ধাত্রী চুপিচুপি বললো, অপরিচিত একজন লোক ঢুকেছে মায়ের ঘরে।
অনসূয়ার ঘরে পরিচিত দাসী ছাড়া যারা তার অনুপস্থিতিতে এ-মহলে আসতে পারে তারা হচ্ছে সদানন্দ, রূপু এবং সান্যালমশাই স্বয়ং। দিনের বেলা এই যা ভরসা।
অপরিচিত?
বলে বোকা হতে চাই নে, অস্বস্তি লাগছে কিন্তু।
তখন অনসূয়ার কাছে খবর পাঠালো সুমিতি। কিন্তু খবর পাঠানোর দরকার ছিলো না। নৃপনারায়ণ রান্নামহলের একজনের চোখে পড়েছিলো। সে চিনতে পারেনি কিন্তু অনসূয়াকে বললো, কে একজন এলেন, মা।
সে কী কথা!
সাহেবের মতো রং। খুব লম্বা, দু লাফে যেন উঠোন পার হয়ে গেলেন।
একটু ভেবে, অসম্ভবটা কি এমন আকস্মিকভাবে সম্ভব হয়, এই ভাবতে ভাবতে অনসূয়া। নিজের ঘরের দিকে চললেন। নিজের ঘরে ঢুকে অনসূয়া ঝোলাটা দেখতে পেলেন, ধুলোভরা স্যান্ডেল জোড়াও দেখতে পেলেন। বুকটা ধকধক করছে। মুখ ফুটে কিছু না বলে তিনি নিজের ঘর থেকে সান্যালমশাইয়ের ঘরের দিকে চললেন। কষ্টের মতো কী একটা বোধ হলো। সুমিতির ঘরের সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময়ে গ্রীবা না বেঁকিয়ে যতদূর সম্ভব সুমিতির ঘরের ভিতরটা দেখে নিলেন। এ-ঘরে নেই এমন একটা আশাকে রক্ষা করতে করতে তিনি এগোলেন। স্টাডিতে ঢুকে তিনি কিছুই মনে করতে পারলেন না, কারণ, ততক্ষণে নৃপনারায়ণ প্রণাম করেছে, মাকে বুকের মধ্যে জড়িয়েও ধরেছে।
ছেলেকে বসিয়ে, নিজে তার পাশের একটা চেয়ারে বসে অনসূয়া বললেন, চমকে দেওয়ার অভ্যাস এখনো তোর আছে।
কাউকেই বোলো না এখন, আমি এসেছি। আগে কিছুক্ষণ তোমাদের দুজনের মাঝখানে বসে থাকি।
‘তা থাকিস। তোকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমি খাবারের ব্যবস্থা করে আসি। বলে অসূয়া চলে গেলেন।
সংবাদটা তখন আর চাপা থাকলো না, সুমিতির কানে গেলো, রূপু শুনলো।
ঈষৎ তপ্তজলে স্নান শেষ করে নৃপনারায়ণ খেতে বসেছিলো মায়ের ঘরে। জলযোগ শেষ হলে অনসূয়া বললেন, তুমি এবার সুমিতির ঘরে গিয়ে বোসো গে, আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
নৃপনারায়ণ যখন সুমিতির ঘরে গেলোতখন সেখানে সুমিতি ছিলো। বললো, ভালো আছেন, গ্রামে এসে কষ্ট হচ্ছে না তো আপনার?
না, কষ্ট হবে কেন? আপনাকে একটু রোগা দেখাচ্ছে।
দুদিনের বিশ্রামে ঠিক হয়ে যাবে।
ওদিকে খবর কী?
দেশের রাজারা নাকি প্রজাদের হাতে সত্যি শাসনভার তুলে দেবে।
নৃপনারায়ণ তখনো বসেনি। সুমিতি বললো, বসুন। আপনাকে কিন্তু ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
নৃপনারায়ণ হাসলো।
এমন সময়ে রূপু এলো। ‘এদিকে’ ‘এদিকে’ বলে কাকে পথ দেখিয়ে আনছে সে। ধাত্রী নৃপনারায়ণের শিশুটিকে নিয়ে প্রবেশ করলো রূপুর সঙ্গে।
ধাত্রী বললো, বিড়োবাবু, এমন সময়ে বকশিশ চাওয়াই প্রথা।
নূপনারায়ণ বললো, নিশ্চয়, নিশ্চয়। আপনাকে নিশ্চয়ই পুরস্কৃত করা উচিত। এই বলে চোখ তুলে চাইতে গিয়ে সুমিতির চোখে চোখ ঠেকে গেলো তার। সুমিতি সিঁদুর হয়ে মুখ নামিয়ে নিলো।নৃপনারায়ণের গালও রক্তিম হয়ে উঠলো। শিশুটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকতে থাকতে নৃপনারায়ণ বললো, এখনো চোখ ফোটেনি যেন।
রূপু হো হো করে হেসে বললো, কী বলল, দাদা, কত বুদ্ধি তা তো জানো না। আঙুল ধরতে চায়।
তুমি যে খুড়োমশাই তা মনে ছিলো না।
ও এখন ঘুমুবে। বলে কিছুপরে ধাত্রী তার অধিকারকে নিয়ে চলে গেলো।
তুমি বিশ্রাম করে নাও।বলে রূপুও চলে গেলো।নৃপনারায়ণ সুমিতিকে বললো, আপনার বাড়ির লোকদের এ-খবর দিয়েছেন?
হ্যাঁ।
কিন্তু আপনাকে যেন সে-সময়ে আমি ‘তুমি’ বলার চেষ্টা করতাম। বিব্রতমুখে নৃপনারায়ণ বললো।
তুমি’ বলতেন। মাঝে-মাঝে গোলমালও হতো। একজনের খুব ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় হয়েছিলো। সুমিতি আবার সিঁদুর হলো।
না, না। এখন আর আপনি’ বলাটা একদম মানায় না, সে তুমি যাই বলো।
নৃপনারায়ণ হাসতে গেলো, রাঙা হয়ে উঠলো, বললো, এখন তা অস্বীকার করতে পারি ।
এরপরে চা এলো। দাসীর হাতে ট্রে, কিন্তু অনসূয়া সঙ্গে এলেন। একটু যেন বাড়াবাড়ি হলো।
অনসূয়া এত সুখ অনুভব করেননি। তিনি মনসাকে পত্র দিলেন-তোর দাদা এসেছে, মণি।
নিজের ঘরের গভীরে অনসূয়া ভাবলেন–একটু স্বার্থপর হয়ে পড়েছি আমি। ছেলে বাড়িতে এসে প্রথমে মাকেই খুঁজেছে। এবং সেটাই উচিত। নতুবা ছেলেও বোধহয় এমন করতো না। ছেলে সুমিতির ঘরে আছে এরকম একটা আশঙ্কাতেই সে-ঘরের দিকে গোপনে চেয়েছিলেন তিনি, এরকম একটা লজ্জাও তার হলো। অনুভব করলেন, কিছুই নয়, অন্যান্যবারের মতো দেখাতে চায়ের ট্রের সঙ্গে গিয়ে ভালো হলো না। ভাগ্যে আয়না সামনে নেই।
.
পুরনো খবর একটু দেওয়া যাক।
দাঙ্গা রাজনীতির ব্যপারটা কমে এসেছেতখন,এক সন্ধ্যায় খবরের কাগজের দাগিয়ে-দেওয়া অংশগুলিতে চোখ বুলিয়ে যখন সান্যালমশাই গ্রামের বাইরের পৃথিবীর খবর নিচ্ছেন এবং রাজনীতির আলাপ করছেন, তখন তিনি মন্তব্য করলেন, সদানন্দ, আমার মনে হচ্ছে বাঁশ যেমন একটি একটি করে গ্রন্থি পার হয়, তেমনি কোনো গ্রন্থি পার হয়েছে তোমার মন।
কেন বলুন তো?
শিপিং ইন্টেলিজেন্সে আমার আগ্রহ থাকার কথা নয়, দেখছি সে-খবরগুলি আজকাল প্রায়ই দাগানো থাকে।
সদানন্দ বললো, তা থাকে, ওটা রূপুর কীর্তি।
চোখের সম্মুখ থেকে কাগজ সরিয়ে সান্যালমশাই প্রশ্ন করলেন, তোমার ছাত্র কি কোথাও যেতে চায়, কিংবা কারো আসার প্রতীক্ষা করছে?
