কিন্তু সীমানা নিয়ে কোনো গোলমালও হয়নি দখলের সময়ে। সিংহীদের জমির সীমায় সীমায় লাঙল ধরেছিলো রামচন্দ্র, এরশাদ, ছিদাম আর ইয়াজ-আমলাদের ভাষায় গুলবাঘারা।
নায়েব একদিন রামচন্দ্রকে ডেকে পাঠালো।
রামচন্দ্র, ফসল প্রজারা তিন ভাগের এক ভাগ দিক, কিন্তু সেই এক ভাগের একটা কমপক্ষে পরিমাণ ঠিক থাকা উচিত, কী বলো?
রামচন্দ্র একটু ভেবে নিয়ে বললো, এরশাদভাই, কী ক?
তা ধরেন যে থাকা উচিত।নাইলে লোভে পড়ে জমি নিলাম, চষলামনা, এমন হবি।হইছেও কিছু কিছু। এরশাদ বললো।
নায়েব বললো, খাজনার পরিমাণ টাকার ফসলটা অন্তত নিয়মিত পাওয়া দরকার।
রামচন্দ্র বললো, আমি কিছুই কবো না এখন, ভাবে দেখি। আপনের জ্ঞানবুদ্ধির লেখাজোখা নাই। আপনেও ভাবেন। সব বার সমান ফসল দেয় না জমি। তাছাড়াও মানষের জেবন
বিচক্ষণ নায়েব কথাটিকে তখনকার মতো সরিয়ে নিয়ে বললো, তামাক খাও, রামচন্দ্র। তামাক খাওয়ার পর নায়েব বললো, রামচন্দ্র, তোমার কী একটা বলার ছিলো যেন?
আজ না, আর একদিন কবো। বলে রামচন্দ্র বিদায় নিলো।
নায়েবমশাই এর আগে একদিন বিস্মিত হয়েছিল। যখন খাসজমিতে কায়েম হওয়ার আনন্দে সবাই উজ্জ্বল তখন রামচন্দ্র উইলের কথা তুলেছিলো। আজকের রামচন্দ্রও যেন ততোধিক ক্লান্ত একজন।
পথে রামচন্দ্র ভাবলো, নায়েব কথাটাকে টেনে নিচ্ছিলো। কিন্তু প্রকাশ না করেই ভালো। করেছে সে। রায়ত থেকে জোতদার হওয়ায় সত্যিকারের কোনো লাভ নেই।
অবশ্য কথাটা উঠে পড়লে সে নিজের প্রস্তাবের যুক্তি হিসাবে বলতে পারতো রায়ত থেকেই তো জোতদার হয়, জমিদার হয়। জমির সংস্পর্শে থাকতে থাকতে তার সঙ্গে নানা প্রকারের সম্বন্ধই হতে পারে।
কিন্তু এটা উত্তর নয়। কিংবা কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলা যায়, আমরা যা কামনা করি সেটা কি সব সময়ে আমাদের চেতনাগ্রাহ্য? সেটা আমাদের নিজস্ব কামনানা হয়ে অন্যের আকাঙ্ক্ষার অনুকরণও হতে পারে। নিজের একটা বিশিষ্ট অভাববোধ আছে, তার স্বরূপ নির্ণীত হয়নি, অথচ প্রতিকারের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, এমন সময়ে অন্যের কামনালব্ধ বিষয় দিয়ে নিজের অভাববোধটিকে প্রলেপিত করার ইচ্ছা হয়। জোতদারি রামচন্দ্রর উচ্চাভিলাষ নয়, বরং তার বিপরীত। রুপোর টাকার পাহারাদারি করতে, তাকে বাজারে চালু রাখতে উৎসাহ নেই; অথচ তার মায়া ছাড়তে না পেরে কোম্পানির কাগজ করা।
এমন হতে পারে না কি মৃত্যু এবং অবসানের সূচক উইলের ব্যাপারটাই তার মনে একটা সাময়িক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে? এবং সেব্যাপারটাও তার অজ্ঞাত?
যাই হোক, রামচন্দ্র বাড়িতে ফিরে দেখলো উঠোনে ধান মেলে দেওয়া হয়েছে। উঠোনের একপাশে বসে ধূলিধূসর ভান্মতি কুলোয় করে ধান ঝেড়ে পরিষ্কার করছে। রামচন্দ্র বললো, দিনরাতই কাম করিস কে?
না, বাবা, দিনরাত না।
দ্যাখ তো চেহারা কী করছিস ধানের ধুলায়?
ভান্মতি উঠে গিয়ে রামচন্দ্রর তামাক সেজে আনলো।
রামচন্দ্রর স্ত্রী এক এক হাঁড়ি সিদ্ধ করা ধান রোদে মেলে দিতে এলো। ধানগুলো উঠোনে ঢেলে একটা বাখারি দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে সে বললো, ধানের ধূলা গায়ে লাগে না যার সে কেমন মিয়েছিলে? তোমার ভান্মতি কি সংসার করবি নে?
কিন্তুক এ-সংসার তো সনকার। রামচন্দ্র হাসিমুখে বললো।
তা হলিও বেটার বউ শাশুড়ির পাছে পাছে ঘুরে কামকাজ শিখে নিবি।
সনকাও ভান্মতিকে ভালোবাসে। কিন্তু সে তাকে বেটাবউ বলে উল্লেখ করে। রামচন্দ্র তাকে মেয়ে হিসেবে দেখতে চায়।
অন্য আর একদিন সনকা অত্যন্ত মৃদুস্বরে বললো, শোনন, তোমাক এক কথা কই। তুমি যে আসনে বসো সেখানে ভান্মতির বসা লাগে না।
বিস্মিত হয়ে রামচন্দ্র প্রশ্ন করলো, কেন?
সনকা কণ্ঠস্বরকে আরও নিচু করে বললো, জাননে কে, অমঙ্গল হয় লোকে কয়। শ্বশুরের সামনে মাথার কাপড় ফ্যালে তা ফেলুক, তাই বলে এক আসনে বসা লাগে না।
কেন, আমার মিয়ে থাকলি কি আমার কাছে বসতো না?
সে তোমার রক্তমাংসে তৈরি হইছিলো।
তা বটে। লোকে মন্দ কবি, না?
লোকের কথার ভারি ধারি! কউক, মুঙ্লার বাপ মণ্ডল অন্যাই করছে, মুঙ্লাক শিখায়ে দিবো মাথা কাটে আনবি তার। তেজোবতী সনকা কথাটা উঁচু গলাতেই বলে ফেলো।
মেয়ের মৃত্যুর তারিখটা রামচন্দ্রর মনে আছে, কিন্তু সেটা কবে এসে পড়ে পার হয়ে যায় তা তার ঠিক খেয়াল থাকে না। কিছুদিন বাদে এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে দেখলো, তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে সনকা সেখানে বসে দুহাত দিয়ে তুলসীমঞ্চ স্পর্শ করে অস্ফুট স্বরে হরিনাম করছে। দেখামাত্র রামচন্দ্র বুঝতে পারলো এবং ম্লান হয়ে গেলো। আজ তার মেয়ের মৃত্যুবার্ষিকী। তার স্ত্রী যেন কোনো এক অদৃশ্য পুরুষের দু পায়ে হাত রেখে মিনতি জানাচ্ছে।
রাত্রিতে রামচন্দ্র সনকাকে বললো, একটা কথা কবো?
কও।
আচ্ছা, এমন যে কদাকাটা করো, ভানুমতির লাগে না?
কেন্ লাগবি?
ধরো যে তার তো সতীন।
সনকা একেবারে কাঠ হয়ে গেলো।
কথা কও না যে!
সনকা বললো, ভান্মতির দুপাশে তুমি আছো আর মহিমকাকা আছে। তার মুঙ্লা আছে।
এই দুনিয়ার সব তার দখলে। আমার সেই ছোটোমিয়েটার জন্যি কি কেউ থাকবি নে? আমিও না?
সনকার চোখ দিয়ে জল পড়ছিলো। কথাগুলি শুধু সনকার নয়, রামচন্দ্রর অন্তঃকরণই যেন সনকার মুখ দিয়ে কথাগুলি উচ্চারণ করছিলো। রামচন্দ্রর চোখ দুটিও ঝাঁপসা হয়ে এলো। সে বললো, তুমি আমার পাশে শুয়ে শুয়ে ভগোমানের কাছে তার কথা কও। আমি যে কবের পারি নে। শেষ কথাটি বলতে গিয়ে রামচন্দ্রর ঠোঁট দুটি অবাধ্যের মতো কাঁপতে লাগলো।
