সান্যালকর্তা বাগান ঘেঁষে বসাইছেতাই বুঝি নিজেক মনে করছে খুব লায়েক? জসিমুদ্দিন বললো।
সেই হিংসায় জ্বলে মরো, মোষের মতো কাদা ঘোলায়ে তোলো! মুকুন্দ উত্তর দিলো।
সামাল।
খবরদার।
চোপ।
চপরাও।
গদাগদ। দমাদম।
চারিদিক থেকে লোক ছুটে এলো। নায়েবমশাইয়ের কাছে খবর গেলো। এই বিশেষ কলহটায় একটু বৈশিষ্ট্য আনলো রামচন্দ্র। সে গড়িমসি করেও জমিদারের কথা রাখার জন্য জমি দেখতে বেরিয়েছিলো। লোকজনকে ছুটতে দেখে সেই এগিয়ে এসেছিলো। সে বললো, মনে কয় দুজনেক পদ্মার জলে চাপে ধরে মাথা ঠাণ্ডা করে দেই।
একজন বললো, পারো তা?
কওয়া যায় না। পারলেও পারবের পারি।
পিছন থেকে নায়েবমশাইয়ের গলা শোনা গেলো।’কে, রামচন্দ্রনা? ধরো, তাই ধরো।পদ্মায় না নিয়ে যাও, কাছারিতে চলল। কর্তা বাগানে দাঁড়িয়ে ওদের মারামারি দেখে গেছেন।
কথাটা মন্ত্রের মতো কাজ করলো।মুকুন্দ ও জসিমুদ্দিন পরস্পরকে ছেড়ে দিয়ে মাটি ঝাড়তে লাগলো নিজেদের গা থেকে।
কৈবর্তদের অগ্নিকুমার বললো, ছাওয়ালডা নতুন বিয়ে করে মনে করছে পিরথিমি ওর হাতের তলায়।
বিলমহলের এরশাদ বললো, তাইলে তো আমাগের জছুরও তো সেই ব্যারাম। শোনোনাই, লাবেনের মিয়ের সঙ্গে ওর কথা চলতিছে?
রামচন্দ্র গম্ভীর মুখে বললো, তেঁতুলগোলা জলে নিশা ছাড়ে শুনছি।
.
কিন্তু শহরের কাজিয়া অন্যরকম। সেখানে অনেক মিহির সান্যাল আছে এবং অনেকগুলি আলেফ সেখ। নানা দিক্দেশ থেকে মিহির সান্যালরা এবং আলেফ সেখরা সেখানে জমায়েত হয়েছে।
কিছুদিন যাবৎ চিকন্দিতে সান্যালবাড়িতে রেডিও মারফত খবর আসছিলো, নোয়াখালিনামে। এক জেলায় বহু লোকের প্রাণনাশকারী দাঙ্গা শুরু হয়ে ক্রমশ সেটা বিস্তৃতিলাভ করেছে।
কথাটা রূপুর মুখে প্রথম শুনে সান্যালমশাই বললেন, এ খবর যেন গ্রামে না রটে, বাড়ির দাস-দাসীরাও যেন না জানে।
কিন্তু দিঘা শহর হিসাবে কলকাতার মতো না হলেও, শহরের জাত্যগুণ কিছু কিছু ছিলো তার। সেখানে রেলের কলোনি থেকে স্ত্রীলোক ও শিশুরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে।কলোনির ভিতরেও কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কোয়ার্টার্স বদলে বদলে কলোনিটিকে সাম্প্রদায়িক বিভাগে বিভক্ত করছে অধিবাসীরা। সেখান থেকে খবর আসছে লোকের মুখে মুখে।
একদিন কাদোয়া থেকে মনসা এলো। হাসিখুশি মুখে অনসূয়ার সঙ্গে খানিকটা কথা বলে সে সদানন্দর খোঁজ করলো, খুঁজে বার করলো। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপও হলো। আলাপের মূল কথাই হচ্ছে দু-তিন হাজার টাকার আতসবাজি চাই। শহরের যেসব বাজিকর আছে তাদের দিয়ে তেমন ভালো বাজি তৈরি হয় না আজকাল, কাজেই বিপিনকে চাই, সেই নুলো বিপিন মুখুজ্যেকে।
বিপিন মুখুজ্যের নাম শুনে সদানন্দর মুখ গম্ভীর হয়েছিলো। তখন দরজা বন্ধ করে প্রায় পনেরো মিনিট কাল তারা দুজনে সলা-পরামর্শ করলো। শহর থেকে বাজিকরদের আনানো হবে স্থির হলো। এবং এও স্থির হলে বিপিন মুখুজ্যেকে যদি না পাওয়াই যায় সদানন্দ বিপিনের দলের আর কাউকে আনবে এবং সে নিজেও বাজিকরদের প্রয়োজন মতো উপদেশ দেবে।
এরপর মনসা আবার অনসূয়ার কাছে গিয়ে বসেছিলো যেমনভাবে একটি অত্যন্ত আদরিণী মেয়েই বসতে পারে।
কথায় কথায় মনসা প্রস্তাব করলো, তাদের গ্রামে কিছু কিছু স্ত্রীলোক ও শিশুকে সান্যালবাড়িতে কিছুকালের জন্য রাখা যায় কিনা।
তুমি তাদের আনিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করো, মণি। অনসূয়া বললেন।
তাহলে আমি এখন যাই। দরকার হলেই তাদের পাঠিয়ে দেবো।
দাঁড়াও। তোমার জ্যাঠামশাইকে বলি। বলে অনসূয়া উঠে দাঁড়ালেন।
না, না, সেটা ভালো হবে না। বলে সিঁড়ি দিয়ে মনসা নামতে লাগলো।
সঙ্গে তোক দিচ্ছি, দাঁড়াও।
লোক আছে সঙ্গে। বলতে বলতে মনসা উঠোন পার হয়ে গেলো।
অনসূয়া ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন, মনসার চার-বেহারার পাল্কিটার দাঁড়ায় আটজন কাঁধ দিয়েছে। সেটা পড়িমরি করে ছুটে চললো।
সান্যালমশাই অন্দরে এসে বললেন, মণি এসেছিলো যেন?
চলে গেছে। বলে সে কেন এসেছিলো, কি তার প্রস্তাব তা বর্ণনা করলেন অনসূয়া।
সান্যালমশাই ভ্রুকুটি করে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
পরমুহূর্তে তিনি আসনে বসলেন আবার, হেসে বললেন, তামাক দিয়ো।
তামাকে মন দিয়ে সান্যালমশাই সদানন্দকে ডেকে পাঠালেন।
মণির খবর এই, তাদের গ্রাম নিরাপদ নয়। কী করা যায়?
নিরাপদ না হলেই বা ক্ষতি কী? সদানন্দ বললো।
তার মানে?
মাৎস্যন্যায়ের সময়ে নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। সে-অবস্থায় নিরাপত্তা মানে অপরপক্ষকে আঘাত দেওয়ার ক্ষমতা। মণি ফিরে গিয়ে খুব ভালো করেছে। যদি তেমন হয় তাহলে তাকে রক্ষা করার জন্যে দু-একজন মনুষ্যত্ব দেখাবে।নতুবা মাৎস্যন্যায়ের মধ্যে একমাত্র যা দ্রষ্টব্য সেটারই অভাব হবে। মানুষ রাক্ষস তো হয়েছেই, জন্তুও হবে।
সান্যালমশাই বললেন, তুমি মনে মনে একটা বক্তৃতা ঠিক করে রেখেছিলে বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমার মতিগতি বুঝতে পারছি না।
খুব শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারি।
তুমি কি একটি চিতোরগড় কল্পনা করছো?
তাছাড়া অবস্থা যদি খারাপের দিকে যায় আমি সকলকে বুঝিয়ে দেবো:বাঁশের লাঠি সারা গ্রামে অজস্র আছে। সেন্সস রিপোর্ট এ ব্যাপারে অর্থহীন। মনের জোর নিয়ে রুখতে পারলে অপরপক্ষ একসময়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, সংখ্যায় ভারি হলেও। মরতে ভয় পেলে চলবে না।
