.
কিছুদিনের মধ্যেই রামচন্দ্র কেষ্টদাসের অনুপস্থিতি অনুভব করতে শুরু করলো। একদিন বিকেল হলে সে নতুন মহাভারতখানা হাতে নিয়ে কোঁচার খুঁটে ধুলো মুছে আবার কুলুঙ্গিতে রেখে দিলো। সে পড়তে জানে না।
পথে পথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একদিন রামচন্দ্রর মনে হলো আবার একটা মচ্ছোবকরলে হয়। দু-একজনকে বললোও সে কথাটা, কিন্তু অত বড়ো ব্যাপারটায় হাত দিতে যতটা দরকার তেমন উৎসাহ কেউ দেখালো না।
এই পর্যায়ে আলাপ করতে করতে একদিন রেবতী চক্রবর্তী বললো, বাপু হে, ধর্মে কি আর কারো মতি আছে?
একেবারেই নাই তা না। ধান-পান করতি দিন যায়, কীর্তন গান করে কখন কন্?
কথা ভালোই। ধর্মে যদি মতি হয়ে থাকে শিবমন্দির উদ্ধার করো না কেন্?
আলাপটা যেখানে হচ্ছিলো উদ্দিষ্ট শিবমন্দিরের ধ্বংসাবশেষটি তার থেকে খুব দূরে নয়। গ্রামের মাঝখানে এই শিবমন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ বহুদিন থেকে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে আছে।
রামচন্দ্র বললো, রেবতদাদা, তোমার তো পুরোত বংশ। এখনো তার জন্যি দু-পাঁচ বিঘা নিষ্কর জমি ভোগ করো। একদিনও কি পূজা দেও?
রেবতী চক্রবর্তী বললো, বিশ্বম্ভর সারা বিশ্ব ভর করে আছেন, আমার বাড়িতে রোজ পূজা হয়। সে যদি কোথাও যায় তবে এখানেও আসে।
সূত্রপাত এমনি সামান্য কথাবার্তা থেকে। একদিন দেখা গেলো গ্রামের পাঁচ-সাতজন বৃদ্ধকে নিয়ে রামচন্দ্র দা হাতে করে শিবমন্দিরের জঙ্গল কাটতে লেগে গেছে। যে শক্তি ও উৎসাহের জন্য রামচন্দ্র চাষীদের মধ্যে বিশিষ্ট তার সবটুকু সে প্রয়োগ করলো জঙ্গলটার উচ্ছেদে। পথের ধার থেকে জঙ্গল শুরু হয়ে মন্দিরের চত্বর পর্যন্ত প্রায় একশ হাত চৌরশ জমি। মাঝারি ও বড়ো বেল এবং আম কাঁঠালের গাছগুলিকে রেখে অন্যসব গাছ ও আগাছা কাটতে কাটতে রামচন্দ্রর দল ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ব্যাপারটা অভিনবত্বে পথিক দাঁড়িয়ে পড়ে। রামচন্দ্র হাঁক দিয়ে বলে, ও ভাই, এদিকে আসো। তামুক খাও। পিটুলি গাছটায় একটা কোপ দিয়ে যাও। বাবা বিশ্বম্ভর কৃপা করবি। অনেকে হাসিহাসি অপ্রতিভ মুখে পালিয়ে যায়। দু-একজন তামাকের লোভে কিংবা দলেমিশবার লোভে দা হাতে করে কিছুক্ষণ কাজ করেও যায়।
একদিন মুঙ্লা আপত্তি জানালো সনকার মুখ দিয়ে।
সনকা রামচন্দ্রকে বললো, মুঙ্লা একলা পারবি কেন্?
কেন্ পারে না? যখন আমি থাকবো না তখন কী করবি? আমি যখন একলা করছি তখন আমার কোন শ্বশুর আসে লাঙল ধরছে? আমার যে বয়েস তাতে ওপারের খবর নেওয়া লাগে।
মুঙ্লার সঙ্গে লাঙল অবশ্য ধরেছিলো রামচন্দ্র কিন্তু সে যেন মুখ রক্ষা করার ব্যাপার। দুপুরের পর জমিতে ফিরে না গিয়ে রামচন্দ্র শিবমন্দিরের জঙ্গল কাটতে যায়। স্কুল-পালানো ছেলের মতো সে বলে, জমিতে রোদ্দুর, জঙ্গলে ছায়ায় বসা যায়।
.
এমনি সময়ে রামচন্দ্রর কাছে একখানা চিঠি এলো। তাকে কেউ চিঠি লিখবে এটা বিশ্বাস করাই কঠিন। অবশেষে ডাকপিওন যখন বললো খামে নবদ্বীপের ছাপ আছে তখন মনে হলো তার, এ নিশ্চয় কেষ্টদাসের চিঠি। কে পড়বে? মুঙ্লা কিছু পারে পড়তে, ছিদামও কিছু জানে। কিন্তু কিছু জানার উপরে নির্ভর করে এমন একটা মূল্যবান জিনিস নষ্ট করা যায় না। ব্যাপারটা শুনে ভান্মতি বললো, আমি একবার দেখি না। রামচন্দ্রকে বিস্মিত করে ভান্মতি একটু থেমে থেমে চিঠিটা পড়ে দিলো।
কেষ্টদাস নবদ্বীপে আছে। সে গ্রামে ফিরবে এমন সম্ভাবনা নেই। ছিদাম মানুষ হয়ে গেছে। তাহলেও রামচন্দ্র যেন আপকালে তাকে দেখে।
রামচন্দ্র সেদিন আদৌ জমিতে গেলো না। সন্ধ্যা হতে হতেই সে কেষ্টদাসের বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেলো। কেষ্টদাস চিঠি লিখেছে সে ভালো আছে, এই সংবাদ দেওয়ার ছিলো; সে নিজে এতদিন পদ্ম-ছিদামের দিকে লক্ষ্য রাখেনি এই দুঃখ ছিলো।
ছিদাম বাড়িতে ছিলো না। পদ্ম তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে ঘরে উঠতে গিয়ে রামচন্দ্রকে দেখতে পেলো।
ছিদাম বাড়িতে নাই?
সানিকদিয়ারে গেছে, বসেন।
কী কর্তব্য তাই ভাবছিলো রামচন্দ্র, ততক্ষণে পদ্ম মাদুর পেতে দিয়ে ‘বসেন, আলো জ্বালে আনি’ বলে চলে গেছে।
আলো জ্বেলে এনে পদ্ম খানিকটা সময় কপাট ধরে দাঁড়িয়ে রইলো।
রামচন্দ্র বললো, শুনছো না, কন্যে, গোঁসাই চিঠি দিছে, সে ভালোই আছে নবদ্বীপে।
আমরা কোনো চিঠি পাই নাই। ছিদাম চিঠি দিছলো কাকে দিয়ে লেখায়ে। তা মনে কয় ঠিকানায় ফের পায় নাই।
ইতিমধ্যে একসময়ে পানের বাটা নিয়ে এসেছিলো পদ্ম। সে মুখ নিচু করে পান সাজতে লাগলো। সন্ধ্যার স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাটিতে ছড়ানো একগোছ পাতা উড়ে উড়ে বেড়ালো বারান্দার নিচের আঙিনাটুকুতে। শাদা মাটিতে লেপা বারান্দা, দেয়াল, আঙিনায় স্নান আলো এবং ছায়ায় জালিকাটা।
এর আগেও মহাভারতের আসরে পান এসেছে, কখনো রেকাবিতে,কখনো ছিদামের হাতে। আজ রামচন্দ্রর প্রসারিত হাতে পান দিতে গিয়ে পদ্মর হাতখানা যেন একটি দীর্ঘতর মুহূর্ত রামচন্দ্রর হাতের উপরে রইলো।
পদ্ম বললো, আপনি শিবমন্দির পতিষ্ঠে করতিছেন?
শুনছো? পতিষ্ঠে কোথায়–আছেই তো।
পদ্ম হেসে বললো, মুঙ্লা কয়, বাবা যদি শি নিয়ে থাকে, জমি দ্যাখে কে?
অমন কয়। কও, পদ্ম, আমি যখন না-থাকা হধ্যে তখন? আজ যে কেষ্টদাস নাই, ছিদামের সকল একা একা করবের হয় না?
