কিন্তু এর চাইতেও বড়ো সমস্যা ছিলো সুমিতির। অথবা চিন্তার তুলনায় অনুভূতি গভীরতর বলে এরকম মনে হলো।
নৃপ ফিরে আসার দিনের সন্ধ্যায় সে তার শোবার ঘরের সাজসজ্জার অদলবদল দেখতে পেয়েছিলো। ধাত্রীর ঘরে তার শিশুর খাট সরেছে। তার নিজের পালঙ্কটি সরেছে তার শোওয়ার ঘরের অ্যান্টিচেম্বারে। শোওয়ার ঘরের নতুন চওড়া পালঙ্কে বিছানা পেতে রাখছে দাসী।
সারাদিনই সুমিতির মনের কোথাও নতুন ধরনের শাড়ি পরার, নতুন করে চুল বাঁধবার ইচ্ছা ছিলো। বিশ্রামের সময় হয়ে এলে, সে দাসীদের তৈরি বেণী বাঁধা খোঁপা খুলে চুলগুলিকে মস্ত একটা এলো খোঁপায় জড়িয়ে নিয়েছিলো। শাড়ি পাল্টেছিলো। গলার হারটাকে বদলে নিয়েছিলো। সারাদিনে দু-তিনবার দেখা হয়েছে নৃপর সঙ্গে, কথাও হয়েছে, কিন্তু অন্য অনেক কথা যেন বলা হয়নি। মাঝখানের বিচ্ছেদের দিনগুলি যেন একটা সুদীর্ঘ দ্বিপ্রহর ধন দেখা হয় না। একত্র অতিবাহিত শেষ রাত্রিটির সঙ্গে বর্তমানের সেই রাত্রিটি যেন একই লগ্নের দুটি পর্যায়। কথা বলার অপরিসীম সুখে কথা কবিতা হয়ে ওঠে, কথার চাইতেও অপরিসীম সুখ স্পর্শে। আর কপালে, কপোলে, গলায়, বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হৃৎপিণ্ডে এই এক কবিতা অনুভবকরা,দীঘল, মেদহীন, কিছু বা শ্রান্ত শরীরটা একটা শুভ্র আদর্শ, যা তার পাশের বালিশে। যা তার নিজের।
কিন্তু দশদিনের মধ্যেই এমন রাত্রিও এলো, যে যখন বিশ্রামের সময় হলো, নৃপ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললো, আসবো?
এসো।
নৃপহাতে একখানা বই নিয়ে ঢুকেছিলো। বললো, উপন্যাস যে এমন জিনিস তা মনেই ছিলো, সুমিতি। অনায়াসে তুমি নিজের মনের বাইরে যেতে পারো।
নৃপ বই খুলে বললো। সুমিতি আলোর স্ট্যান্ডটা ভাঁজ করে তার বইয়ের দিকে এগিয়ে দিলো, আর দেয়ালের আলোটা যেখানে হালকা নীল হয়ে পড়েছে সেখানে বসে উল বুনতে লাগলো।
সুমিতি সহজে মুখ তুলতে পারলো না; একবার বললো, তুমি পান খাও? পান রেখে গিয়েছে।
না।
সুমিতি মশলা এনে নৃপর হাতে দিয়ে আবার উল নিয়েই বসলো।
নৃপ উপন্যাসের নতুন পরিচ্ছেদের জন্য পাতা উল্টে নিলো। অবশেষে নৃপ বললো, ঘুম পাচ্ছে, সুমিতি।
নৃপ শুতে গেলে, সুমিতি তার মশারি ফেলে দিলো, কোন জানালাটা খোলা থাকা পছন্দ করবেনৃপ তা জেনে নিয়ে অন্য জানালাগুলো বন্ধ করে দিলো। তারপর খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে একসময়ে বললো, ছেলেকে দেখে আসি।
যাও।
সে রাতে আহ্বান ছাড়াই ফিরে এসেছিলো সুমিতি। দেখেছিলো, চিন্তা করার সময়ে গালে হাত রাখা যেমন স্বাভাবিক, ঘুমের মধ্যেও নৃপর একটা হাত তেমন রয়েছে।
কিন্তু রোজ এমন হয় না। সংযুক্ত শয্যা বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক, কেউ বলেন কর্তব্য। সুমিতি নিজেকে কর্তব্য পালনে বাধ্য করলো বটে, কিন্তু অনেক রাত্রিতে শোবার ঘরের অ্যান্টি-চেম্বারে কতকটা পালানোর ভঙ্গিতে রাত কাটিয়েছে সে একাধিকবার–এ অবস্থায় দাসী তাকে আবিষ্কারও করেছে।
এই অবস্থায় নিজের প্রেমকে বিশ্লেষণ করে দেখলো সে একদিন। তা অবশ্য পরীক্ষার উত্তর লেখার মতো ঠাণ্ডাভাবে হয় না। অনুভূতি ঠিকঠাক মনে পড়লে সে রাঙা হয়েও উঠতে থাকলো।
বিশ বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত ভালোবাসার কথা তার আদৌমনেহয়নি। তখন পরীক্ষায় ভালো ফল করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে ইচ্ছা ছিলো না। আই.সি.এস. অথবা ব্যারিস্টার হওয়ার কথা ভাবতে ভালো লাগতো। সমান বংশের সহপাঠিনীরা বিয়ের কথা, প্রেমের কথা বলতো। সমান বংশের কিছু পরিচিত কোন ছাত্রটি আই. সি. এস. বা আই. পি. এস. বা ব্যারিস্টার হয়ে নিশ্চয়ই আসবে উপযুক্ত প্রেমপাত্র হয়ে, এরকম তারা আলোচনা করতো। সুমিতির কাছে নিছক নিষিদ্ধ আলাপের সাহস দেখানোর বেশি কিছুমনে হয়নি সেসব কথা। যখন গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করতে সে আলাপ, তখন তা সুমিতির কাছে হাস্যকর মনে হতো; কারণ তাদের কথায় সেসব যুবক রবীন্দ্রনাথের তৈরি অমিত রায়ের নামের পরিহাস হতো।
তাদের অনেকেই মাঝে মাঝে খদ্দর পরতো। দেশবন্ধু এবং জে. এম. সেনগুপ্তর পরে তখন খবরের কাগজে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খদ্দর-পরা মানুষদের সংবাদ না-পড়াটাকে অন্যায় মনে হতো, সাহেবদের দিকে ঝোঁকটা নিশ্চয়ই আর আধুনিকতা ছিলো না। স্যার উপাধি পাওয়া তখনও ব্যবসায় সাফল্যের নিরিখ হলেও, তখন আর তা স্বপ্নে দেখা আদর্শ ছিলো না। সহপাঠিনীদের মধ্যে খদ্দর পরে, শোভাযাত্রায় যোগ দিয়ে, সারা দিনের রোদে ক্লান্ত হয়ে ধুলো মেখে বাড়ি ফেরা দুর্লভ উদাহরণ ছিলোনা। জানলা-দরজার পর্দা, বিছানার চাদর ইত্যাদি, ডিনার টেবিলের ঢাকনা ক্রমশ খদ্দরের হয়ে উঠছিলো। এতে অনেকক্ষেত্রে ফ্যাসানমাত্র ছিলো, অনেকক্ষেত্রে আন্তরিকতা ছিলো। কিন্তু লাঞ্চ, ব্রেকফাস্ট, ডিনার ছিলো বহাল। সে সব টেবিলের খদ্দরের ঢাকনার উপরে পাত্রগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনের সিরামিক হয়ে উঠলেও টেবল সাজানোটা বিলেতি কায়দার ছিলো। বাইশ থেকে পঁচিশ তো তার থিসিস করতেই কেটে গেলো। তার পক্ষে তখন বিয়েটিয়ের কথা যেমন, তেমন রাজনৈতিক শোভাযাত্রায় যোগ দেবারও সময় ছিলো কি? অন্যদিকে তার থিসিসের বিষয়টাই যেন গ্রামের অর্থনীতির দিকে তাকে টানছিলো, তেমন বিয়ের কথা উঠলে সে সংকীর্ণ হতো, পুরুষ জাতটাকেই এড়িয়ে চলার বিষয় মনে হতো।কথাটা হয়তো ভালো নয়, তেমন স্পষ্ট করে বলাও নয়, কিন্তু তার মনে হতো যেন প্যারাসাইটের মতো যা তোমাকে নোংরা করে। তার মাসতুতো, খুড়তুতো দিদিরা বিয়ের পনরো বছরের মধ্যে গোলালো, মোটা পুতুল হয়ে গিয়েছে, যারা শুধুইংরেজী কায়দায়, হয়তো খদ্দরের, হয়তো শান্তিনিকেতনের চাদর বিছিয়ে, পার্টি দেয়। তাদের মধ্যে বংশপরম্পরায় এই কায়দাই। যদিও খুঁজলে দেখা যাবে, কায়দাটা নিম্নমধ্যবিত্ত ইউরেশিয়ান কোনো গভর্নেসের কাছে শেখা, যার পক্ষে সত্যিকারের ইংরেজি উচ্চমধ্যবিত্তের কায়দা শেখাও সম্ভব নয়। পুরুষরা যেন অপবিত্র, ক্ষুধার্ত কিছু–এরকম মনে হতে থাকলে, সুমিতির এরকম ভয়ও হয়েছিলো, সে কি যাকে ফ্রিজিড বলে তেমন কিছু? একসময় ভেবেছিলো সে হয়তো তাই, আর তার জন্য দায়ী হয়তো তার দিদি, সুকৃতির মৃত্যু। যদিও সেই মৃত্যুর সময়ে তার বয়স হয়তো চার, হয়তো পাঁচ, শোক মনে থাকার কথা নয়।
