ছিদাম গল্পটা মনোযোগ দিয়ে শুনলো। গল্পটাকে মনে মনে আলোচনা করে সে বললো অবশেষে, একথা কন যে?
ভাবে দ্যাখো ভীষ্ম কত বড়ো। আমরা কি এত পারি? তাইলেও কিছু তো করবের হবি?
এরপরে অন্য অনেক কথা হলো। জমিজমার কথা রামচন্দ্রর মতো কে বলতে পারে। আর আজ সে যেন বহুদিন পরে মন খুলে জমিজমার কথাই আলোচনা করলো।
কিন্তু ছিদাম ভীষ্মর উপাখ্যান ভুলতে পারলোনা। এই গল্পটা বলার জন্যই যে রামচন্দ্র তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো চিন্তা করতে গিয়ে সে-বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ হলো।
পদ্মর কথা তার মনে পড়লো। যেদিন ক্লান্ত অসুস্থ পদ্ম প্রথম এসেছিলো সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কতভাবেই না সে পদ্মকে দেখেছে। অক্লান্তকর্মা পদ্ম, যে-পদ্ম গান বেঁধে দেয়, এক-হাঁটু, জলকাদায় যে ধানের জমিতে কাজ করে পাশে দাঁড়িয়ে। পদ্মই তাকে উৎসাহিত করে চাষী করেছে।
একদিন ছিদাম বলেছিলো, কেন, এত খাটবো কেন?
মুঙ্লাও তো খাটে।
তার বাপ-মা আছে, ভান্মতি আছে। আমার বাপ কনে গেছে কে জানে, মাকে জন্মের কালে খাইছি।
পদ্ম কাছে এসে দাঁড়িয়ে রসিকতা করে বলেছিলো, ভান্মতি একটা আনে দিবো।
আমি কি তাই কইছি?
কোনো অভাব বোধ ছিদামের নেই। মুঙ্লা ভান্মতিকে পাওয়ায় সে কিছুটা দুঃখিত হয়েছিলো। কারণ, মুঙ্লাকে সে আর তেমন করে পায় না। কিন্তু তার বদলে পদ্মকে সে যেন আরও কাছে পেয়েছে। এক রাত্রিতে চারিদিকে যখন জ্যোৎস্নার অগাধ নির্জনতা তখন ছিদাম পদ্মর পাশে বসে মাথালটা মেরামত করছিল। সে বললো, তোমাক পদ্মই কবো।
কও।
দ্যাখো, পদ্ম, মানুষ যে বিয়ে করে কেন তা বুঝি না। কিন্তুক আমার যদি কোনোকালে বউ আনো দেখেশুনে আনবা। সে যদি তোমার মতো কথা কবের না জানে, যদি আমাক দিয়ে এমন করে খাটায়ে না নেয় তবে কৈল আমি জমিজমা নিয়ে খাটবের পারি নে।
কিন্তু যে কথাটা বারবার মনে আসতে চাচ্ছে আর ছিদাম ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে সেটা বাইরের কথা নয়। সমবয়সী কৃষকদের দলে আলাপের সময়ে বউয়ের কথা উঠে পড়া স্বাভাবিক। যৌবনের ধর্ম অনুসারে ছিদামের মনেও একটি গৃহকোণের স্বপ্নচিত্র ফুটে ওঠে,সে গৃহের হাসিমুখটুকুর সঙ্গে পদ্মর সাদৃশ্য থাকে।
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার কথা শুনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছিদামের সহসা অনুভব হলে এখন বাড়ি ফিরলে সে হয়তো পদ্মকে এসব কথা বলে ফেলবে। বাড়ির কাছাকাছি এসে ফিরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুতপদে সে এরশাদের বাড়ির দিকে রওনা হলো, যেন সেখানে কিছু কাজ পড়ে আছে।
সন্ধ্যার অন্ধকারে সে বাড়ি ফিরলো।
ছিদাম আস্লে? বলে পদ্ম এসে দাঁড়ালো দরজার কাছে।
যেন মস্ত একটা ধানের বোঝা তার পিঠে চাপানো আছে, কথা বলার মতো দম আর অবশিষ্ট নেই, এমন ভঙ্গিতে ছিদাম পদ্মর পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকলো। অন্ন-জল, লাঙল-মাটির মতো যে বিষয়টিকে প্রাত্যহিক অভ্যস্ততায় সে গ্রহণ করতে পেরেছিলো, ভীষ্মর গল্প শোনার পর সেটার গূঢ় অর্থ তার চোখের সম্মুখে খুলে গেছে। আর কোনোদিনই যেন সে সহজ হয়ে পদ্মর সঙ্গে কথা বলতে পারবে না।
কুপি জ্বেলে নিয়ে পদ্ম ঘরে এলো। কী হইছে, ছিদাম, কোনো অন্যাই কাজ করছো?
ছিদাম নিরুত্তর।
রাত্রিতে আহারের জায়গা করে পদ্ম বললো, খাতে আসো, ছিদাম।
সাড়া না পেয়ে ঘরে ঢুকে সে দেখলো ছিদাম বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে আরও কাছে গিয়ে পদ্ম দেখলো, চাপা কান্নার মতো একটা অত্যন্ত মৃদু আলোড়নে ছিদাম কেঁপে কেঁপে উঠেছে।
পদ্ম বিছানায় বসে ছিদামের পিঠে হাত রেখে বললো, কেন, কাঁদো কে ছিদাম?
ছিদামের কান্না এবার প্রকাশিত হলো। সে উঠে বসলো, তার দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।কী বলে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে,কী সম্বোধন করলে ছিদামের দুঃখ দূর হয়, চিন্তা করলো পদ্ম। কী হইছে, সখা? কী হইছে, ভাই?
ছিদাম ভেবেছিলো সে প্রাণ থাকতে ভীষ্মর উপাখ্যান শোনার কথা পদ্মকে বলবে না, অন্তত উপাখ্যান শুনে রামচন্দ্রর বক্তব্য সম্বন্ধে তার কী মনে হয়েছে তা কখনো তাকে বলা যায় না। কিন্তু সহসা সে বলে ফেলো।
পদ্ম মুখ নিচু করে শুনলো। গল্প শেষ হলে উঠে দাঁড়িয়ে সে বললে, রাত হইছে, খাতে চলো।
কে, পদ্ম, আমি কী করবো?
কিছু করবা না। পদ্ম দৃঢ়স্বরে বললো
একটা পার্থক্যের দেয়াল দুজনের মাঝখানে রচনা করার চেষ্টা করলো ছিদাম। অন্যান্য ব্যাপারে যেমন, এ বিষয়েও তেমনি তাকে পদ্ম সাহায্য করতে অগ্রসর হলো। রান্নাঘরে ছিদামের আহার্য ঠিক করে রেখে পদ্ম ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়। প্রয়োজনেও কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। ছিদাম জমিজিরাত তদারক করতে যায় না। তার আহারে রুচি নেই। পদ্ম অনুনয় করতে বাধ্য হয়। ছিদাম ঘরে চলে এলে নিজের আহার্য অনেকসময়ে গোরুর মুখের সম্মুখে ধরে দিয়ে অভুক্ত পদ্ম ঘরে এসে পান সাজতে বসে। এক রাত্রিতে ছিদামকে পান দিয়ে সে চলে যাচ্ছিলো, হঠাৎ ফিরে দাঁড়ালো। তার চোখ দুটি ঝকঝক করে উঠলো। সে বললো, তুমি আমাক খাওয়াও পরাও, যত্ন করো। মাথায় করে রাখছে। যেভাবে সেভাবেই তোমার আমি।
সে রাত্রি শেষ হতে তখনো বাকি ছিলো। ছিদাম উঠে গিয়ে দেখলো পদ্ম তার বিছানায় নেই। সে কুপি ধরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখলো, একটা খুঁটির পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে পদ্ম।
