হঠাৎ পদ্ম রামচন্দ্রর মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে বললো, আপনে কি তাক খুব গাল দিছিলেন?
না কন্যে, না কন্যে, তা আমি দেই নাই।
কিছুটা সময় নীরবতার মধ্যে দিয়ে কাটলো। মৃদু মৃদু হাওয়া চলতে চলতে হঠাৎ যেমন কালবৈশাখীর নির্মম রূপ প্রকাশ পায় তেমনি আকস্মিক পরিবর্তন হলো পদ্মর। তার মুখে স্নিগ্ধতার অস্পষ্ট ছাপও অবশিষ্ট রইলো না। সে যেন তার হৃদয়টিকে বিচ্ছিন্ন করে উন্মুক্ত বায়ুতে এনে বিশুদ্ধ করে নিতে চায়। মুহূর্তের জন্য যোগারূঢ়ার মতো সে যেন পারিপার্শ্বিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও গেলো। সে বললল, পাপ ছিলো আমার মনে। চোখের সামনে আপনে, যে সংসারে টানতেন। লোভ লাগতো।
জ্বলন্ত লোহার মতো কথা। জ্বলন্ত বলেই কোমল স্পর্শ বলে ভ্রম হয়, কিন্তু নিমেষে সে ভ্রান্তিও দগ্ধ হয়। রামচন্দ্র কিছুক্ষণ বসে রইলোবটে কিন্তু তার মুখে আর কথা ফুটলোনা। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে প্রাণে অশান্তির বীজ বহন করে সে ফিরে এলো।
.
প্রায় এক মাস পরে রামচন্দ্র একদিন তার স্ত্রীকে বললো, শুনছো, এখানে আমাদের এখন কোন কাম আছে? ওই দ্যাখো, আমি যখন শিবমন্দির নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, মুঙ্লা একলাই সব কাজ করছে। তাছাড়া মানুষ যদি নিজের মনে কাজ করবের না পায় কোনোদিনই শেখে না। ভান্মতিও সংসার করা জানবি নে, মুঙ্লাও চিন্তাভাবনা করা শিখবি নে।
শিখে নেয় সেই তত ভালো।
আর তাছাড়া ওরা দুইজন দুইজনেক আরও ভালো করে চিনেজানে নিউক।
তা-ও লাগে।
রামচন্দ্র প্রস্তাবটা ভয়ে ভয়ে করলো, কেন্, সনকা, তীত্থ করবের যাবা?
তীত্থ?
হয়। ওরা সংসার চিনুক, আমরাও তীখ চিনি।
নিয়ে যাবা, না ঠাট্টা করো?
যদি যাই, তোমাক নিয়ে যাবো।
বিষয়টি আরও কিছুদিন তোলাপাড়া করলো রামচন্দ্র। সেআবার কেষ্টদাসের বাড়িতে গেলো।
মাটির দিকে চোখ রেখে রামচন্দ্র বললো, গোঁসাই আমাদের পথ দেখায়ে দিছে, মনে কয় তীখ করবের যাবো।
তা যান। পদ্ম বললো।
মনে করছি তোমাকও নিয়ে যাবো। আমি, তুমি আর সনকা। সেখানে গোঁসাইও আছে।
পদ্ম কিছুকালের জন্য যেনবা লুব্ধ হয়ে রইলো, পরে বললো, আমি আর কনে যাবো? সে এত কষ্ট করে ঘরবাড়ি করছিলো সেসব দেখে রাখা লাগবি তো।
তাতে কি শান্তি পাবা?
তা পাবো না।
প্রস্তাবটা শুনে মুঙ্লা বিষণ্ণ মুখে বললো, এখনি যায়ে কী হবি? ফসল উঠুক, তখন না হয় আমিও যাবো।
রামচন্দ্র মনে মনে হাসলো, তুমিও যদি যাবে তবে আর তীর্থ হলো কী করে। তুমি হয়তো এর পরে বলে বসবে, জমিজমাও নিয়ে যাবো।কষ্টই যদি না হয়, তোমাদের বিচ্ছেদ যদি কাটার মতো না বেঁধে তবে তীর্থ করার তৃপ্তি আসবে না।
শুভদিন দেখে রামচন্দ্র রওনা হলো। নবদ্বীপেই সর্বপ্রথম সে যাবে। সেখানে গোঁসাইকে খুঁজে বার করে তার পরামর্শ নিয়ে যদি আরও কিছু দেবদর্শন ঘটে কপালে, ঘটবে। মুঙ্লা প্রস্তাব করেছিলো গোরুগাড়ি করে দিঘা পর্যন্ত যেতে। রামচন্দ্র বললো, তীখ গেলেও টাকার হিসেব করতে হয়। হাঁটেই যাবো।
সামান্য কিছু বিছানার উপকরণ একটা বড়ো রকমের পুঁটলিতে জড়ানো,দু-একখানা পরিধেয় বস্ত্র একটা ঝোলায়। অন্যান্য প্রয়োজনীয় টুকিটাকি সব ওই ঝোলাতেই যাবে। দাওয়ায় এসব গুছানো ছিলো।
সনকা ভানুমতির হাত থেকে পান নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ঝোলা ও পটুলিটার পাশেই পাকা একটা বাঁশের লাঠি ছিলো। ঝোলা ও পুটুলি লাঠির ডগায় ঝুলিয়ে লাঠিটা কাঁধে তুলে নিয়ে ‘শিবো’ ‘শিবো’ বলে রামচন্দ্র তীর্থের পথে বেরিয়ে পড়লো।
ভান্মতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলো।হঠাৎ এদের মঙ্গল কামনায় সেউলু দিয়ে উঠলো।
৩৫. সান্যালমশাইয়ের বড়োছেলে
সান্যালমশাইয়ের বড়োছেলে নৃপনারায়ণ গ্রামে এলো। কনকদারোগার দপ্তরে খবর পৌঁছনোর আগে নৃপনারায়ণ বুধেডাঙা চিকন্দির সংযুক্ত সীমায় পৌঁছে গেলো। সদর রাস্তা ছেড়ে আলোর পথ বেছে বেছে সে অত্যন্ত দ্রুত চিকন্দির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। তাকে দেখে ইয়াজ বিস্মিত হয়েছিলো। দাদপুরীদের অগ্নিকুমার আর রাবণের কাছে যেন চেনা চেনা লেগেছিলো।
নৃপনারায়ণ খিড়কি-দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে হনহন করে রান্নার মহল পার হয়ে অন্দরের চত্বর পার হয়ে দোতলায় অনসূয়ার ঘরে গিয়ে ঢুকলো। কাঁধের ঝোলাটা ড্রেসিং টেবলে রেখে ধূলিমলিন অবস্থাতেই সে অনসূয়ার বিছানায় গিয়ে বসলো, একটু বা ঘরের মধ্যে পায়চারি করলো। মা এসে কেমন চমকে যাবেন এই চিন্তা করে সে মিটমিট করে হাসলো। কিন্তু দশ মিনিট পরেও যখন অনসূয়া এলেন না তখন সে সান্যালমশাইয়ের স্টাডির দিকে রওনা হলো। সেখানে সান্যালমশাই ছিলেন। নূপনারায়ণ ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতেই সান্যালমশাই কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, বটে?
নৃপনারায়ণ বললো, হ্যাঁ।
তারপর নৃপনারায়ণ একটা চেয়ারে বসলো।
সান্যালমশাই খবরের কাগজটা তুলে ধরলেন; আঙুলগুলি ও হাতের খানিকটা ছাড়া আর সব কাগজে ঢাকা পড়লো। নৃপনারায়ণ দেখতে পেলো না কিন্তু সান্যালমশাইয়ের চোখে তখন সব লেখা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাগজ নামিয়ে চশমাটা একটুকরো শ্যাময় চামড়ায় মুছে নিয়ে সান্যালমশাই বললেন, মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
একটু লুকোচুরি খেলছি।
নৃপনারায়ণ যখন তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলো তখন ধাত্রী তার নিজের ঘর থেকে তাকে দেখে অবাক হয়েছিলো। কী করা উচিত এই যখন সে ভাবছে, সুমিতি ধাত্রীর ঘরে গেলো ছেলেকে দুধ খাওয়াতে।
