পুরনো অনুভূতির স্মৃতিতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে অনসূয়া যেন কাউকে লক্ষ্য করে বললেন, আসলে, ভেবে দেখো, খদ্দরপরাপর সঙ্গে শিকার করা কি মানায়? খদ্দরটা কি জীবনের একটা ভঙ্গি নয়? ইমেজটাকে এভাবে নষ্ট করে দেবে?
কিন্তু কথাগুলো মনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠতে না-উঠতে কে যেন সেখানে বলে উঠলো, তা কেন, তা কেন; আর তাহলেও দোষ দিতে পারি না, একজনের প্রভাব তো সেই সেবার সান্যালমশাইও স্বীকার করে নিয়েছিলেন, নৃপর এই পরিবর্তনেও যদি অন্য কারো প্রভাব?
সান্যালমশাই বললেন, কথা কইছো না।
অনসূয়া যেন ভয় পেলেন। কেউ যেন বললো, সেদিন এখানেই, অনসূয়া, সুমিতির জন্য পৃথক বাড়ি করার কথা বলে ফেলে, নিজেকে ভয় করছে।
অনসূয়া বললেন, তুমি পড়ো না হয় এখন।
তিনি উঠে গেলেন।
রূপু এসে বললো, মা, দাদার সঙ্গে আমি যাবো?
তুমি কোথায় যাবে? এই তো কয়েকদিন পরে কতদিনের জন্যে তুমি চলে যাচ্ছো। এখন কি আর তোমাকে ছেড়ে দিতে পারি?
রূপু হাসিমুখে চলে গেলো।
কিন্তু নৃপনারায়ণের বিলমহলে যাওয়ার ঠিক আগের সন্ধ্যায় সুমিতি এসে দাঁড়ালো কাছে। আজকাল কাজের ভার কিছু কমে গেছে অনসূয়ার। এটাও দাঙ্গার সময় থেকে শুরু। কতকটা যেন সুমিতিকে অন্যমনস্ক রাখবার জন্যেই সাংসারিক হিসাবপত্র রাখবার দায়িত্বটা সুমিতির হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। প্রচুর রঙিন উল এনে একটা গালিচা বুনতে শুরু করেছেন অনসূয়া সেই অবসরে।
কিছু বলবে তুমি, সুমিতি?
কাল একটু বিল দেখতে যাবো কিছুটা বা সলজ্জ ভঙ্গিতে বললো সুমিতি।
বিল দেখতে মানে, খোকার সঙ্গে? বিল তুমি দ্যাখোনি, দেখতে ইচ্ছে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার ছেলের অসুবিধা হবে না তো?
ধাত্রী বলছিলো তা হবে না। আর তাছাড়া আপনিই তো রইলেন।
অনসূয়া একটু হেসে বললেন, আমার এ সংসারে অনেকদিন হলো, সুমিতি; আমি কিন্তু এ পর্যন্ত বিল দেখিনি। যাও।
অনসূয়া সান্যালমশাইকে পেলেন লাইব্রেরিতে। হেঁট হয়ে নিচের দিকের তাকে একখানি বই খুঁজছিলেন তিনি।
অনসূয়া বললেন, গল্প করতে এলাম।
চলো তাহলে। আমিও বেঁচে গেলাম। সদানন্দর জ্বালায় ‘থরো’র লেখা বই আর খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই।
অনসূয়া বললেন গল্পের ঝেকে, কোন থরো? সেই যে যিনি উত্তরাধিকারের অর্থবিত্ত প্রতিষ্ঠাকে কুকুরের লেজে বাঁধা টিন বলেছেন।
কতকটা বটে।
পুঁথিঘরের একটি কোণে মুখোমুখি দুখানা চেয়ারে বসলেন দুজনে।
সুমিতিও যাচ্ছে।
এ খবর তো জানতাম না। ভালোই হবে। বাইরের পৃথিবীতে গিয়ে ওরা পরস্পরকে আরও ভালো করে চেনে এটা বোধহয় লাভজনক হবে।
নৃপর ছেলের কথা ভেবেছো?
ধাত্রী রয়েছে তো। তোমার উপরে নির্ভর করে এ বাড়ির এতগুলো লোকের যদি চলে, তবে ফিডিং বটু করে একটু দুধই যার একমাত্র দাবি তার কেন চলবে না?
অনসূয়া উঠে নিজের ঘরে গেলেন। কুলুঙ্গিতে শিবমূর্তির সম্মুখে ঘৃতের প্রদীপটি জ্বলছে। সমস্ত বাড়িটার বাসকক্ষগুলোয় যে কয়েকটি প্রদীপ আগে সন্ধ্যায় জ্বলে উঠতো তার মধ্যে এই একটি অবশিষ্ট আছে বলেই যেন এটি আজকাল অনেকক্ষণ জ্বলে। সেখানে গিয়ে কিছুটা সময় তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর মনে হলো দাঙ্গার সময়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে এই জায়গাটাতেই প্রার্থনা করে তার দিন কেটেছে। একটু লজ্জিত হলেন এইজন্য যে, প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতেই প্রার্থনার সময় কমে গেছে, ঐকান্তিকতা ফিকে হয়ে এসেছে। অনসূয়া একটা ছোটো ধূপদানে কিছু কালাগুরু জ্বালিয়ে দিলেন। সেই দাঙ্গার সময়ে তার বাল্যের প্রার্থনাগুলোই যেন বেশি মনে পড়তো। বাবার পাশে বসে অতিশৈশবে যে-প্রার্থনা তিনি করতেন সেগুলো যেন মনকে আশ্বাসে এবং শৈশব নির্ভীকতায় পূর্ণ করেও দিতো। তারই একটা প্রার্থনাকে মনে মনে বেছে নিয়ে তিনি ‘পিতা নোহসি’ বলে শুরু করলেন। কিন্তু অনেকটা সময় চেয়ে থেকেও তন্ময়তা কিছু এলো না। অকস্মাৎ চোখের জলের কাছাকাছি গিয়ে তিনি বিড়বিড় করে বললেন, আমার হৃদয় পুত্রহীন কোরো না, পুত্রহীন কোরো না।
খবরটা পেয়েও মনসা যথাসময়ে আসতে পারেনি। সে ভাবলো অনসূয়া শাশুড়িকে লেখেননি, কাজেই যাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য অন্য প্রতিবন্ধকও আছে। নুলো বিপিন যে দামী দামী বাজি পটকাগুলো তৈরি করেছিলো সেগুলোর একটা ব্যবস্থা না করলে যাওয়া যায় না। নুলো বিপিনকে বলতেই সে বললো, হাতের কাছে পদ্মা থাকতে চিন্তার কিছু কারণ নেই। কিন্তু প্রয়োজন কি ফুরিয়েছে? বিপিনের কথায় মনসার অস্বস্তি বাড়লো। খবরের কাগজের ভাষায়, কিছু একটা ঘটতে চলেছে। যা ঘটবে তা কি দাঙ্গার চাইতে ভয়ঙ্কর হতে পারে? তখন কেউ কেউ দাঙ্গাকে মানি না বলেছিলো, এখন? শাশুড়িকে বলতেই তিনি বললেন, সে কী, বউমা, আমি কি কোনোদিন নিষেধ করেছি? তখন মনসা বাধাটার স্বরূপ দেখতে পেলো।শাশুড়ি নিষেধ করবেন না, পদ্মায় পটকাগুলো ডুবিয়ে দেওয়া যায়, এ দুটোর একটিও তার নিজের অজ্ঞাত নয়। মনসার মনে পড়লো, সুমিতিকে নৃপনারায়ণ সম্বন্ধে তার নিজের হৃদয়ের এমন কিছু সে বলে এসেছে যেটা একটা কুণ্ঠার মতো মনে জাগছে। রসিকতার ‘হ’লেও যদি সুমিতি নৃপনারায়ণকে সে সব কথা বলে থাকে তবে অনেক দিক দিয়েই মনসার পক্ষে নৃপনারায়ণের সম্মুখে মুখ দেখানোকঠিন হবে।কী যেন একটা যুক্তি ছিলো কথাগুলো বলার, সেটা মনে করার চেষ্টা করলো মনসা। দু-একদিন সাত-পাঁচ ভেবে এক দুপুরে মনসা শাশুড়িকে বললো, আমি একটু দাদাকে দেখে আসি।
