হয়তো তাই, বলে অনসূয়া ভাবলেন, এই পরিবারের বিশিষ্ট প্রথাগুলিকে গ্রহণ এবং পরিবর্জনের মাধ্যমেই তার নিজের বর্তমান চরিত্র গড়ে উঠেছে। তারপর থেকে কি তিনি একটি মূল্যবান কিন্ত কঠিন পাথরের মতো আলোক প্রতিফলন করছেন? কিন্তু একথা মনে পড়ছে কেন সান্যালমশাইয়ের!
অনসূয়া চলে যাওয়ার কিছুপরে রূপু এলো একটা বইয়ের খোঁজে। সে যখন বই নিয়ে চলে যাচ্ছে সান্যালমশাই বললেন, হ্যাঁরে, রূপু, তোর বউদি গানবাজনা ভালোবাসেন না?
কথাটা আকস্মিক, কোনোদিন রূপুর মনে জাগেনি। সে বললো, জানি না।
সান্যালমশাই বললেন, হয়তো ভালোবাসেন কিন্তু এখানে হাতের কাছে কিছু পাচ্ছেন না। তুই খোঁজ নিয়ে যা প্রয়োজন সদানন্দকে বলে আনিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করিস।
রূপু চলে গেলে সান্যালমশাইয়ের মনে হলো সুমিতির ব্যাপারটায় নতুনত্ব আছে। একে যদি কেউ সখ করে বিপ্লব বলতে চায় তা বলতে পারে। কিন্তু সেও হয়তো নিজের কিছু বর্জন করতে চাইবে যেমন অনসূয়া গানকে করেছিলেন। ভেবে দেখতে গেলে অনসূয়াও বিপ্লব এনেছিলেন। তার নিজস্ব ধর্মমতের বলিষ্ঠতা প্রচারিত হওয়ার আগে তার স্বকীয়তা প্রচারিত হয়েছিলো। কালীপূজোয় বলির ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছিলো তার কান্নায়। এমনি কিছু সুমিতির ক্ষেত্রেও হবে। একটুপরে কথাটা তার মনে হলো : এটা লক্ষণীয়, ধর্মমতকে নিয়েই প্রথম নিজেদের স্বকীয়তা। প্রকাশ করেছে দুজনেই। বিবাহটা ধর্ম বৈকি।
.
নিজের বয়সের কথা প্রকাশ্যে চিন্তা করতেও অনসূয়ার লজ্জা করে। কিন্তু কোনো কোনো দিন মানুষ অনভ্যস্ত কাজ করতে আরম্ভ করে।
ড্রেসিং টেবলের বড়ো আয়নাটার সম্মুখে দাঁড়িয়ে চিরুনির কয়েকটি টান দিতে না দিতে কপালের উপরে কয়েক পাক কোঁকড়ানো চুল আজ থেকে বিশ বছর আগে যেমন প্রতি সন্ধ্যাতেই থাকতো তেমনি করে দুলে উঠলো। পরনের যে শাড়িটা কাজকর্ম শেষ করে ঘরে এসে পরেছিলেন সেটাও তিনি পাল্টালেন। ঘাসের চটিটা বদলে লাল মখমলের একটা চটি পছন্দ করে পরলেন।
সান্যালমশাই ঘরে ছিলেন। হাতের বইটি মুড়ে রেখে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। এসো।
অমন করে চেয়ে থেকো না।
‘অনেকদিন পরে দেখছি বলেই বোধহয় এমন লাগছে। সান্যালমশাই অনসূয়ার হাত দুখানি নিজের হাতে তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ পরে বললেন, এই হৃষ্টতাবোধই আমাকে নতুন নতুন কাজে উৎসাহ দেয়।
অনসূয়া বললেন, যদি কিছু পেয়ে থাকো সে তোমার আকর্ষণের শক্তিতেই পেয়েছে।
রাত্রি যখন আরো গম্ভীর হলো অনসূয়া বললেন, এমনি যদি কখনো কখনো আসি, বলল নির্লজ্জ বলবে না?
কিছু বলার মতো ভাষা থাকে না। সান্যালমশাই বললেন।
ভোররাতের কিছু আগে নিজের ঘরে ফিরে এসে অনসূয়া বিছানায় গা রাখতেই ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসতে লাগলো। ততক্ষণে তার নিজের বিছানা খোলা জানলার বাতাস পেয়ে পেয়ে শীতল হয়েছিলো।
পরদিন সকালে দাসী এসে ডাকলো, বেলা হয়েছে, মা, উঠুন।
সান্যালমশাই তাকে নিলাজ না-ও বলতে পারেন, কিন্তু যা শুধু এই রাত্রিটির বৈশিষ্ট্য সেটা যেন সত্যিকারের চাইতে গভীর এবং বিস্তৃত বলে সমস্ত দিন মনে হতে থাকলো অনসূয়ার। একথাও দু-একবার স্মরণে এলো, হাতের চুড়িগুলি খুলে একজোড়া রতনচূড় পরেছিলেন তিনি সেতার শুরু করে।
ওদের জীবন যেনতুন খাতে প্রবাহিত হতে চায় তা হোক, তা বলে মস্তিষ্কের সাহায্যে চলতে গিয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছি বলে, সঙ্গহীন হয়েছি বলে যে আশঙ্কা হয়েছিলো তার, সান্যালমশাইয়ের নিঃসঙ্গতার ক্লান্তিতে যেভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি, তা সবের লক্ষণ দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হাতের মুঠোয় রাখা এই সংসারের কোথাও খুঁজে পাওয়ার কথা নয়, পেলেনও না।
৩০. দাদপুরের লোকরা বুধেডাঙায়
দাদপুরের লোকরা বুধেডাঙায় বসবার জোগাড় করে নিয়েছে। তারা সান্যালমশাইয়ের বাগানের পাশ থেকে ক্রমে নেমে আসছে। সর্বসমেত কমবেশি পনেরো ঘর লোক হবে। তারপরই বিলমহলের আট-দশ ঘর ভালুকে চেহারার চাষী। এরকম কিংবদন্তী রটেছে, এদের গায়ে শ্যাওলা আছে।
এসব ব্যাপারে যেমন হয়, ইতিমধ্যে দু-একটা ছোটোখাটো কাজিয়া-ঝগড়াও হয়ে গেছে। জমি সুনির্দিষ্ট নয় এখনো, তবু কেউ এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে চায় না। দাদপুরের গলায় কণ্ঠি কৈবৰ্তরা আর বিলমহলের মোষের মতো কাদামাটি-মাখা মুসলমান তাঁতীরা এ বিষয়ে সমান। কাজিয়া দু-একবার লাঠির পর্যায়ে পৌঁছাবে এমন সূচনাও হয়েছিলো। কিন্তু নায়েব প্রতিবারেই এসে দাঁড়িয়ে গোলমাল মিটিয়ে দিয়েছে।
এদের ঝগড়ার সূত্রপাত অনেক সময়ে ছেলেমানুষি কথার থেকে হয়।
একদিন বিলমহলের জসিমুদ্দিন বললো, আরে রাখো রাখো। জলের ভয়ে পলাও, আবার কথাটা সে বলেছিলো ঠিক তার পাশে যে ঘর তুলছিলো তেমন একজন দাদপুরী কৈবর্তকে। তার নাম মুকুন্দ।
মুকুন্দ বললো, ভাই রে, এ বিল না। এ জলেক মান্য করা লাগে।
জসিমুদ্দিন বললো, বিল দেখছো না?
হয়, যেখানে কাদা থাকে।
কাদা? আমাদের বুঝি কাদার প্রাণী মনে করলা?
তা কবো কেন্? কাদা মাখবের ভালোবাসো।
মুখ সামলে কথা কয়ো।
কেন্? বিলের ডরে? আমরা পদ্মাপারী।
রাগের মাথায় জসিমুদ্দিন বললো, তোমার পদ্মাক ধরে বিলে ডুবায়ে রাখবের পারি।
দুইজনেই চালের উপরে বসে ঘর বাঁধছিলো। প্রায় একইসঙ্গে লাফ দিয়ে মাটিতে নামলো তারা।
