নৃপ হো-হো করে হেসে উঠলো। সান্যালমশাইয়ের তামাক এসেছিলো। গড়গড়ার নলটা হাতে নিয়ে ভৃত্য চলে গেলে তিনি বললেন, কালাপানি কথাটা চাটগেয়ে লস্করদের ভাষা কিনা জানা দরকার। তা যদি হয়, তুমি বলতে পারো, যারা কালাপানি নিয়ে হিন্দু সমাজকে ঠাট্টা করেছে তারা যে চাটগেঁয়ে শিককাবাবের দোকানে কথাটা শিখেছিলো তা ধরে নেওয়া যায়। সেকালের কলকাতায় চাটগেঁয়ে রুটি ও চিংড়ি ভাজার দোকান ছিলো বোধহয়।
নৃপ কিছুসময় লঘু সুরে বলা সান্যালমশাইয়ের কথা কয়েকটিকে অনুভব করার চেষ্টা করলো।
কিন্তু একসময়ে আবার নিজের হাতের পত্রিকাখানি বন্ধ করে বললো, একটা ব্যাপার কিন্তু সামঞ্জস্যহীন। তুমি নতুন করে ঘরবাড়ি তুলছো গ্রামে আর রূপুকে পাঠাচ্ছে বিদেশে। সে কি ফিরে এসে এই গ্রামেই থাকবে?
কেন থাকবে না? গ্রামে থাকা না-থাকার সঙ্গে য়ুরোপ যাওয়ার কিছু যোগ আছে? এ কথা তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে চাটগাঁয়ের লস্কর যারা বছরে দুবার বিলেতে যায় তারা ছুটি পেলেই গ্রামে ফিরে আসে। অথচ রায়রা এ গ্রাম ছেড়ে গেলো য়ুরোপ না গিয়েই।
তার কারণ, তোমার সঙ্গে পাঞ্জায় পারলো না।
তাও হতে পারে। কিংবা গ্রামমুখো হওয়াটাই একটা আলাদা মানসিক গঠন।
কিন্তু রূপু যে অতবড়ো ডাক্তার হয়ে আসবে সে কি গ্রামে বসে থাকার জন্যে?
তুমি ঠকে যাচ্ছে। আমি খুশি হয়েছি রূপুকে তুমি গ্রামোদ্যোগ করতে বলোনি বলে। কিন্তু তুমি কি বড়ো সুদের কথা ভাবছো না?
নৃপ হাসিমুখে বললো, কেন, কেন?
শিক্ষার খরচটা বৃথা না যায় সেই মতলবই তুমি আঁটছো। চিন্তার কথাই হতো যদি নির্জনতার কোনো মূল্য না থাকতো। ভাবো না হয় সেই ঠাকুর জমিদারের কথা, তোমাদের মা যাঁর কথা বলে থাকেন।
আপাতত এর কোনো উত্তর নেই। শান্তিনিকেতন কি খুব প্রভাবিত করেছে রূপুকে? তবে এ কথা বলা যায় রূপুর হাতে তোমার জমিদারির শ্রীবৃদ্ধি হবে না।
পুত্রকে না দিয়ে পৌত্রদের হাতে ওটাকে তুলে দেওয়ার নজির আছে। বলে সান্যালমশাই হাসতে লাগলেন।
কিন্তু রূপুর বিলেত যাওয়ার ব্যাপারে ডাক্তারি পড়া যে মুখ্য নয় তা যেন সান্যালমশাইয়ের মনোভঙ্গি থেকেই স্পষ্ট।
.
নৃপনারায়ণ গ্রামে আসবার তিন-চার সপ্তাহ পরে কথাটা উঠলোসে বিলমহলে যাবে। অলিন্দে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করা যায় দু-একজন বরকন্দাজ তাদের পিতল বাঁধানো লাঠি আমরুলের পাতা দিয়ে ঘষে ঘষে ঝকঝকে করছে। বিলমহল থেকে কয়েকজন জেলে এসেছে। তাদের ফরমায়েস মতো নৌকোর দাঁড় ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। বাড়ির ভিতরে তারণের মা-ই তোলা-উনুন তৈরিতে সব চাইতে পারদর্শী, সেনানা গড়নের কয়েকটা উনুন তৈরি করে রোদে দিয়েছে, এবং সেগুলির খবরদারি করছে। রান্নার মহলে মুগ শুকিয়ে ডাল তৈরির ব্যবস্থা হচ্ছে। চেঁকিশালে নৈমিত্তিক কাজ ছাড়াও কাজ হচ্ছে, বিল মহলের জন্য দুরকম চালই লাগবে। রান্নার মশলা যেখানে ভাজা হচ্ছে সেখানে দাঁড়ানো যায় না। তীব্র সুগন্ধে নাক জ্বলে ওঠে, চোখে জল আসে।
অনসূয়ার মনে পড়লো তার প্রথম যৌবনের কথা। তখনকার দিনে সান্যালমশাই প্রায়ই বিলমহলে যেতেন। যাবার দিন ছলছল চোখে বিদায় দেওয়াই নয় শুধু, তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত দীর্ঘ দুঃখের রাত্রি অতিবাহিত করা, ঝড়ের রাত্রিতে জানলার গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকে ভাগ্যবিধাতার কাছে আকুল প্রার্থনা করা বহুকাল তাকে স্বাভাবিক জীবনের উপাদান হিসাবে এগুলিকে গ্রহণ করতে হয়েছিলো।কাজেইনৃপ বিলমহলে যাবে শুনে তিনি ততটা বিস্মিত হলেন না। কিন্তু সেখানকার কাছারি বাংলা কী অবস্থায় আছে, বজরা বা বোটে রাত কাটাতে হবে কিনা, তাহলে বোটের অবস্থা কীরকম আছে, এসব প্রশ্ন তুললেন। তিনি জানতে পারলেন সান্যালমশাইয়ের সেই বজরাটা এখন আর নেই। নায়েবের জন্য যেটি কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছে সেটা আছে। সেটাও খুব ছোটো নয়–চার কামরার।
কিন্তু অনসূয়া জানতে পারলেন জমিদারির কাজে নৃপরায়ণ বিলে যাচ্ছে না, প্রমোদ-ভ্রমণই উদ্দেশ্য এবং তার অংশ হিসাবে শিকারের ব্যবস্থাও হচ্ছে। সদানন্দ সঙ্গে যাচ্ছে না; দু-তিনজন কর্মচারী যাচ্ছে যাদের বন্দুকের লাইসেন্স আছেনৃপনারায়ণের যা নেই।
তিনি সান্যালমশাইকে বললেন, সেখানে কি শিকারের ব্যবস্থা হচ্ছে?
ব্যবস্থা এমন কিছু নয়। সেখান থেকে যারা এসেছিলো তারা বলছিলো বটে বিলে শিকারের মতো পাখি প্রায়ই থাকে, আর তাছাড়াও বিলের জঙ্গলে কয়েকটি বাঘ উৎপাত শুরু করেছে।
আবার যখন অনসূয়া কথা বললেন তিনি মন্তব্য করলেন, শিকারের উদ্যোগ হচ্ছে এ আমি জানতাম না।
তার মনটা ভার হয়ে গেলো। জীবনের একটা ভঙ্গি আছে যার সঙ্গে বিলে-জঙ্গলে পাখি শিকার করে বেড়ানো খাপ খায় না। যেমন খাপ খায় না নাচওয়ালীর নাচ, কিংবা মদের নেশা। অনসূয়ার মনে পড়লো, সেই অনেক আগে একবার মন্মথ রায়ের শিকার ব্যবস্থার মাঝখানে চিঠি লিখে শিকার বন্ধ করতে পেরেছিলেন। দেখা যাচ্ছে চিরকালের জন্য তা বন্ধ হয়নি।
সেই অনেকদিন আগে স্বামীকে যে যুক্তিগুলি দিয়েছিলেন, সেগুলোও মনে ফিরে এলো। তিনি বললেন, শিকার, মদ,নাচওয়ালী এসব সামন্তপ্রথার রোগ, আমি এমন মনে করি না। রোগও নয়, বৈশিষ্ট্যও নয়। শহরের ব্যারিস্টার পাড়ায়, দোকানদারদের মধ্যে, অধ্যাপক, ডাক্তার, হকার, গ্রামের ডোমপাড়ায় মদের কিছু ঘাটতি নেই। তাদের মধ্যেও খেলার ছলে প্রাণীহত্যা পাবে। সিনেমায় যদি, ক্যাবারেতে যদি নাচওয়ালী, নিজের বৈঠকখানায় তুলে আনলেই তারা সামন্তদের বৈশিষ্ট্য হয় না, যে তাকে ধরে রাখতে হবে।
