পদ্ম নিজে থেকে মাদুরের একপ্রান্তে বসলো। একটা যেন আকুল নিষেধ ফুটে উঠলো তার স্বরে। সে বললো, এমন না-থাকার কথা কন্ কেন্?
তার মনে হতে লাগলো, বলিষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার প্রতীক বলে যাকে মনে হয় তার মুখে এ কী কথা! সে আবার বললো, এ কথা কি আপনের বাড়ির সকলে মানে নিছে?
সে যখন এ কথা কয়টি বললো তখন অনুভব করলো : তোমার চারিপাশে তারুণ্য ও মধুর চপলতার অজস্র উপকরণ ছড়িয়ে রাখলে এমন মনোভাব হতো না তোমার। বলা বাহুল্য, এ ভাষা তার জানা নেই, সুতরাং এই চিন্তাটুকুর অংশ হিসেবে মধুর হাসি ও চোখের বিদ্যুৎইতস্তত ছড়ানো রইলো। এবং সে বুঝতে পারলোনা, তার নিজের চোখ দুটি যে-কোনো পুরুষের সম্ভাব্য কামনার স্নিগ্ধ আশ্রয়ের মতো ডাগর হয়ে ফুটে উঠেছে।
ছিদাম এলো না। আর একটু অপেক্ষা করে রামচন্দ্র চলে গেলো।
কিছুক্ষণ বাদে পদ্মর আত্মপ্রসারী ব্যাকুলতাটা সংকুচিত হয়ে তার দৈনন্দিন আবরণে আত্মগোপন করলো।কবিপ্রসিদ্ধিতে কোনো কোনো ফুল এমনি দিনেরাত্রে সংকুচিত হয়।নতুবা এই সংকোচে অনুশোচনা ছিলো না।
রামচন্দ্র পথে বেরিয়ে অনেকটা দূর নির্দিষ্ট কিছু চিন্তা করলো না। তার নিজের মনের একটা খুশি খুশি ভাব সে উপভোগ করছিলো। অন্ধকারে সান্যালবাড়ির হাতার পাশে চলতে চলতে হাসনাহেনার গন্ধটাও এখন উপভোগ্য বোধহয়। এরপরে এই খুশির কারণ অনুসন্ধান না করলেও তার মনে পড়লো, পদ্মর মুখের গড়নটা যে এমন তা সে জানতো না। আর পদ্ম একটা রুপোর চিক্হার পরেছিলো। সেটা নিশ্চয়ই নতুন, নতুবা অত সুন্দর দেখাতো না।
.
রামচন্দ্র মন্দিরের চত্বর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। সেকালের জমাট সুরকি আতর দেওয়া চত্বর। অধিকাংশ জায়গায় ভেঙে চটা উঠে গেছে। সে-জীর্ণতার এখানে-সেখানে দু-একটি পাকুড় জাতীয় গাছ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। তবুচত্বরে পৌঁছতে পেরে রামচন্দ্র অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলো। সে চত্বরের একাংশে বসে সঙ্গীদের নিয়ে গল্প করছিলো। সান্যালমশাই বলেছেন–গ্রামের লোকদের যদি সত্যি এত আগ্রহ হয়ে থাকে তবে তার বাড়ির কাজ শেষ হলে মিস্ত্রীদের তিনি পাঠিয়ে দেবেন। মেরামত করে মন্দিরটাকে উদ্ধার করা যায় কিনা চেষ্টা করে দেখা যাবে।
রামচন্দ্র এই কথাটা আনন্দের সঙ্গে রটনা করছিলো।
এইরকম আলাপের এক ফাঁকে একজন বৃদ্ধ একদিন বললো, এমন সময়ে যদি কেষ্টদাস থাকতো তবে তোমার সুবিধা হতে মণ্ডল।
কোথা থেকে কী কথা উঠে পড়লো। আলাপটা গড়াতে গড়াতে কেষ্টদাসের পারিবারিক ব্যাপারকে অবলম্বন করলো।
সে থাকেইবা কী করে? ক্ষেত খামার সংসার সে কোন কালে দেখছে?
তাইলেও অমন ভালো না।
কি ভালো না?
বৃদ্ধটি বোধহয় কেষ্টদাসের সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করেছে। বয়েস হয়েছে, বিদায়ের কথা তারও মনে হয়। তার অভাবেও বাড়ির আর-সকলের জীবন স্বাভাবিক কথাবার্তা হাসিখুশিকে অবলম্বন করে অগ্রসর হবে–এটা ভাবতে যেন তার মন দমে যায়। সে বললো, তাই বলে এত হাসিখুশি এত কথাবার্তা ভালো না।
মানুষে কি চেরকালই মুখ গাো করে থাকবের পারে?
তা না পারে, কিন্তু তুমি দেখো রামচন্দ্র, ছিদাম আর পদ্ম যেন খুব কাছাকাছি গিছে।
তা একই বয়েস, ভাই-বন্ধুর মতো ওরা খাটেখোট। বললো রামচন্দ্র।
অন্য এক অবসরে রামচন্দ্র ভাবলো, বুড়োটা কী শুনতে কী শুনেছে। কিন্তু প্রতিবেশীরা যদি এরকম মনে করে যে কেষ্টদাস চলে যাওয়াতে তারা দুঃখিত না হয়ে বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, সেটাও তো ভালো নয়। মানুষের এমন নির্দয় হওয়া উচিত নয়। এই সময়ে একবার তার পর গলার চিহারটার কথা মনে পড়লোহার পরার বয়েস তার পার হয়নি, তবে এদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, হারটা আর দু-চারদিন পরে পরলেই ভালো ছিলো।
ছিদামকে এ-বিষয়ে উপদেশ দেওয়া উচিত কিনা মনে মনে এই আলোচনা করতে করতে কিছু সময় চলে গেলো।
সানিকদিয়ারের জারু কামারের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর একটি বিবাহযোগ্য মেয়ে ছিলো। কেষ্টদাস তাদের পাল্টাঘর। চাষী হিসাবে ছিদাম উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। জারু কামার একদিন খোঁজখবর নিতে এসেছিলো।
সে যখন স্বগ্রামে ফিরে যাচ্ছে তখন রামচন্দ্রর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো।
জারু বললো, কেন, পদ্ম কি কেষ্টদাসের ইস্ত্রি না?
গাঁয়ের লোক তো তাই জানে। এ কথা কন্ যে?
ছিদামও তো কেষ্টদাসের ছাওয়াল?
আপনের কথা ধরবের পারি না।
জারু কথা ভাঙলো না। মামুলি দু-একটা কথা বলে সে চলে গেলো।
রামচন্দ্ৰইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলো। বিষণ্ণতায় সেদীর্ঘকাল মুহ্যমান হয়ে রইলো। কেষ্টদাস আপদে-বিপদেছিদামদের রক্ষাকরার জন্য চিঠিতে অনুরোধকরেছে। কিন্তু একীবিপদে পড়লো ছিদাম। মানুষের মন, বিলের ঠাণ্ডা জলেও ঝড় উঠলে ভরা ডুবি। আহা, এ থেকে কি তাকে রক্ষা করা যাবে?
কিন্তু ধর্মকে রক্ষা করতে হবে। তাই যদি না করা গেলে তবে বৃথাই শিবমন্দির করা। অবশেষে একদিন রামচন্দ্র ছিদামকে ডেকে নিলো। শিবমন্দিরের চত্বরটুকু ভরদুপুরে নির্জন থাকে। কথা বলার পক্ষে এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ছিদাম বিস্মিত হয়ে বললো, কে, জ্যাঠা, এখানে ডাকে পাঠাইছো যে?
আয়, আয়, একটুকু কথা কই।
কিছুক্ষণ চাষবাস নিয়ে আলাপহলো। তারপর রামচন্দ্র বললো, তোক এক কথা কই, শোন। গোঁসাই যে মহাভারত পড়ে, শুনছিস? তার মধ্যে ভীষ্মর এক কথা আছে। তার মতো বীর আর কৈল কেউ না। ইচ্ছা করলি ধেনুকে বাণ জুড়ে সাতদিনে না কয়দিনে পৃথিমি রসাতলে দিবের পারে। ধরো যে সে গঙ্গার ছাওয়াল, পদ্মা আর গঙ্গা ধরো যে একই। এক মচ্ছকুমারী দেখে ভীষ্মর বাবার ইচ্ছা হলো তাক ঘরে আনে। খবর শুনে ভীষ্ম বলে কন্যেক নিয়ে আসি। ভীষ্মর বাপ বুড়া আর সে জুয়ান। কন্যের মা বাপ কন্যের বিয়ে দিতে চায় ভীষ্মর সঙ্গে। ভীষ্ম কয়, তা হয় না, বাপ যখন তাক চায়েছে ওকন্যে তারই। অথচ মনে করো, ইচ্ছা করলি সে-ই রাজকন্যে পাতে পারতো।
