সান্যালদের বাগানের মধ্যে দিয়ে ছিদাম দাদপুরী কৈবর্তদের নতুন পাড়ায় উপস্থিত হলো। মুকুন্দর সঙ্গে ইতিপূর্বে তার আলাপ হয়েছিলো। সে মুকুন্দর দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, যাওয়া হবি নে?
না। অগ্নিদাদা আর রাবণ যাবি। তারা গেছে বোধায়।
ছিদাম আরও কিছু এগিয়ে বিলমহলের পাড়ায় গিয়ে উপস্থিত হলো–এরশাদদাদা?
আসো, ভাই, আসো।
ছিদাম দেখলো এরশাদের ঘরের বারান্দায় পাঁচ-ছয়জন লোক জমেছে।
এরশাদ বললো, কী করা এখন, কও। জমির দিকে না চায়ে উপায় কী?
চাতে হবি।
ইয়াজ বললো, জলবৃষ্টি নাই। খেত হবি কে? তা এরশাদচাচা, এখন কী করা লাগে?
হাল বলদ ঠিকঠাক করা লাগে। জমিদারের লোক ডাকে আনে পত্যিকের জমির আল ঠিক করে নেওয়া লাগে। সকলেই কঞ্চি গাড়ে দখল নিছে।
এরা যখন কথা বলছিলো তখন মাঝেমাঝে ধুলোর ঝাঁপটা এসে এদের গায়ে লাগছিলো। একবার রাবণ কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই তার উন্মুক্ত মুখে কিছু ধুলো ঢুকে গেলো। অন্য সকলের চোখে-মুখেও কিছু বর্ষিত হলো।
এরশাদ বললো, চলেন, ঘরে বসি। জলের দেখা নাই, ঝড়ের দেখা নাই, কেবল ধুলোর ফকুড়ি।
এদের আলাপ-আলোচনার মাঝেমাঝে দূরের কলরবের মতো, কখনো বা আর্তনাদের মতো একটা চাপা শব্দ কানে আসছিলো।
একজন বললো, নিকম্মার সাটুপাটু বেশি। ধূলায় দুনিয়া পয়মাল।
বুঝলা না, আর একজন হেসে বললো, যে কামড়ায় সে ভোকে না। ঝড় হবের হলে এতকাল এমন ধূলা ওড়ে না।
কথাটা আকাশেক শুনায়ে দেন। ছিদাম বললো।
কিন্তু এর কিছুদিন পরে এক বিকেলে ধুলো থেকে নাকমুখ বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে ছিদাম বুথেডাঙা থেকে দ্রুতপদে ফিরে আসছিলো। সে ভাবছিলো : এরশাদ তার জমায়েতের ব্যাপারে তাহলে সান্যালমশাইয়ের হুকুমে কাজ করেছে। যে কাজটা দুদিন পরে হলেও চলতে পারে সেটাকে এখনি করা দরকার বলে চোখের সম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে।
কে একজন তার পাশ থেকে বললো, হাঁটো যে?
কেন, দৌড়াবো? ভয় কী?
আকাশ দেখছো?
ছিদাম আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে গেলো। পড়ন্তবেলায় আকাশ চিরদিনই অভিনব মূর্তি ধারণ করে কিন্তু বুজ কালোয় মেশানো এমন রং কদাচিৎ দেখা যায়। শুধু তাই নয়, মনে হচ্ছে আকাশেমন্থন হচ্ছে। এতদিন ধরে আকাশ যে ধুলো সংগ্রহ করেছিলো সেগুলি যেন পদ্মার বুকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। গোঁ-গোঁ করে একটা শব্দ আগেও হচ্ছিলো। তখন ছিদাম সেটা গ্রাহ্য করেনি। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখার উপায় নেই। একটা ধুলোর কাপটা এসে ছিদামকে যেন ধাক্কা মেরে তাড়িয়ে দিলো।
ছিদাম শব্দটা সহসা শুনতে পেয়েছিলো। হুড়মুড় দুমদাম প্রভৃতি অনুকার অব্যয় দিয়ে সে শব্দটাকে ধরা যায় না। মনে হলো, একসঙ্গে পৃথিবীর যত ঘরদোর সব ভেঙে পড়লো। খুব কাছেই কার বাড়ির খড়ের চালের একটা মস্ত বড়ো অংশ উড়ে গিয়ে একটা বড়ো আমগাছে লাগলো। আমগাছটার মোটা একটা ডাল ভেঙে পড়লো। ছিদাম দাঁড়িয়ে পড়লো। সম্মুখে সান্যালমশাইয়ের বাগান, প্রাচীন গাছে পরিপূর্ণ। একটা ডাল ভেঙে পড়লে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সপাৎকরে কে যেন তার বাঁ হাতের উপরে চাবুক মারলো। আঘাতটা এমন যে সে আর্তনাদ করলেই স্বাভাবিক হতো। ছিদাম দেখলো একটা আমের পল্লব এসে পড়েছে তার গায়ে। তরঙ্গের উপরে তরঙ্গে শোঁ-শোঁ শব্দটা ভেসে আসছে। চোখে কিছু দেখা যায় না। আন্দাজে সান্যালবাগানের পাশ দিয়ে গ্রামে যাওয়ার রাস্তা ধরে ছুটলো সে, কিন্তু কয়েক পা গিয়েই থামলো। সে পথের দুপাশেবাঁশঝাড়। এখন সে পথে মোটা মোটা বাঁশগুলি ঝট্রর মতো মাটিতে লুটোপুটি করছে। যাওয়া মানে প্রথম আঘাতেই মৃত্যু। ছিদাম নিজের পাড়ায় যাওয়ার ঘোরাপথটা ধরলো। চড়বড় করে শব্দ হচ্ছিলো। এবার কড়কড় শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ফেটে ফেটে তার দাহটাও প্রকাশ পেতে লাগলো।
বৃষ্টি-শিলা। বাতাসের জোর কমেছে। শিলাগুলি গায়ে পড়ে ব্যথা লাগছে কিন্তু তবু প্রাণে আশ্বাস এলো। জলের এই তোড় ঠেলে বাতাস এগোতে পারবে না।
পথ পিছল হয়ে গেছে। দু-একবার পড়ে গিয়ে কাপড়চোপড় ও গায়ে কাদা মেখে গেলো ছিদামের। ইচ্ছা করলে সে এখন পাশের কোনো বাড়িতে দাঁড়াতে পারতো কিন্তু এতক্ষণ ঝড়ের নিশ্বাস নিয়ে তার প্রাণেও দুর্দম্য পুলকের নেশা লেগেছে।
বাড়িতে পৌঁছে বারান্দার উপরে উঠে সে দেখলো পদ্ম একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জলের ঝাঁপটায় তার সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে। ছিদাম তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দু হাত বাড়িয়ে সে ছিদামকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। তার কান্নাটাও প্রকাশ পেলো।
বাব্বা, কী ঝড়!
হয়, রান্নাঘরের চাল উড়ে গেছে।
বাবা গেছে কতি?
মুঙ্লাদের বাড়ি।
তুমি কাঁদো কে?
কোথায় কাঁদি? পদ্ম চোখ মোছার চেষ্টাও করলো না।
ভাদ্রের শেষে এই আশ্চিমুখো ঝড় চলে গেলো একখণ্ড বর্ষা রেখে দিয়ে। আউসের ফলন্ত শীষের ধুলো ধুয়ে দিয়ে স্নান মানুষগুলিকে ভিজিয়ে দিয়ে ঢু মারতে মারতে আমনের দলে জমিগুলিতে এক-আধ হাত পরিমাণ জল দাঁড়িয়ে গেলো-পদ্মরঙের জল।
পরদিন সকালে ছিদাম এরশাদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। কাত-হয়ে-পড়া চালের তলা থেকে এরশাদের একমুখ দাড়ি আর একগাল হাসি দেখা দিলো।
কেমন এরশাদদাদা?
আগায়ে দ্যাখো জসিমুদ্দিন আর মুকুন্দর কাজিয়া কতদূর। জসিম কয়–আমার বেড়া ফিরায়ে দেও, মুকুন্দ কয়–তোমার বেড়া আমার ঘরের চাল ভাঙছে, তার খেসারত কে দেয়?
