এখন করা কী?
রাঁধে খায়ে বিলে যাবো। মনটা ভালো নাই। ছাওয়াল বউ রাখে আসছি। ছাওয়ালের আবার ডোঙা নিয়ে বিলে মাছ ধরা বাতিক। ঝড় গেলো, মনে শান্তি নাই, ভাই।
ফিরে আসেও তো কিছু করা লাগবি?
হয়, এত জল। মনে কয় কিছু হেঁউতি ছিটালে হয়, নইলে জল তো বের্থা।
.
কিন্তু কিছু লোকের মনে দাগ রেখে গেলো এই সাম্প্রদায়িক ভীতি এবং তজ্জনিত বিদ্বেষ। নদানন্দর স্কুলের চারজন শিক্ষক ছুটি থেকে ফিরলোনা।কমত্যাগের চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেতারা।
সান্যালমশাইয়ের সেই সুমিত-প্রাসাদের কনট্রাক্টারও যেন ফিরছে না। তার খোঁজে লোক পাঠাতে হলো সদরে।
৩১. রামচন্দ্র মামলার নাম করে
রামচন্দ্র মামলার নাম করে সদরে গিয়েছিলো। সে যখন ফিরলো তখন সন্ধ্যা হয়েছে। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে সে লক্ষ্য করলো ভান্মতি গুনগুন করে গান করছে। ঘর্ঘর করে একটা জাঁতার শব্দও উঠছে। ভিতরের বারান্দায় এসে সে দেখতে পেলো ভান্মতি গান করতে করতে ডাল ভাঙছে। রান্নাঘরে রান্নার শব্দ হচ্ছে।
ভান্মতি তাড়াতাড়ি উঠে এসে দাঁড়ালো কাছে, বললো, আমার জন্যি কী আনছেন, বাবা?
আনছি, আনছি। রামচন্দ্র তার গামছার পুঁটুলি খুলে একখানা রঙিন শাড়ি বার করলো।
কেউ কেউ আছে যারা গ্রহণ করার আন্তরিকতায় যে কোনো দানকে মহার্ঘ করে দিতে পারে। এ বিষয়ে ভান্মতির নাম করা যায়। রামচন্দ্রর মনে হলো সার্থক হয়েছে বাড়ি ফেরা।
স্ত্রী সনকা এলো। ভান্মতি গেলো হাত-পা ধোবার জল আনতে।
রামচন্দ্র বললো, তোমার জন্যও একটু আনছি।
চুপ করো, মিয়ে শুনবি। বলে সনকা শাড়িখানা হাতে নিয়ে গলা নিচু করে বললো, এ যে বাবু কাপড়।
হোক তা।
কিন্তু আসল কথা রামচন্দ্র ভাঙলো খেতে বসে। সে ভান্মতিকে বললো, একদিন তুমি কইছিলে জমিজমা লিখে-পড়ে দিলে তাড়ায়ে দেয়।
তা দেয়।
তাই বলে লেখাপড়া না করলিও তো মানুষের চলে না। এমন লেখা লিখছি যাতে তাড়ায়ে দিবেরও পারবে না, অথচ লেখাও যোলো আনা হইছে।
তুমি তাইলে এজন্যি সদরে গিছলা? বললো সনকা।
ভালো কাজ চুপেচাপে করতি হয়। কাগজখান দিবো, যত্ন করে রাখবা। এর নাম উইল। পোকায় যেন না কাটে, জলে যেন না ভেজে।
উইলের তাৎপর্য না বুঝলেও সনকা এবং ভান্মতি রামচন্দ্রর আনন্দের অংশ গ্রহণ করলো।
রামচন্দ্র বললো, বুঝলা না, ভানু, আমাক তাড়ায়ে দেওয়া দূরের কথা, যতদিন বাঁচে আছি আমার কাছেই তোমাদের থাকা লাগবি, তবে পাবা সম্পত্তি। উকিল লিখবের জন্যি বিশ টাকা নিছে।
রামচন্দ্র সদর থেকে যেসব জিনিস এনেছিলো তার মধ্যে একখানা নতুন মহাভারত ছিলো। পরদিন সন্ধ্যার আগে বইখানা নিয়ে রামচন্দ্র কেষ্টদাসের বাড়িতে গেলো।
বই দেখেই কেষ্টদাস আনন্দিত হয়েছিলো, সে যখন শুনলো বইখানা তার ব্যবহারের জন্যই এনেছে তখন সে কী করবে খুঁজে পেলো না।
অপ্রতিভের মতো মুখ করে সে বললো, পড়বো?
আপনার ইচ্ছা হয় পড়েন।
তার চায়ে আপনের কথা কন, শুনি।
রামচন্দ্রও নিজের কৌশলটুকু বর্ণনা করার জন্য উন্মুখ ছিলো। সে তার জমি জিরাত কী করে উইল করেছে, কী করে সেই কাগজের প্যাঁচে মুঙ্লা এবং ভান্মতিকে জড়িয়ে ফেলেছে, তার এই অল্পবয়সী উকিলের কত বুদ্ধি, কীরকম হেসে হেসে সে কথা বলে, সদরে কাপড় চোপড়ের আজকাল কত দাম, এসব বর্ণনা করে অবশেষে বললো, কন, এখন ওরা আপন হলো কিনা?
৩২. সেদিন রামচন্দ্র বিদায় নিলে
সেদিন রামচন্দ্র বিদায় নিলে শ্রীকৃষ্ট ভাবলো তার উইল করার কিছু নেই। এই কথা চিন্তা করতে করতে যেটা নিছক অনুকরণ প্রবৃত্তির উন্মেষ সেটা অর্থযুক্ত
হয়ে উঠলো। সে চিন্তা করলো, তার যেটুকু সহায়-সম্বল আছে তার কোনো ব্যবস্থা না করলে তার মৃত্যুর পর পদ্মর দুর্গতি হওয়াই সম্ভব। ছিদাম খুব নির্দয় নয়, পদ্মর সঙ্গে বর্তমানে তার অত্যন্ত সম্ভাবও আছে বটে, কিন্তু একসময়ে তার বিবাহ হবে, এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে পদ্মর বনিবনাও না-ও হতে পারে।একথা চিন্তা করতে গেলে বিস্মিত হতে হয়, পদ্ম–গত পাঁচ ছবৎসরে যার নিরন্তর পরিশ্রমে বাড়িটা বাড়ির মতো হয়েছে–তার কিছুমাত্র দাবি নেই সমাজের এবং আইনের চোখে।
একদিন পদ্ম যখন রান্না করছিলো, কেষ্টদাস নিজে থেকে পদ্মর জন্য পান সেজে এনে দিলো। রান্নার দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, পদ্ম, অভাগার সংসারে আসে কত কষ্টই করলা, কত দুঃখই পালা।
সংসারে সুখ আর কোনখানে?
এমন বদ্ধ খাঁচায় আবদ্ধ থাকলা?
পদ্ম একটু দ্বিধা করলো যেন, তারপরে বললো, মিয়েমানুষ আকাশে আকাশে উড়লে, ব্যাধের ফান্দে পড়া লাগে।
এখানেও ধরা যে কীসের টান তোমার? ফান্দের দড়ি যতি কেউ পাতে?
উত্তর যেন প্রস্তুতই ছিলো। পদ্ম হাসি হাসি মুখে বললো, সে ফাঁদ যতি পাতেও, ধরা দেওয়া না-দেওয়া পক্ষীর ইচ্ছায় হবি।
পদ্মর উদ্দেশ্য ছিলো কেষ্টদাসকে অহেতুক ভয় থেকে নিরস্ত করা কিন্তু কথাটা শেষ হয়ে গেলে কেষ্টদাস অনুভব করলো, এমন খাঁটি কথাও আর নেই। একটা পরিচয়ের আড়াল দরকার ছিলো পদ্মর, কেষ্টদাস সেই পরিচয়মাত্র। নতুবা যদি সে অন্য কোথাও বন্ধনে পড়তে চায় এদিকের কোনো আকর্ষণেই সেই বন্ধন তার কাছে পীড়াদায়ক হবে না।
কেষ্টদাস তখনকার মতো উঠে পড়লো। তার তো সম্পত্তি নেই রামচন্দ্রর মতো, যে তারই টানে পরও আপন হবে।
