মানুষের অদ্ভুত আচরণগুলি লক্ষণীয় হয়ে উঠলো। সাধারণত মানুষ একা একা ভয় পায়, দলে থাকলে নির্ভয় হতে পারে। কিন্তু বিপরীতটাই ঘটতে লাগলো। একটি হিন্দুর সঙ্গে পথে একটি মুসলমানের দেখা হলে আলাপ না জমলেও তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করে। কিন্তু পাঁচজন হিন্দুর সঙ্গে পাঁচজন মুসলমানের দেখা হলে সকলেই শঙ্কিত হয়ে ওঠে, হিংস্রতাও জেগে ওঠে মনের মধ্যে। খেতে গেলে পাছে একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এইজন্যই যেন মাঠে যাচ্ছে না চাষীরা। হাট বসছে না। মানুষের মনের সঙ্গে সমপর্যায়ে আসবার জন্য বছরের এ সময়টাও যেন রুক্ষ হয়ে উঠলো। আবার যেন একটি মহা অমঙ্গল গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। গাছের পাতাগুলোর উপরেও ধুলোর একটা স্তর জমেছে, যেমন মলিন হয়েছে মানুষের মুখ।
সান্যালমশাই দীর্ঘ সন্ধ্যাগুলি তার প্রাসাদের ছাদে পায়চারি করে কাটাতে লাগলেন। একটিমাত্র চিন্তা তার,কলকাতার রাজনীতির এই প্লাবন যা তার গ্রামকে বেষ্টনকরে থৈথৈ করছে। সেটা যদি তার গ্রামের উপরে ভেঙে পড়ে কী করে তিনি সে ধ্বংসকে কাটিয়ে উঠবেন।কখনো তার মনে হয় রাষ্ট্রশক্তি যদি অসতের সহায়তা করে তবে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত। তার অস্থির পদচারণায় অলিন্দগুলিতে প্রতিধ্বনি ওঠে। কিন্তু প্রায় পরমুহূর্তে মনে পড়ে যায় প্রাচীন ভূঁইয়াদের মতোনবাবী আক্রমণ প্রতিহত করার সাধ্যায়ত্তনয়। মনের মধ্যে খুঁজতে। গিয়ে তিনি তেমন কোনো ভালোবাসার সাক্ষাৎও পান না। প্রজাদের ধর্মনিরপেক্ষ প্রীতি দিতে। গিয়ে কুণ্ঠিত হন তিনি। তার অনুভব হয়, তেমন কেউ কি নেই যে অপরিমিত শক্তি, অনির্বাণ ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে রাজনীতির এই অন্ধ ভবিষ্যতে নিজেকে পরাজিত মনে হয় এবং তা হতে হতে তার সমগ্র চেতনা কঠিন হয়ে ওঠে। প্রাচীন ভূঁইয়াদের মতো প্রতিজ্ঞা করেন শেষবারের মতো এই দুর্গেই দাঁড়াতে হবে–যা হয় হোক। যা হয় তোক।
.
পাঁচদিন পরে এরফান শহর থেকে ফিরলো। এ কয়দিনের পরিশ্রম, উল্কণ্ঠা ও শোকে সে যেন অন্য আর এক মানুষ হয়ে গেছে। আলেফের অবস্থাও তার চাইতে ভালো নয়। খবর পেয়ে সে যখন ঘর থেকে বেরুলো তার চোখ দুটি লাল টকটক করছে, সে চোখের উভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে জ্বরবিকারের কথা মনে পড়ে যায়। ভাইকে একা একা ফিরতে দেখে ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইলো না। এরফান এতক্ষণ তার শোককে ঠেকিয়ে রেখেছিলো। হু হু করে কেঁদে সে সিঁড়ির উপরে বসে পড়লো। বড়োভাই, তাক আনতে পারি নাই, তাক আনতে পারি নাই বড়োভাই। আলেফ কী বললো বোঝা গেলো না। তার চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো।
কিন্তু সহসা আলেফর তীব্র চিৎকারে সম্বিৎ পেয়ে এরফানকেও চোখ তুলে চাইতে হলো। সে দেখতে পেলো তীব্ৰধার একটি বল্লম হাতে করে আলেফ চিৎকার করতে করতে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
বড়োভাই, বড়োভাই।
ছুটতে ছুটতে গিয়ে মসজিদটার কাছে একটা গাছের শিকড়ে পা বেধে পড়ে গেলো আলেফ। এরফান যখন তার কাছে গিয়ে পৌঁছলো তখন আলেফের কশ বেয়ে ফেনা গড়াচ্ছে।
পাড়ার লোকরা ভিড় করে এসেছিলো। আলেফকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার সেবায় আলেফের স্ত্রীকে এবং নিজের স্ত্রীদের বসিয়ে দিয়ে এরফান বাইরে এসে দাঁড়ালো। এতক্ষণে সে যেন তার স্বরূপ ফিরে পেয়েছে। যেন কিছু হয়নি এমনি স্বরে সে বললো, একজন চিকন্দিতে গিরীশ ডাক্তারেক খবর দিবা? তা যদি সাহস না পাও সান্যালমশাইয়ের কাছে যাও,
আমার মিনতি কয়ো, কয়ো ডাক্তারেক যেন পাঠায়ে দেন।
একটি ছেলে সাহসে ভর করে রওনা দিলো।
কে তুমি?
জে, ইজু। বুধেডাঙার ইয়াজ সান্দার।
যাও বাবা, যাও। আল্লা তোমার উপর খুশি হবি।
ইয়াজ চলে গেলে সমবেত গ্রামবাসীর দিকে ফিরে এরফান বললো, আমার ছাওয়াল আমার বড়ো-ভাইয়ের ছাওয়াল মারামারি করে যায় নাই। সে ডাক্তার হবের গিছিলো তাই রাস্তার থিকে জখমি-লোক কুড়ায়ে আনবের গিয়ে মারা গেছে। সে যে—
এরফান এই পর্যন্ত বলে আবার হাতের আড়ালে মুখ ঢেকে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
.
বহুদর্শী হাজিসাহেব যা বলেছিলেন ব্যাপারটা তেমনি হলো। কলকাতার দাহ শেষ হতেই এদিকেও আগুন নিবে এলো।
ইতিমধ্যে বিলমহলের সর্দার এরশাদ একদিন গিয়ে আল মাহমুদকে বলে এসেছে, মোভাই, শহরের ভদ্রলোক শহরে যাও। এখানে বেশি কথা কয়ো না। ভদ্রলোকের সঙ্গে মারপিঠ করা গা।
তোমরা কী?
যা-ই হই। জমিদারের হুকুম হলে হিন্দু কাটবের পারি, মোসলমানও কাটবের পারি। আমার নাম এরশাদ, তা মনে রাখো।
.
প্রকৃতির দিকে চেয়ে রুক্ষতাটাই চোখে পড়ে। গ্রামের সীমান্তে দাঁড়িয়ে বুধেভাঙার দিকে পদ্মার তীরভুক্ত জমিগুলির দিকে চেয়ে দেখলে কষ্ট হয়। ধুলোর ঝড় উঠে পড়ে দুপুরবেলা। বিকেলের দিকে মনে হয় তামাটে রঙের আকাশে সেই ধুলো পাক খেয়ে খেয়ে উঠে যাচ্ছে। মনে হবে, খুব দূরে আকাশ ও মাটির মধ্যে একটা বাতাসের সিঁড়ি বেয়ে পৃথিবীর সব সরসতা ধুলোর আকারে সরসর করে উঠে যাচ্ছে। খেতের আউস ধুলোয় ঢাকা। আমনের জমি ঘাসে ডুবে যাচ্ছে। ফসল কোনোদিন হবে এমন ভরসাও নেই।
একদিন বিকেলে ছিদাম সাহস করে বুধেডাঙায় গিয়েছিলো। বিলমহলের এরশাদ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। পাঁচ-ছয়জন বাছাবাছা লোকের পরামর্শ হবে।
