এইভাবে রূপুর বিদেশ যাওয়া স্থির হয়েছিলো।
.
বাংলোটির নাম হয়েছে সুমিত। রূপুর দেয়া নাম। গেটে রূপুর পরিকল্পনা অনুযায়ী কালোপাথরের ট্যাবলেটে ব্রোঞ্জের অক্ষর বসিয়ে ইংরেজি ও বাংলায় নামটি লেখানো হবে। ট্যাবলেটটা সদর থেকে তৈরি হয়ে এসেছে, আজ মিস্ত্রিরা বসাবে। চারু ওভারসিয়ার রূপুকে ডাকতে এসেছিলো, রূপু দাদা ও বাবাকে সঙ্গে না নিয়ে যাবে না। তার পীড়াপীড়িতে সান্যালমশাই এবং নৃপনারায়ণ দুজনেই গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পথে রূপু বললো, বাড়িটা ভালো হয়নি, দাদা?
অনুপম হবে। এবার এসে বাড়িতে কিছু কিছু পরিবর্তন দেখছি।
তুমি ইলেকট্রিকের কথা বলছো? নাকি দীঘির ঘাটের?
হ্যাঁ, ইলেকট্রিকের কথাও বৈকি। বেশ আধুনিক হচ্ছে যেন। নৃপনারায়ণ হাসলো।
ছুতোর মিস্ত্রিদের টিনের চালা থেকে কিছুদূরে বাগান ঘেঁষে আর-একটি খড়ের চালা। সেটার দিকে ইঙ্গিত করে নৃপ বললো, ওখানে কী হচ্ছে রূপু?
টবে গাছ তৈরি হচ্ছে। বেশির ভাগ টবই অবশ্য ‘সুমিত-এর জন্যে’।
নৃপ বললো, যেভাবে বাংলোটাকে সাজাচ্ছে তাতে মনে হয় সমারোহের কিছু একটা প্রতীক্ষা করছো তুমি।
রূপু বললো, আমার সবটুকু প্ল্যান কাজে লাগানো হয়নি। একটা আঁকাবাঁকা ঝিল কাটতে হবে। সেই ঝিলে একটা ছোটো ব্রিজ থাকবে যেমন, তেমনি থাকবে ছোটো একটা বোট।
তাহলে তার পাড়ে তারের জালে ঘেরা ঝোপেঝাড়ে বুনো হাঁস আর সারস রাখা যায় কিনা ভাবতে হয়। কিন্তু বুড়ো মালী শুনেছি বর্তমানে রাতকানা। বিলের জলে ডুবে প্রাণ না দেয়।
তা যদি বলো ব্রিজে একটা লাল আলোর ব্যবস্থা থাকবে।
সান্যালমশাই বললেন, রূপু, তোমার সব পরিকল্পনা দাদাকে শুনিয়েছে? এই বলে নিজেই হাসি মুখে তার দু-একটি পরিকল্পনা ব্যক্ত করলেন। আর একটা বাংলো উঠবে। এটার মতো তত রংদার হবে না, কিন্তু আয়তনে কিছু বড়ো হবে। সেটার নাম হবে ‘অনসূয়া ভবন। সেখানে। নাকি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।
রূপু লজ্জায় মুখ নিচু করে রইলো।
নৃপনারায়ণ রূপুর দিকে হাসিমুখে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলো, আর এই সুমিতবাড়িটা?
রূপু বললো, গেস্টহাউস হতে পারে, অনেককিছু হতে পারে, একটা আধুনিক স্কুল হলেই বা দোষ কী?
সদানন্দ মাস্টারমশাইয়েরটি, শুনছি প্রায় উঠে যায়?
তা কেন? সেদিন পোরট্রেট আঁকার সময়ে বউদি মাস্টারমশাইকে অন্যরকম স্কুলের কথা বলছিলেন, যেখানে সিল্কের খদ্দর, তসর এসব বোনা শেখানো যায়, চামড়ার স্যান্ডাল, ব্যাগ এসব তৈরি করা শেখানো যায়। সে রকম হতে পারে।
নৃপ বললো, আচ্ছা! কিন্তু তোমাদের সেই স্কুলে অত লোকে যদি সিল্কের খদ্দর বুনতে শিখে যায় সে তো অনেক খদ্দর হতে থাকবে। কিনবে কে? তুমি বোধ হয় জানোনা কাপড় একরকম ফাইন হলে মিলের কাপড় খদ্দর থেকে সস্তা হয়।
রূপু বললো, সিল্কের খদ্দর পরার লোক নেই? মনে করো, বউদিরই তো তা দরকার।
নৃপ হেসে ফেলে বললো, তা ঠিক, ছোটভাই, তোমার সেই খদ্দর জোগান দেয়ার রাইটও আছে বটে। অন্যদিকে দেখো, তুমি এতসব আধুনিক করছো, টেনিস লনটাকে কিন্তু একদম উপেক্ষা করেছে। দেখলাম আকন্দর জঙ্গল হয়েছে।
রূপু নৃপনারায়ণের খদ্দরের পায়জামা-কুর্তাপরা চেহারাটায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, বাঃ! কে খেলবে টেনিস? তুমি?
কেন, আমি, তুমি, মনসা…।
তাহলে কাল থেকেই তোক লাগিয়ে দিলে হয়।
নৃপ চাপা হাসির পিছনে কিছু ভাবছে। সান্যালমশাই হাসছেন কিনা মনে মনে, ভাবছেন কি না, বোঝা গেলো না; মুখটা সন্তুষ্ট কিন্তু নির্লিপ্ত।
সন্ধ্যায় সান্যালমশাই নৃপনারায়ণকে বললেন, তোমার ভাই বিদেশে যাচ্ছে তা বোধহয় শুনেছো?
রূপু নিজেই বলছিলো। জিজ্ঞাসা করছিলো, সে দেশটা কী রকম হবে। ছোটোবেলায় পড়া একটা কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে শুনিয়ে দিলাম, সেখানে চার কুড়িতে আশি হয়, দরজাগুলো কাঠের, এবং এক গজ সেখানেও এক গজ।
তুমি ছিলে না যখন এ ব্যাপারটা ঠিক হয়, তাই এ বিষয়ে তোমার মত জানা যায়নি।
যখন বাঙালিদের কালাপানির ভয় ছিলো সে যুগে য়ুরোপে যাওয়ার কথা আমাদের বংশের কারো মনে হয়নি। ভালোই হয়েছে। তাই বলে এখনো পিছিয়ে থাকার কোনো যুক্তি নেই।
য়ুরোপে যাওয়াকে এগিয়ে যাওয়া বলো? আমি আশ্বস্ত হলাম। ভেবেছিলাম পাছে তুমি বিষয়টিকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে না পারা ইংরেজবিদ্বেষ থেকে।
সান্যালমশাই কাগজের পৃষ্ঠা ওল্টালেন। কিন্তু সেটায় মন না দিয়ে বললেন, খোকা, আমার মামার বাড়ির দেশে একটা ঘটনা ঘটেছিলো। তোমাদের কালাপানির গবেষণায় সাহায্য করবে। সেই গ্রামের এক ছেলে বিলেতে গিয়েছিলো কৃষিবিদ্যা শিখতে, ফিরলো এক ঘেসো-মেম সঙ্গে করে। যথারীতি তার পরিবারের হুঁকো বন্ধ হলে। ছেলেটির কী অভাবনীয় মতি হলো যে চাকুরিস্থল থেকে এসে গ্রামকে সে আলোকিত করার চেষ্টা করলো। তখন সে-গ্রামে এক টুলোপণ্ডিত বাস করতো। তার ধারণা ছিলো, সে রূপ-সনাতন কারো একজনের বংশধর। সে ই বললোবাপু হে, বিয়ে করাটা কিছু দোষের নয়। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ জাম্ববতাঁকে তা করেছিলেন। তার ফলে জম্বুবান জাতটাই মানুষ হয়ে গেলো। এই বলে তিনি এমন হাসলেন যে সেই রোগাপটকা বুড়ো বামুনের হাসির ছোঁয়াচ লেগে গেলো সারা গ্রামে। ছেলেটি তার চাকুরিস্থলে ফিরে গিয়ে ডিসকোর্স না ডেসপ্যাঁচ কী একটা অন্ হিন্দুম্যারেজ লিখেছিলো।
