথা বলতে লজ্জায় মাথা নুয়ে আসে, প্রেমকেও তার শিশুটির মতোই উচ্ছল আনন্দে বাড়তে দেখছে না। অথচ নৃপনারায়ণের জন্য প্রতীক্ষা করার সুখে সে ভাবতেই পারেনি, এই দীনতা আসতে পারে তার জীবনে। বইতে আশাভঙ্গ বলে যে কথা থাকে–একেই কি তা বলে?
নৃপনারায়ণ ও সুমিতি বিল থেকে ফিরলো সাতদিন পরে। মনসা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এমনভাবে উলু দিয়ে উঠলো যে, অনসূয়াও না-হেসে পারলেন না।
জলে ও জঙ্গলে কাটিয়ে সাতদিনে স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার কথা নয়। তাদের একটু শীর্ণ দেখালো বরং। পোশাক-পরিচ্ছদ কিছু মলিন। নৃপনারায়ণের কপালে একটুকরো অ্যাঢেসিব প্লাস্টার লাগানো।
সন্ধ্যায় মনসা বললো, দাদার লাভ তো ওইটুকু, তুমি কী এনেছে, বউদি?
সুমিতি উত্তর খুঁজতে লাগলো, তখন নৃপনারায়ণ বললো, হাতে-পায়ে দু-একটা আঁচড়ে যাওয়ার চিহ্ন নেই বললে ঠিক হবে না। স্থায়ী চিহ্নের মধ্যে বোধহয় কয়েকখানা ফালা ফালা করে ছেঁড়া শাড়ি থাকবে বাক্সে। সেগুলো বোধহয় জঙ্গলের কাঁটাগাছগুলোর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মূল্যবান, মনসা।
কেন?
নতুবা আমি যখন বললাম তারই একটার আঁচল ছিঁড়ে কপালে বেঁধে দিতে, দিলো না তা। বরং দ্যাখো, বাতিল বস্তুর মতো এই ঢ্যাড়া চিহ্ন এঁকে দিলো প্লাস্টার দিয়ে।
যেন কিছুসুখী হয়েছে সে এমন ভঙ্গিতে উপভোগ করতে লাগলো সুমিতি এদের আলোচনা।
নৃপনারায়ণ বইয়ের খোঁজে পুঁথিঘরে গেলো।
মনসা বললো, বাপ রে বাপ। এমনি করে যদি সব সময়েই দুজনে একত্র থাকো আমি কথা কই কখন।
সুমিতি বললো, এখন বলো। তার আগে তুমি ধন্যবাদ গ্রহণ করো। কবে এসেছো?
তা হলো কিছুদিন। কিন্তু আমার কথা নয়, তোমার কথা বলো, যদিও তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। এসে যখন শুনলাম তোমরা বিলে গিয়েছে তখন কিছু করার না পেয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে মনে মনে সমালোচনা করলাম। শৈবলিনীকে চুরি না করলেও চলতো লরেন্স ফস্টরের। শৈবলিনীই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলো। বিল-জঙ্গল তোলপাড় করে দিচ্ছে, জলচর পাখির কোমল বুক ছিন্নভিন্ন করে রক্তাক্ত করে তুলছে বিলের জল, এমন একটি রূপবান কঠোর পুরুষকে কেউ কেউ ভালোবাসে। অতএব–
