সে দেখতে পেলো বারান্দার নিচে বসে ছিদাম একটা জাল বুনছে, আর তার অনতিদূরে পদ্ম উদুখলে কী একটা চূর্ণ করতে করতে গুনগুন করে গান করছে। কেষ্টদাসের মনে হলো, কাজটা এমন নয় যে এই মাঝরাতে করতে হবে। কাজের চাইতেও পরস্পরের সঙ্গ পাওয়াই যেন এর সার্থকতা। বিছানায় ফিরে সে চিন্তা করতে চেষ্টা করলো–এমনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেই সংসারটাকে ওরা চালাচ্ছে।
দু-একদিন পরে অতি প্রত্যুষে তার ঘুম ভেঙে গেলো। সে লক্ষ্য করলো ছিদাম গোয়ালের পাশে লাঙল সাজাচ্ছে। চৈতন্য সাহার কাছে ঋণ নিয়ে ছিদাম একজোড়া রোগা রোগা বুড়োটে বলদ কিনেছে। বলদ জোড়ার কাঁধে জোয়াল তুলে দিয়ে পদ্ম ঘর থেকে ছিদামের মাথাল, হুঁকো তামাকের থলি প্রভৃতি নিয়ে এলো। পদ্মর পরনে আজও একটি পরিচ্ছন্ন রঙিন শাড়ি। তার শাড়ি পরার ধরনটাতেও বৈশিষ্ট্য আছে–দুখানা হাত, একটা কাঁধ,হাঁটুর কিছু নিচে থেকে পায়ের পাতা অবধি অনাবৃত। এমন স্বাস্থ্য না হলে এমন মানায় না। পদ্ম কখনো মাথায় কাপড় দেয় না। শ্রীকৃষ্ট লক্ষ্য করলো পদ্মর চুলগুলিও চকচক করছে। এত সকালেই তার স্নান হয়ে গেছে। দ্রুত অভ্যস্ত পারদর্শিতার সঙ্গে তারা কাজ করে যাচ্ছে এবং অনুচ্চ গলায় অনর্গল কথাও বলছে। ছিদাম যখন পা বাড়াবে তখন পদ্ম এসে মাথালটা তার মাথায় বসিয়ে দিলো। হুঁকোর থলেটা তুলে দিলো, হাতে।
ছিদাম চলে গেলে পদ্ম উঠে এলো কেষ্টদাসের কাছে।
এত সকালে যে উঠছো?
এমনি। মনে হলো এমন সাজায়ে যতি দিতা আমিও একটু চাষবাস করতাম।
পদ্ম হাসলো। সে বললো, হাত মুখ ধুয়ে আসো গা, খাবের দেই। চালভাজা গুড়া করে কাল মোয়া বাঁধে রাখছি।
কেষ্টদাস একটি বাধ্য ছেলের মতো গেলো। কিন্তু কোনো এক অনির্দিষ্ট অসার্থকতায় তার মন সংকীর্ণ হয়ে রইলো। পদ্মর স্বাস্থ্য ও ছেলের যৌবনের পাশে তার রোগ ও বার্ধক্যজীর্ণ দেহ বারংবার তুলনার মতো মনে ফুটে উঠতে লাগলো।
কিছুদিন পরে কেষ্টদাস হাটে গিয়েছিলো। দীর্ঘদিন সে এ পথে চলেনি। হাটে পৌঁছে সে বুঝতে পারলো সংসারের জন্য কী কিনতে হবে সে সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তার নেই এখন। তারপর তার মনে হলো ছিদাম এ হাট থেকে সওদা করে না, বুধবারের হাটেই তার কেনাকাটা করে। তখন কেষ্টদাস দু পয়সার পান, পয়সা চারেকের চুয়া, যা প্রয়োজনের নয় এমন একগাছি চুল বাঁধবার ফিতে কিনে খুশি খুশি মুখে বাড়ির দিকে চলতে লাগলো। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে সে থেমে দাঁড়ালো। শোবার ঘর থেকে ছিদাম আর পদ্মর হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের রাগারাগির সময়ে যেমন একটি কৌতূহল তাকে আবিষ্ট করেছিলো, এখন তেমনি একটি সংকোচ তাকে আচ্ছন্ন করলো। আকস্মিকভাবে তার অনুভব হলো, তার এই হাটে যাওয়ার ব্যাপার নিয়েই তারা হাসাহাসি করছে। তার মনে পড়লো না, তার পান চুয়া কিংবা চুলের ফিতে কেনার সংবাদ কারো জানার কথায়। সে পায়ে পায়ে ফিরে গিয়ে রাস্তার ধারের জিওল গাছটার নিচে গাঢ় অন্ধকারে একটি ক্লান্ত বৃদ্ধ পথ-হারানো বলদের মতো ধুকতে লাগলো।
অনেক দুঃখে, অনেক আঘাতে আহত হয়ে এই কুঁড়েগুলির আশ্রয়ে সে পড়ে থেকেছে। সেই অভ্যাসেই যেন তার পা দুটি তাকে বহন করে নিয়ে এলো তার ঘরের দরজায়, তারপর ঘরের ভিতরে বিছানার কাছে। রাতটা তার জেগে জেগে কেটে গেলো।
দিন দশ-পনেরোর ব্যবধানে সে দর্শনের সাহায্যে ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি করতে চেষ্টা করলো। রাধা কি কখনো কিশোরের সান্নিধ্যে না হেসে পারে? দ্যাখো তো ওদের? অন্য অনেক জোড়া মানুষের কথা মনে হয় না? কিন্তু তার দর্শন ব্যর্থ হলো। সে নিজেকে ধিক্কার দিলো-ছি, ছি, নিজের ছেলের সম্বন্ধে এ কী ভাবনা! সম্বন্ধে পদ্ম মাতৃস্থানীয়া।
আর একদিন তার মনে হলো পাড়ার সব লোকের কাছে সে কেঁদে কেঁদে বলবে তার ব্যর্থতার কথা। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সম্মুখে যেন প্রতিবেশীদের ঠোঁটের চাপা হাসির দৃশ্যটা ভেসে উঠলো।
কিন্তু আনন্দের লহরের মতো ছিদাম এসে দাঁড়ায়, শুনছো না, বাবা, নায়েবমশাই রাজি হইছে। কন্ যে বলদ যখন কিনছে ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ো।
অবশেষে কেষ্টদাস স্থির করলো কৃতকর্মের ফলভোগ তাকে করতেই হবে। সহ্য করতে পারবে না সে–মহৎ মানুষরা যেমন পারে; প্রাণটাকেই বার করে দিতে হবে। কেবল হাঁটা আর। হাঁটা, না-খাওয়া, না-মান। নবদ্বীপ থেকে হেঁটে বৃন্দাবন। সেই ধুলোর পথে হাঁটতে হাঁটতেও যদি প্রাণ না যায় তবে বৃন্দাবন থেকে বুকে হেঁটে মথুরা। ঝোলা নয়, গোপীযন্ত্রে নাম নয়। রোদ হিম ধুলোর সাহায্যে দেহটাকে ধ্বংস করতে হবে। ছি, ছি, কী মন তার! ছেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা? কু-এ মন আচ্ছন্ন।
একদিন অতি প্রত্যুষে রামচন্দ্র দেখলো, তার দরজায় শ্রীকৃষ্ট দাঁড়িয়ে।
কী খবর, গোঁসাই?
কেষ্টদাস রামচন্দ্রর উপহার নতুন মহাভারতখানা তাকে ফিরিয়ে দিলো–এটা রাখেন, ভাই। কেষ্টদাসের চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু পড়তে লাগলো।
কেন, কী হলো?
কেষ্টদাস একবার হাসির চেষ্টা করে বললো, তীত্থ করবের যাই। মনস্থির করে যতি ফিরে আসি আবার পড়বো।
শ্রীকৃষ্ট চলে গেলো।
৩৩. জমিদারের মান রেখেছে রামচন্দ্র
জমিদারের মান রেখেছে রামচন্দ্র। ফসল খুব ভালো হবার কথা নয় তার জন্য নির্দিষ্ট জমিতে। উপর থেকে পলির গভীরতা ঠিক বোঝা যায়নি।
