যাও, কিন্তু বেশি দেরি কোরো না, বউমা।
মনসা সান্যালবাড়িতে পৌঁছে দেখলো নৃপনারায়ণ এবং সুমিতি বিলে গেছে। সে শুনলো রূপু বিলেতে যাচ্ছে। ধাত্রীর ঘরে সুমিতির ছেলেকে সে আবিষ্কার করলো। তখন নিজের ছেলে এবং সমিতির ছেলে নিয়ে সে সমস্ত বাড়িটা পরিপূর্ণ করে তুলো। তাদের স্নান করানো খাওয়ানো নিয়ে একদিন ধাত্রীকে ধমকেও দিলো–তুমি পাস করা লোক বাপু, কিন্তু ছেলে হওয়াটা দেখে শেখা যায় না। কিন্তু পাছে ধাত্রী কষ্ট পেয়ে থাকে এই মনে করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছুতো করে একটা দামী শাড়ি তাকে উপহার দিয়ে বললো। রান্নার মহলে পা ছড়িয়ে বসে গল্প করতে করতে নৃপনারায়ণ ও সমিতির সম্বন্ধে সে খবর সংগ্রহ করলো। একটি অল্পবয়সী পরিচারিকা যখন প্রকারান্তরে বললো তাদের শোবার ঘর আলাদা তখন মনসা গালে হাত দিয়ে বললো, ও মা,বলিস কী!বউদি বুঝি অনেক রাত পর্যন্ত মোটা মোটা বই পড়ে? কিন্তু জেঠিমার সামনে মুখেও আনিস নে।
কিন্তু অনসূয়ার কাছে বসে তার চুল বাঁধবার চেষ্টা করলো না সে কৌশল করে। বরং গম্ভীর সুরে বললো, তোমার কোনো অসুখ করেছে, জেঠিমা?
না।
করেছে বৈকি, নতুবা এমন রুক্ষ দেখাত না। কী হয়েছে বলল, নতুবা মাস্টারমশাইকে বলবো সদর থেকে ডাক্তার আনতে।
অনসূয়া হাসলেন, দোহাই মা-মনসা, তুমি থামো।
মনসা থামলো বটে কথাটাকে ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্যই। সে বললো, জেঠিমা, যে-অনুমতি দিতে এত কষ্ট, না-ই বা দিতে।
মেয়েদের কষ্টই সইতে হয়।
তা যদি বলল, তাহলে বলবো হয়তো তুমি ভালোই করেছে।
এ কথা বললি যে?
আজ নয়। পরে জানাবো তোমার এ কষ্ট স্বীকারে লাভ হয়েছে কিনা।
.
বিলমহলে যেতে তখনও দিন সাতেক দেরি। বিলমহলের তহশীলদার এসেছিল খবর পেয়ে। সে বজরা ইত্যাদি, বাংলো ইত্যাদিকে সাজিয়ে নিতে দিন সাতেক আরও সময় নিয়েছে।
তখন একদিন সুমিতিকে অবাক হতে হলো নূপনারায়ণ এরই মধ্যে একদিন বলেছিলো বটে, তার খদ্দরের ঝোলাটাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কথাটা যে সত্যি তা যেন প্রমাণ করতে হলো। খদ্দরের বদলে গরদ উঠলো গায়ে, সদর থেকে ফরাসডাঙার ধুতি এসে গেলো। পিতামহীর কাছে পাওয়া সেই মণিটা আংটি হয়ে আঙুলে উঠলো। এ নৃপনারায়ণ যেন অনির্বচনীয়। কিন্তু কী ঘটেছে, অবাক হয়ে যাচ্ছে সুমিতি, যার ফলে যন্ত্রণা, সুখ, অপমান আর তেজের সেই যোদ্ধার বেশ ত্যাগ করতে হলো?
সেদিন রাতে মশারির ভিতর থেকে খাট থেকে নেমে এলোপ। শোবার ঘরের সরু সোফায় বসে টেবল ল্যাম্পের ছোট সাদা বৃত্তটার মধ্যে বইসমেত দু হাত রেখে সুমিতি পড়ছে। ঘরের নীলাভ আলোর বড় বৃত্তটা ছোট সাদা বৃত্তটাকে তার কোলের উপরে কাটছে।
নৃপনারায়ণ বললো, কী পড়ছে? সুমিতি বই ধরা হাত দুটোকে একটু কাত করলে, মলাট দেখতে পেয়ে নৃপ আবার বললো, ওয়ালডেন, সেই বুড়ো থরো?
সুমিতি হেসে বললো (সে তো না হেসে কোনো কথাই বলে না), ওয়ালডেন, লিখবার সময়ে থরো কি খুব বুড়ো হয়েছিলেন? জানি না।
নৃপ খানিকটা দ্বিধা করলো, বললো পরে, বোধহয় বিশ্বাস হারানোর কথা। আচ্ছা তোমার কি মনে হয় না, আমরা যাকে প্রাণ মনে করতাম, নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে মেনে নিয়েছি, অন্য পথে গিয়েও যাঁর দিকে চেয়ে থাকতাম,ইদানীংতাকে কেউ কেউ অচল সিকি বলতে আরম্ভ করেছে? সেই শুভ্রতা, সেই সবুজ, সেই উদার নীল যেন কোথাও হারিয়েছে।
এ কথা কি বিশ্বাস করবো যে তার প্রভাব ইতিমধ্যে কমে যাচ্ছে?
নৃপ একটু ভেবে বললো, যেন নেতাদের উপরে বেশি তা! আর তিনি নিজেও অনুভব করছেন, আমাদের চিন্তায় অস্বচ্ছতা ছিলো। এ কথা অস্বীকার করা যায় না, আমাদের অহিংসা ভীরু ও দুর্বলের ছিলো। সে অহিংসা না বুদ্ধিদীপ্ত না শক্তিমানের। নতুবা এতবড় দাঙ্গায় সত্য ও অহিংসাকে আশ্রয় করে আর কাউকে দাঁড়াতে দেখা গেলো না, সুমিতি?
সুমিতি বললো, পরিস্থিতিটা জটিল সন্দেহ নেই। তুমিও কি বিশ্বাস হারিয়েছে? সুমিতি বেশ ভঙ্গিভরে হাসলো। হতে পারে খদ্দর ছেড়েছে আজ। অস্বীকার করছি না আমার ধোঁকা লাগছিলো। ওদিকে স্বীকার করছি, আমারই লাভ, নতুন পোশাকে আরও ভালো লেগেছে যেন, কিন্তু এবার কী বলবে বলো। এইরকম অনুভব করতে করতে সুমিতি হাতের মোড়া বইটাকে টিপয়ে টেবল ল্যাম্পের গোড়ায় রাখলো। নৃপর দিকে তার বড় বড় চোখ মেলে দিলো।
নৃপবললো, অস্বীকার করে লাভ নেই। হিংসার্জিত স্বাধীনতার চাইতে অহিংসালব্ধ স্বাধীনতা বেশী ভালো এরকম মানতে দ্বিধা আসছে যেন। খদ্দরকে স্বাবলম্বন আর মিতাচার মনে করতে সন্দেহ আসছে। হয়তো বিদেশী বণিককে আঘাত দেওয়ার কৌশল। জানো, নৌধর্মঘটটা যখন মিটবার পথে, যখন ধর্মঘটীদের মনে কিছুটা কমেছে টেনশান, তাদের কেউ কেউ হেরে যাওয়া মানুষের ক্লান্তিতে হাসছিলো। বলেছিলো, অহিংসা, খদ্দর ও সত্য ছাড়াও তো দেশের অনেকটা জায়গার স্বাধীনতা আসছে, দেশের বাকি অংশে যদি অহিংসায় স্বাধীনতা আসেই।
সুমিতি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, পাওয়ার চেষ্টাটা কীভাবে হলো, তা কি কী পেতে চাই তার সমান মূল্যের নয়?
নৃপ উত্তর দিতে পারলো না সঙ্গে সঙ্গে। কিছুক্ষণ পরে বললো, তুমি কি আর একটু পড়বে? আমি বরং ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসি। কত আর হয়েছে রাত!
নৃপ চলে গেলে দরজার বাইরের অন্ধকার দেখে সুমিতি ভাবলো : এটাকে কি খদ্দরকৃচ্ছতার প্রতিক্রিয়ামাত্র ভাবা যাবে না, এই গরদে ফিরে আসা?
