এ কি রেটরিকের বেশি কিছু?
নদীর অকল্যাণ-গতিকে আটকাতে কখনো কখনো প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়।
ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত রুখতে হবে? কিন্তু তুমি কি শুধু একপক্ষের কথাই চিন্তা করছে না? আমার প্রজাদের মধ্যে উভয় পক্ষই আছে।
সদানন্দ লজ্জিত হয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলো।
.
একদিন আল মাহমুদকে দেখা গেলো। সে গ্রামের দিকে আসতে আসতে হায় হায় করতে লাগলো। যেন সে কোনো নতুন এক কারবালার জন্য শোক করছে। পথের লোকরা বিস্মিত হলো। ক্রমশ বিস্ময় বাড়াতে বাড়াতে অবশেষে এরফান ও আলেফের বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে সে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং বুক চাপড়াতে লাগলো। তার চোখে জল নেই কিন্তু শোকের কান্নার শব্দগুলি মুখ থেকে বেরুচ্ছে। লোক জমে গেলো। এরফান অমঙ্গলের শব্দে নমাজ শেষ করতে না পেরে উঠে এলো। আলেফ জলযোগ করতে করতে ভাবছিলো, সিং-জমিদারের সীমানা-সামিল এক লপ্তের অতখানি জমি যদি রামচন্দ্র না নেয় তবে দখলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলে হয়তো পত্তনি বন্দোবস্তেও পাওয়া যেতে পারে। সেও উঠে এলো।
কী হইছে, মহরম কেন্?
আর কী হবি, কলকেতায় শেষ।
কী শেষ হবি কলকেতায়, হলেও তোমার কী?
একজন মোসলমান বাঁচে নাই। কে, গজব?
না। হিঁদু আর শিখে মারে শেষ করছে।
কেরদানি রাখো। তুমি যে কও সে-দেশে এখন মুসলমানের নবাবি।
তাইলে কি হয়? আমাদের সাদেক নাই।
কী কও, আমার সাদেক নাই? এরফান যেন মৃত্যুর আঘাতে আর্তনাদ করে উঠলো। আলেফের বাস্ফুরণ হলো না।
এরফান আবার প্রশ্ন করলো, কী কলি, সাদেক নাই?
এরফান মাটিতে বসে পড়লো। তার প্রৌঢ়তার মর্যাদা ধুলিতে লুটিয়ে দিয়ে সে মাথা চাপড়ে আঁ-আঁ করে কাঁদতে লাগলো। হায় খোদা, হায় রহমান, হায় খোদা।
খানিকটা কেঁদে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এরফান বললো, বড়োভাই, তুমি কাঁদো না। দুই ভাইয়ের ওই এক ছাওয়াল খোদা নিছে। বড়োভাই, এমন কোন গুনাহ্ করছি আমি যার জন্যি খোদা এমন শাস্তি দিবি? আমি এই কাপড়েই কলকেতা যাবো। সেই আজব শহর শয়তানের আড্ডায় আমি খোঁজবো। ছাওয়ালের খবর আনবো। ছাওয়াল আমার বাঁচে আছে। চেরকাল বাঁচার সে-ছাওয়াল।
এরফান খকরে আল মাহমুদের হাত চেপে ধরলোক সত্যিকথা। গাঁয়ের লোক খেপাতে আসছিস? দিঘায় এই সব আজকাল হতিছে, তাই এখানে করবের আসছিস? ক। তোর হাত আমি মুচড়ায়ে ভাঙে দিবো। ক।
আল মাহমুদ এতক্ষণ একটা মৃদু একটানা শোকের শব্দ করে যাচ্ছিলো। ভয় পেয়ে সেটা বন্ধ করে সে যা বললো তার সারমর্ম এই : দিঘার একজন দোকানদার জুতো কিনতে কলকেতা শহরে গিয়েছিলো। যে হোটেলে সে ওঠে সেই হোটেল দাঙ্গায় পুড়ে গেছে। তখন প্রাণভয়ে সে এক মেসে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। সেখানে কথায় কথায় এ জেলার কয়েকটি ছেলের পরিচয় সে পায়, তার মধ্যে সাদেক সেখও একজন। সে একদিন সন্ধ্যায় তার কলেজে গিয়ে আর ফেরেনি।
সে হয়তো অন্য জায়গায় আছে।
তা হবের পারে। আল মাহমুদ এ সম্ভাবনাকে স্বীকার করতে বাধ্য হলো।
এরফান বললো, বড়োভাই, এখন তাড়াতাড়ি হাঁটে গেলে এগারোটার ট্রেন পাবো দিঘায়। এক কথা কয়ে যাই, আল মাহমুদের উপরে চোখ রাখবা আর কোনো অধর্ম করবা না। বিপদে পড়ে যাতেছি, এখন খোদাকে নারাজ করবা না। মনে রাখো, মজিদে না আলেও আদমজাদমাত্রই খোদার।
এরফান বাড়িতে ঢুকে কিছু টাকা নিয়ে দিঘার দিকে পড়িমরি করে ছুটলো।
আল মাহমুদের উদ্দেশ্য আংশিক সিদ্ধ হলো। কাব্যের সততা রক্ষা করে বলা যায় না খবরটা কতটুকু জেনে এসে সে এ গ্রামে হাহাকারটা ছড়িয়ে দিলো। তার চরিত্র যতটুকু উদঘাটিত তাতে কোনো কিছু অনিবার্যভাবে গ্রহণ করা যায় না। এমনও হতে পারে জুতোওয়ালা তাকে মিথ্যা করে বানিয়ে গল্পটা বলেছিলো। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে একটি বদ্ধমূল হীনমন্যতা থেকে উপজাত বিদ্বেষ তার দুঃখবোধটাকে প্রচারের মতো শোকে রূপান্তরিত করেছিলো।
সে যা-ই হোক আলেফ নিরুদ্ধ কণ্ঠে ‘সাদেক সাদেক’ বলতে বলতে ঘরে গিয়ে ঢুকলো। তার স্ত্রী আগেই খবর পেয়ে বিছানায় মাথা রেখে ফুলে ফুলে কাঁদছিলো। কথাটা চরনকাশির সর্বত্র রাষ্ট্র হলো এইভাবে, আলেফ সেখের ছেলেকে হিন্দু আর শিখরা একা পেয়ে হত্যা করেছে। বাকিটুকু করলো আল মাহমুদ।
.
একদিন হাজিসাহেব গোরুগাড়ি করে সান্যালমশাইয়ের কাছারিতে উপস্থিত হলেন।
সান্যালকর্তা, কও, তুমি নাকি সব মসজিদ ভাঙো? সব মুসলমান কাটে পদ্মায় ভাসাও? কেন, তা করো কেন্? কাটো আগে আমার এই মাথা। দেখি কত বড়ো বীর হইছে আমার সেই হাতে-ধরে-শিখানো ছাওয়াল।
সান্যালমশাই স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
এখন কী করবা? হাজিসাহেব এগিয়ে গিয়ে সান্যালমশাইকে স্পর্শ করলেন।
সান্যালমশাই বললেন, মুশকিল এই, আপনার আর লাঠি ধরার শক্তি নেই।তা থাকলে আমি কলকাতার নবাবদের পরোয়া করতাম না। আপনি কয়েকটি দিন গোরুগাড়ি করে গ্রামের পথে পথে ঘুরে বেড়ান।
আর কী করবো?
আল মাহমুদ বলে এক ছোকরা এসেছে এ গ্রামে।
তা আসুক। শয়তান কাটে লাভ নাই, আরও শয়তান জন্মায়।
এরপরে অত্যন্ত ধীর ভঙ্গিতে হাজিসাহেব পরামর্শ দিলেন, শহরের আগুন এ। সেখানে তাপ কলি এখানে নিবে যাবি। কেবল বুদ্ধি করে এড়ায়ে এড়ায়ে যাও। তোমাক আর কী কবো, বুদ্ধি ঠাণ্ডা রাখো। তোমার হিন্দু মুসলমান প্রজা বাঁচবি। তুমি কি একা পারা কলকাতার নবাবেক জব্দ করবের? আমি একেবারে অথব্ব।
