প্রথম দিকের একটি নিঃশব্দ দ্বন্দ্বের কথা মনে পড়ে গেলো কেষ্টদাসের। একটা নতুন মৃদঙ্গ জোগাড় করেছিলো সে। পদ্ম গান করে না, কিন্তু সুকণ্ঠী।নতুন মৃদঙ্গ আনার পর কেষ্টদাস একদা মাথুরের দু-এক পদ তার সুরহীন গলায় করুণ করে গেয়ে বৈষ্ণবীর গলায় সুর ফোঁটাতে চেষ্টা করেছিলো। পদ্ম হেসে লুটোপুটি–অমন করে গায়ো না, কান্না পায়।
তা পাওয়া লাগে। ভাবো তো শ্ৰীমতীর সোনার অঙ্গ পথের ধূলায় গড়াগড়ি যাতেছে।
তা যাক। তুমি তো শ্ৰীমতী না।
কেষ্টদাস ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলো।
এরপর যতদিন কেষ্টদাস সুস্থ ছিলো শ্যালিকাস্থানীয়া আত্মীয়া হিসাবে সে কখনো কখনো রসিকতা করেছে। তার প্রত্যুত্তরে মধুরতর রসিকতাও পেয়েছে, কিন্তু প্রেম কিছুমাত্র জন্মায়নি।
পদ্ম রাঁধে বড়ো ভালো। পদ্ম তার সেবাও করে। বালাতে তার অসুখের বৃদ্ধি হয়। পুরনো ঘিয়ের বাটি হাতে করে পদ্ম সেদিন তার শয্যার পাশে এসে বসে। নিজের রোগজীর্ণ পাজরার উপরে পদ্মর স্বাস্থ্যপুষ্ট হাতখানি সে অনুভব করে। হয়তোবা পদ্মর মুখ অন্যদিকে ঘোরানো থাকে কিন্তু পানরাঙা তার
ঠোঁট দুটি কেষ্টদাসের চোখে পড়ে।
কতগুলি ঘটনা আছে যার আকস্মিকতা বজ্রের মতো ফেটে পড়ে নিজেকে প্রচারিত করে, আর কতগুলি আছে যা পদ্মার জলের মতো নীরবে অগ্রসর হতে হতে আচম্বিতে সমস্ত গ্রাম ধসিয়ে দেয়,কখনো সমস্ত গ্রাম প্লাবনে মুছে দেয়। মনে দৈনন্দিন চিত্রগুলির ছাপ পড়ছে, অস্পষ্ট হয়েও যাচ্ছে, কিন্তু বিশেষ একটি দিনে মনোযোগের সন্ধানী আলো পড়তেই সেই অস্পষ্ট অতীতের ছবিগুলিও ফটোর মতো কিংবা তার চাইতেও অর্থগুরু চিত্রের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পদ্মকে কিছু প্রতিদান দেওয়া উচিত তার শ্রমের, একটু প্রিয়-সাধন করা উচিত, এই চিন্তা কেষ্টদাসকে পরর দিকে আগ্রহশীলকরলো। তার সংসার-উদাসীন মন সংসারের দিকে ফিরলো।
ছিদামের চড়া গলার শব্দে এক সকালে ঘুম ভেঙে গেলো কেষ্টদাসের। বাইরে এসে সে দেখতে পেলো উঠোনের একপ্রান্তে পদ্ম ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে আছে, আর ছিদাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে তিরস্কার করছে।
ছিদাম বললো, কইছিলাম বলদেক বাঁশপাতা আনে খাওয়ায়য়া। তা মনে ছিলো না, এখন বলদ নড়বের চায় না। চাষ দিবো কি নিজে জোয়ালে লাগে?
ছিদাম গজগজ করতে করতে অসুস্থ বলদ দুটিকে বেঁধে রেখে ছোটো উঠোনটুকু পার হয়ে পাশের জঙ্গলাকীর্ণ একটা ভিটার দিকে চলে গেলো। দশ-পনেরো মিনিট বাদে যখন সে ফিরে এলো তখন তার মুখের ভাব বদলে গেছে। কিন্তু পুরুষমানুষ তো বটে। রাগটা পড়ে গেলেও সোজাসুজি পদ্মর দিকে না গিয়ে দাওয়ায় উঠে বসলো। অনেকটা সময় বসে থেকেও যখন প্রত্যাশিত খোশামোদটুকু পেলোনা তখন অবশ্য তাকেই প্রথম কথা বলতে হলো, বাঁশের পাতা না আনে পতিত ভিটায় জমি কোদলাইছো, তা কলি কি হত?
পদ্ম উত্তর দিলো না।
তা ভালোই করছে। দেবোনে দু-পয়সার চুয়া আনে। এখন পান্তা দিবা কিনা কও।
পান্তা যে খাবা, নুন আছে না তেল?
তার এখন কী জানি আমি। কাল সাঁঝবেলায় কতি পারো নাই?
কালও তো অকারণ রাগবের লাগলে। আমি তোমার কী অন্যায় করছি।
ছিদাম অভুক্ত অবস্থায় দমদম করে বেরিয়ে গেলো।
তখন পদ্ম খানিকটা সময় আপন মনে বকবক করলো, তারপর রান্নার চালাটার আগড় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোর দিয়ে বন্ধ করে উঠোনে এসে দাঁড়ালো। সেরাঁধলোনা। কেষ্টদাসের জন্য কিছু ফলাহারের ব্যবস্থা করে দিয়ে শরীর ভালো নেই বলে ঘরে এসে শুয়ে রইলো।
সন্ধ্যায় ছিদাম বাড়ি ফিরলে পদ্ম কথা না বলে হাত-মুখ ধোবার জন্য এক ঘটি জল এগিয়ে দিলো।
ছিদাম হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেলে পদ্ম ভাত বেড়ে দিয়ে উনুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো।
কলাইয়ের ডাল আর ডুমুরের তরকারি দিয়ে গরম গরম ভাত খেতে খেতে ছিদাম পুলকিত হয়ে উঠলো। পেট ভরে ভাত খেয়ে উঠে রহস্য করেও বাঁকা কথা বলার মতো মন রইলো না তার। সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, সারাদিন যে জলও খাও নাই তা বুঝছি। খায়ে নেও, আমি আসতিছি, এক বুদ্ধি আছে।
তামাক খেয়ে ছিদাম যখন ফিরে এলো তখনো পদ্মর খাওয়া হয়নি। কেষ্টদাস খেতে বসেছে। ছিদামের আর দেরি সহ্য হচ্ছিলো না। সে বললো, বাবার পুঁথি পড়া কুপিটা চুরি করবের হবি, বুঝলা না। তুমি আলো ধরে দাঁড়াবা, আমি শাকের বীজ ছড়ায়ে দিবো। কথা কও।
পদ্ম কথা না বলে ঘরের কাজগুলি শেষ করতে লাগলো।
কেষ্টদাস আজ সমস্তটা দিন এদের কলহের গতি লক্ষ্য করেছে। খানিকটা তার কানে এসেছে, খানিকটা সে কান পেতে ধরেছে। শেষের দিকে শুনবার জন্য সে আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তার মনে পড়ে গেলো যখন নিজে সে চাষী ছিলো তখন তার প্রথম বৈষ্ণবীর সঙ্গে এমনি কলহ হতো। রাত্রিতে তার মনে হলো, হয়তো পদ্ম সারাদিনে কিছু খায়নি। বাড়ির কর্তা হিসাবে এ বিষয়ে তার কি করণীয় কিছু নেই। কিন্তু কী একটা সংকোচ তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখলো। বরং অহেতুকভাবে তার সেই দিনটির কথা মনে পড়লো যেদিন সে ছিদাম-পদ্মদের মাঠের গাছতলায় আবিষ্কার করেছিলো।
এক রাত্রিতে বিছানা ছেড়ে সেউঠে দাঁড়ালো। কী একটা শুনবার,কী একটা জানবার আগ্রহ যেন তার। সে দেখলো বৈষ্ণবীর বিছানা খালি পড়ে আছে, বারান্দায় ছিদামের মাদুরও খালি। তার মনে হলো এরকম ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছে। দ্বিতীয়া বৈষ্ণবী অত্যন্ত কোপনস্বভাবা ছিলো। রাগ করে সে ঘরে আসেনি, এমন একটি রাত্রিতে সে আর তার বৈষ্ণবী রাগারাগির ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলার জন্য গ্রামের অন্ধকার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলো।
