পদ্ম?
আসো। কুপিটা নিয়ে দেও, চোখে লাগে।
এ যেন কোনোদিনই পরিচিত নয় এমন এক পদ্মর কণ্ঠস্বর।
আর একদিন রাত্রিতে ছিদাম পদ্মর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
আমি বলি কি, আমি চলে যাই। পদ্ম বললো।
কোথায় যাবা?
শূন্য থেকে আসছিলাম আবার কোনো শূন্য খুঁজে নিবো।
তাই যাও।
কিন্তু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ছিদাম বললো, তা যেন যাবা, একদিন যখন আবার দেখবের ইচ্ছা করবি?
পদ্ম হু হু করে কেঁদে ফেলো।
পরদিন অত্যন্ত সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজা খোলা দেখে পদ্মর মনে হলো ছিদাম বোধহয় আজ অন্যদিনের চাইতে প্রত্যুষে উঠেছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন ছিদাম এলো না তখন সে ভাবলো, কয়েকদিন জমিতে যায়নি, আজ বোধহয় অনুতাপে পুড়ে রাত থাকতে উঠে সেখানেই গেছে। একটা আলোড়নের পরে সংসার আবার নতুনভাবে স্থিতিলাভ করবে এই আশায় পদ্মর মুখখানা হাসি হাসি হয়ে উঠলো।
দুপুর গড়িয়ে গেলে রান্না শেষ করে পদ্ম অপেক্ষা করতে লাগল। বেলা গড়িয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে যে ভয়টা সৃষ্টি হচ্ছিলো সেটা সন্ধ্যায় বিভীষিকা হয়ে উঠলো। একা একা অন্ধকার পথে সে খানিকটা ঘুরে এলো। রাত্রিতে জেগে বসে থাকতে থাকতে পদ্ম পর্যায়ক্রমে একবার চোখ ঢেকে কাঁদলো, আর একবার পথের দিকে তাকালো। দ্বিতীয় দিন সে দুখানা গ্রামের পথে পথে একা একা ঘুরে বেড়ালো। তৃতীয় দিনে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে আরম্ভ করলো। সেদিন সন্ধ্যার পর সে রামচন্দ্রর স্ত্রীর কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লো।
সনকা বললো, কিনে গেলো?
জান্ নে।
কেন্ গেলো?
জান্ নে।
রামচন্দ্র শুনে বললো, রাগ করছিলো?
না।
তুমি কিছু কইছিলা?
কইছিলাম, চলে যাবো।
প্রায় সাতদিন পরে ছিদামের সংবাদ পেলো পদ্ম নিজেই। যে অসম্ভব জায়গায় তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো তার থেকেই প্রমাণ হয়, পদ্ম এ কয়েকটি দিনে সম্ভব-অসম্ভব কোনো জায়গাই খুঁজতে ছাড়েনি।
শিবমন্দিরে কাজ করতে এসে তার কান্নার শব্দ অনুসরণ করে পদ্মকে দেখতে পেলো রামচন্দ্র। ছিদাম আত্মহত্যা করেছে। শিবমন্দিরের পিছন দিকে এখনো অনেক জঙ্গল। সেখানে একটা গাছের নিচু ডাল থেকে ছিদামের মৃতদেহ ঝুলছে।
রামচন্দ্র কাছে গিয়ে দাঁড়ালে পদ্ম প্রথমে হাহাকার করে উঠলো, তারপরে পাথর হয়ে। গেলো। রামচন্দ্রর লোকজন শবটিকে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে লাগলো।
পদ্ম আর কাঁদলো না। পূতিগন্ধ গলিত মৃতদেহটার পাশে লুটিয়ে পড়ে সে ফিসফিস করে বললো, শোনো, ওঠো, কয়দিন ছান করো নাই, খাও নাই। চলো, আমরা চলেই যাবো। এখন ওঠো, খাও নাই যে। দ্যাখো না, চুলেও তেলজল পড়ে নাই।
৩৪. রামচন্দ্র কাঁদতে কাঁদতে
রামচন্দ্র কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরছিলো। মুঙ্লারা শব-সল্কারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো কিন্তু নায়েবমশাই বলে পাঠালো, দারোগারা দেখে না যাওয়া পর্যন্ত কিছু করা উচিত হবে না। দারোগারা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে এলো না, পরদিন সকালে এলো। সারাটা দিন, সমস্তটা রাত্রি মৃতদেহকে পাহারা দেওয়া দরকার। আর কে রাজী হবে? মুঙ্লা তুলসী গাছ এনে মৃতদেহটার চারিপাশে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। ফুলের কথা তার মনে হয়নি। চৈতন্য সাহার দোকান থেকে একটা নামাবলী কিনে এনে সেশবটিকে ঢেকে দিয়েছিলো। অস্নাত অভুক্ত প্রায়-উন্মাদিনী পদ্ম মাটিতে মাথা কুটে কুটে কেঁদে শবের অনতিদূরে স্থির হয়ে বসেছিলো, আর ছিলো রামচন্দ্র। সন্ধ্যায় একটা প্রদীপ কে এনে দিয়েছিলো।
এমন একটি দিন এবং রাত্রি অতিবাহিত করার স্মৃতি মন থেকে সহসা মুছে যায় না।
শিবমন্দির উদ্ধার করার পরিকল্পনা রামচন্দ্র ত্যাগ করলো। যে গাছগাছড়াগুলির মূলমাত্র অবশিষ্ট ছিলো দু-তিন সপ্তাহে সেগুলির কোনো-কোনোটির মূল থেকে কচিপাতা আবার আত্মপ্রকাশ করেছে। আরও দু-এক সপ্তাহের মধ্যে পল্লব এবং তারপরে ডালপালা তৈরি হবে। আবার আগেকার মতো জঙ্গল হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের কথা। ছিদাম যেন মৃত্যু দিয়ে বলে গেছে, এই শিবমন্দির উদ্ধার করার যোগ্যতা তার নেই।
অনেক রাত্রিতে শয্যায় উঠে বসে একদিন রামচন্দ্র স্ত্রীকে ডেকে তুললল, শুনতেছে, সনকা?
কও।
কাজটা আমি ভালো করি নাই।
কী করছো?
ছিদামেক শাসন করছিলাম; কও, শাসন করার কী যোগ্যতা আমার আছে?
উইলের যে-অবসাদ তার অন্তরকে বিষণ্ণ ধূসরতায় আচ্ছন্ন করেছে তাকে কমনীয় করে। তুলেছিলো একসন্ধ্যায় পদ্মর চিহার-পরা কণ্ঠদেশ। এতগুলি কথা বলতে না জানলেও তার অনুভবে অব্যক্ত, সুতরাং, অধিকতর দ্যোতনা নিয়ে তা ধরা দেয়।
অন্য আর-একদিন রামচন্দ্র বাড়িতে ফিরে স্তব্ধ হয়ে বাইরের দিকের দাওয়ায় বসেছিলো।
সনকা এসে দাঁড়ালো, অমন করে বসে আছো যে?
না। ভাবি।
কী ভাবো?
এমন হবের পারে–ছিদামের এছাড়া উপায় ছিলো না।
তা পারে।
কও, এ কি ধর্ম না?
দার্শনিক কোনো সূক্ষ্ম যুক্তি রামচন্দ্রর মাথায় আসেনা। তার মনে হয় ধর্মের পথ বড় কঠিন। সে-পথে চলতে গিয়ে ভীমসেন অর্জুন প্রভৃতিও বেঘোরে প্রাণ হারায়।
ইতিমধ্যে সে একদিন কেষ্টদাসের বাড়িতে গেলো। যেন সে অনুতাপ জানাতে চায়।
আছো?
পদ্ম ঘর থেকে বেরুলো। ইতিমধ্যে পদ্মর যেন বয়স বেড়ে গেছে।
রামচন্দ্র ইতস্তত করে বললো, গোঁসাইয়েক একটা খবর দেওয়া লাগে।
আমি আর কী খবর দিবো?
রামচন্দ্র খানিকটা চিন্তা করে বললো, তাই। খবর আর কী দিবো।
