ওটা নিয়ে খুব মাথা ঘামাই নে, কারণ ওটার সঙ্গে লেখাপড়ার ব্যাপারটা তত সংযুক্ত নয়। তবে চারিদিকে একটা সাজোসাজো রব উঠেছে বটে।
কীরকম?
রূপুর বন্ধু, পরে শুনলাম, মন্মথ রায়মশাইয়ের ছেলে বিলেতে যাচ্ছে কী একটা শিখতে। পাঁচ-ছ বছর ধরে নাকি শিখবে। সে রূপুকে চিঠি দিয়েছে।
তখনকার মতো সান্যালমশাই কাগজ ও তামাক নিয়ে ব্যাপৃত রইলেন। পরে তার মনে হলো, যখন তিনি জেনেছেন তখন রূপুকে ডেকে জিজ্ঞেস করাই উচিত। রূপু জানবে যে তিনি জেনেছেন, অথচ কেউই কথাটা উত্থাপন করছে না, সে যেন এক গোপনবৃত্তি। আর বিস্ময়ের এই যে, এ ব্যাপারে অনসূয়া একেবারে নীরব।
বাগানের মেহগনির অংশটিতে কাটবার উপযুক্ত গাছ দুটি সান্যালমশাই নিজেই নিজেই চিহ্নিত করে দিয়েছেন। চারু লোকজন নিয়ে গেছে অতি সন্তর্পণে গাছদুটি কেটেনামাতে। পাশের অপেক্ষাকৃত অপুষ্ট গাছগুলিকে নষ্ট করলে চলবে না। কথাটা ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি, আর তা সবসময়ে সহজও নয়। বাড়িটা তো উঠছেই, যদিও দাঙ্গার পরের আর আগের মন এক নয় যেন। কাঠ সিজনড় হতেও তো সময় নেবে। ভালো কাঠ সব সময়েই মূল্যবান, নিছক পণ্য হিসাবেও। সকাল থেকে সান্যালমশাই রূপুর সঙ্গে আলাপ করবেন বলে মনস্থির করে রেখেছেন। তার মনে হলো, এখন রূপুকে বাগানেই পাওয়া যাবে। বনস্পতি-পতনের মতো ব্যাপার নিশ্চয়ই তাকে আকর্ষণ করবে।
সান্যালমশাই বাগানে গিয়ে খানিকটা সময় এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালেন। তার সাড়া পেয়ে রূপু তার কাছে এসে দাঁড়ালো এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। এমন ব্যাপার রোজ হয় না। বাগানে অনেক গাছ আছে যার সঙ্গে কোনো গল্প জড়ানো আছে। আমগাছগুলি কোনো কোনোটি বহু অর্থব্যয়ে বিদেশ থেকে আনানো। বোটানি ছাত্রদের জন্য তৈরি বাগান নয় যে টিনের প্লেটে সন-তারিখ নামধাম লিপিবদ্ধ থাকবে। রূপু যেখানে একটি গাছ থেকে আর একটি পৃথক করতে পারে না সান্যালমশাইয়ের কাছে তখন প্রত্যেকটি ব্যক্তিত্বশালী। কোন গাছ কবে মুর্শিদাবাদ থেকে কলম হয়ে এসেছিলো, কোনটা খাঁটি অলফলো, কোন লাইনটা বোম্বাইয়ের, এসব রূপু সাগ্রহে প্রশ্ন করতে লাগলো এবং তেমনি সাগ্রহ উত্তর পেলো। হিমসাগরের লাইনটা যে বাগানের ঠিক মাঝখানে উত্তর থেকে দক্ষিণে গিয়ে জামরুলগাছের কুঞ্জটাতে মিশেছে, এটা যেন একটা আবিষ্কার।
সান্যালমশাই বললেন, হ্যাঁ রে রূপু, তুই নাকি বিলেতে যাচ্ছিস?
রূপু হকচকিয়ে গেলো, তারপর বললো, তুমি না পাঠালে কী করে যাবো?
যদি পাঠাই, কী করবি?
তাও তুমি বলে দেবে।
সেখানে তো সবাই ইংরেজিতে কথা বলে।কথা বলতে বলতে থেমে,দু-একটা কথা বাংলায় বলে জিরিয়ে নিবি এমন উপায় নেই।
রূপু খিলখিল করে হেসে উঠলো। পরে বললো, যদি এখনি যেতে দিতে বড়ো ভালো হতো। নিমাই যাচ্ছে এঞ্জিনিয়ারিং পড়তে।
তার বাবার খনি আছে। সে ফিরে এসে সেখানে কাজ করবে। তুমি কী শিখে আসবে? তোমার বাবা তো কৃষক।
রূপু বললো, আমি যদি ডাক্তার হই?
তা মন্দ নয়। কিন্তু অনেকদিন যে সেখানে একা একা থাকতে হবে। প্রায় বছরদশেক। সেখানকার স্কুলের পড়া শেষ করে তার পরে ডাক্তারি পড়া।
মাঝে মাঝে ছুটিও তো পাবো।
অনেকক্ষণ গাছের ছায়ায় ঘুরে বেরিয়ে সান্যালমশাই গল্প করলেন রূপুর সঙ্গে। অবশেষে তাঁর মনে হলো ছেলের মন খানিকটা তিনি বুঝতে পেরেছেন।
এক সন্ধ্যায় সেদিনের ডাকে-আসা চিঠিটা পড়ে সান্যালমশাই কথাটাকে অনসূয়ার সম্মুখে উল্লেখ করলেন। বললেন, এতদিন আলাপটা শিশুমহলে ছিলো, এখন দেখছি বতোদের দরবারেই উঠে এলো। তোমার ভাই মন্মট চিঠি লিখেছে।
মন্মথ রায়ের নামোল্লেখ এর আগেও হয়েছে। তিনি অনসূয়ার সহোদর নন, এ-গ্রামের রায়বংশের ছেলে। গ্রামে এরকম একটা প্রবাদ আছে যে, কয়েক পুরুষ আগে জলদস্যু সান্যালদের এক ছেলে রায়দের এক মেয়েকে রাক্ষস-মতে বিবাহ করেছিলো। প্রবাদ এও বলে, রায়দের সেই মেয়েই পলায়নের খিড়কি দরজা দেখিয়ে না দিলে চারজনমাত্র তরোয়ালবাজ রায়-জমিদারের প্রাসাদ-ঘেরা বাড়ির যাত্রার আসরের চিক-ঘেরা অলিন্দ থেকে একশো ঢালির চোখের সম্মুখ দিয়ে পালাতে পারতো কিনা সন্দেহ। মন্মথ রায়, সান্যালমশাই তাকে মন্মট বলেন, এই সুবাদে রসিকতা করে বলেছিলো–আমার বোন অনসূয়া আছেন বলেই লক্ষ্মী তোমার ঘরে বাঁধা। প্রকৃতপক্ষে তোমরা রায়দের লক্ষ্মী চুরি করে এনেছিলে।
অনসূয়া বললেন, মন্মথদাদা লিখেছেন, কই দেখি?
চিঠিটা পড়া শেষ হলে তিনি আবার বললেন, তুমি কী করবে ঠিক করেছে?
সান্যালমশাই বললেন, আজকাল যেন আমি আমার পরিবারের সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারছি নে। তোমরা সকালে এত তাড়াতাড়ি ছুটছো যে আমি ভাবছি কোনো কোনো চাল আমি আগে থাকতে দিয়ে রাখবো কিনা। এখন মনে হচ্ছে রূপুর বিদেশ যাওয়ার কথা আমার অনেক আগেই চিন্তা করা উচিত ছিলো।
ছেলেকে যেতে দেবে?
মন্মট্ নিজে যাচ্ছে ছেলেকে সঙ্গে করে। নিজেও কিছুকাল কাটাবে সে দেশে। লোকে জানবে ছেলের শুভকামনায় এই বিদেশে থাকা। আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, ছোটোবেলায় সে যে কাল্পনিক ববাহেমিয়ার স্বপ্ন দেখতো সেটা পৃথিবীতে আছে কিনা ত খুঁজে দেখাই তার ইচ্ছা।নতুবা নতুন কোনো ব্যবসা মাথায় ঘুরছে। সে যা-ই হোক। রূপু সেখানে গিয়ে মনস্থির করার সুযোগ পাবে। যদি ভালো না লাগে তার সঙ্গে ফিরবে। অন্তত বেড়ানো হবে।
