সুশিক্ষার সুযোগ এবং রেয়াজ করার অবসর থাকলে সুরুচিসম্পন্ন মনের পক্ষে একটি রাগিণীকে মূর্ত করে তোলা কঠিন নয়। বাজনা থামার পরও কিছুকাল নীরবে সেই সুঘ্রাণে তন্ময় হয়ে রইলেন দুজনে।
অনসূয়া যেন কিছু পরিমাণে লজ্জিত হলেন। তিনি বললেন, যে অন্যকে সুখী করার চেষ্টায়, বাজাতে বসেছিলো সে নিজেও সুখী হলো, এই তো বলছো তুমি?
সান্যালমশাই মধুর করে হাসলেন, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হচ্ছে মুদ্রাদোষের মতো এটা একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছে আমার সব কিছুকেই বিশ্লেষণ করে নীরস করে দেওয়ার।
অন্য কেউ নিজের সম্বন্ধে যখন বলে তখন তার বক্তব্যে সবটুকু আস্থা রাখা কঠিন। বিশেষ করে কেউ যখন আত্মদোষ বর্ণনা করে তখন ধরে নেওয়া যায় সেটা প্রকাশিত হওয়ার আগে। তার মন সেই আত্মগ্লানির কাহিনী সংশোধন করে দিয়েছে, সংসার রাজনীতি তার বক্তব্যকে সেন্সর করেছে। কিন্তু অনসূয়ার কাছে সান্যালমশাইয়ের কথা স্বতন্ত্র। এই লোকটির বৃহত্ত্বের সঙ্গে এ পরিবারের সকলেই পরিচিত কিন্তু তার ঈর্ষা, দ্বেষ, ঘৃণার কথাগুলি শুধু তিনিই জানেন। শুধু তাই নয়, দৃষ্টিভঙ্গির যে চিৎ ক্ষুদ্রতা সান্যালমশাই বুদ্ধির সাহায্যে জয় করার চেষ্টা করেন, অন্তরের যে ক্ষণ-প্রকাশিত কাপুরুষতাকে জয় করার চেষ্টা করেন ব্যবহারের দৃঢ়তা দিয়ে, সে সবই কোনো-না-কোনোসময়ে সান্যালমশাই তাঁর কাছে অকপটে ব্যক্ত করেছেন। পৃথিবীতে সবকিছু ব্যক্ত করার পরও একটি জায়গায় এসে মানুষ থেমে যায়–যে সংগুপ্ত কামনাগুলিকে জাগ্রত মন অস্বীকার করে, ভয় পায়, সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা যায় না। অনসূয়ার ধারণা, সেই অরণ্যচারী আদিম স্বপ্নের সান্যালমশাইকেও তিনি কিছু চেনেন, তাঁর সঙ্গে কোনো কোনো সময়ে সমপ্রাণও হয়েছেন। যদিও হঠাৎ একসময়ে নতুন কোনো আত্মপ্রকাশ করা সান্যালমশাইয়ের পক্ষে অসম্ভব বা অভূতপূর্ব নয়।
অনসূয়া বললেন, এই প্রবণতাকে তুমি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে?
সান্যালমশাই দাবা খেলেন না অর্থাৎ এ বিষয়ে তার নেশা নেই। কিন্তু সেবার মন্মথ রায় এলে তার আপত্তি টেকেনি। সান্যালমশাইয়ের সেই ভঙ্গিটি যা দাবা খেলার সময়ে হয়েছিলো সেটা, সুতরাং, দুর্লভ। অনসূয়ার মনে হলো সান্যালমশাইয়ের এই অত্যন্ত শীতল মনোভঙ্গি যেন তেমনি কিছু।
তাওয়াদার তামাক পুড়ছিলো। সেদিকে মন দিয়ে সান্যালমশাই বললেন, তোমার বিয়ের আগে এ বাড়িটা কী রকম ছিলো এই যেন মনে পড়ছে আমার। বাড়ি গমগম করা বলতে যা বোঝায় সেটা তখনো খুব ছিলো না। বাড়ির পিছন দিকের অংশে তখন অনেক আত্মীয় বাস করতেন, এখনো করেন। কিন্তু তখনকার সেই আশ্রিতদের মধ্যে বলিষ্ঠ কর্মক্ষম পুরুষও ছিলো। এখন বোধহয় মানুষের আত্মসম্মান-জ্ঞান এ ধরনের জীবনকে স্বীকার করে না। নাকি, হিরণ জ্যাঠার আপিসের খরচও সেসময়ে কাছারি থেকে ব্যবস্থা করা হতো, তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আজকাল নেই বলে তাদের মতো লোকরা আর আশ্রয় চান না।
অনসূয়ার মনে পড়লো এ বাড়িতে এসে তিনি প্রথম দিকে যাদের পেয়েছিলেন সেই সব আত্মীয়াদের মধ্যে দু-একজন তার অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিলো। এখন তারা নেই। যারা আছে তারা সুমিতির সখ্যলাভ করেনি। অনসূয়া স্থির করলেন সান্যালমশাই বোধহয় এমন নিঃসঙ্গতার অনুভব থেকেই সেকালের কথা বলছেন। রায়দের যারা অবশিষ্ট আছে গ্রামে কিংবা সান্যাল বংশেরই যারা আছে তাদের কেউই সান্যালমশাইয়ের দোসর নয়।
সান্যালমশাই ইদানীং যেন নতুন সঙ্গী পেয়ে সোৎসাহে পথ চলার ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার বাড়িঘর সাজাবার উৎসাহে অন্তত তাই মনে হয়। অনসূয়া এখন ভাবলেন সেই অগ্রগতি কি তবে ত্বক-গভীর?
কয়েকদিন আগে সদানন্দ কোথাও যাচ্ছিলো, অনসূয়ার কাছে নিয়মতান্ত্রিক অনুমতি নিতে এসেছিলো।
অনসূয়া জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছো?
বিলমহলের জন্যে আর একটা মোটরপাম্প আনতে।
সেই জল ঘেঁচে জমি দখলের ব্যাপার বুঝি?
হ্যাঁ। আজকাল জলকরের মুনাফা কিছু নেই। বিলের প্রায় আধখানা জলাজমি।
সদানন্দ চলে গেলে অনসূয়া তার এক পুরনো চিন্তাধারাকে অবলম্বন করেছিলেন : সুকৃতির সম্বন্ধে এ বাড়ির সকলেরই যে একটা আন্তরিক দুঃখবোধ আছে সেটাই হয়তো নৃপনারায়ণকে সুমিতির দিকে আকর্ষণ করেছিলো। পুরুষদের বেলায় এমন হয়। কেউ কেউ কোনো বিধবার দুঃখে বিচলিত হয়ে তাকে বিবাহও করেছে। সান্যালমশাইয়ের কর্মকাণ্ডের সূচনায় রয়েছে পুকুরঘাটের পুনঃপ্রাণপ্রতিষ্ঠা, যেখানে একদিন সুকৃতিকে হারাতে হয়েছিলো। সান্যালমশাইয়ের শান্তি অনুসন্ধানের পিছনে তাহলে ছিলো উদাস বিষণ্ণতা। আর তাহলে ভালোই হয়েছে সুকৃতির পরে সুমিতির আসা। কিন্তু এখন সান্যালমশাইয়ের বসবার ভঙ্গিটিতে নিঃসঙ্গতার ছাপই দেখতে পেলেন অনসূয়া।
তিনি চিন্তা করলেন, তাহলে এসবই কি আন্তরিক নয়?
সৃজনধর্মীদের স্বভাবই এই, কোনো একটি বিষয়কে উপলক্ষ্য করে তারা উপলক্ষ্যকে ছাড়িয়ে যায়। নিজের অন্তরগত সেই প্রেরণাটি যতক্ষণ না সার্থক হয়ে উঠছে ততক্ষণই তারা কর্মব্যস্ততায় উজ্জ্বল। কিন্তু তারপর?
সান্যালমশাই নিজের নিঃসঙ্গতার কথা চিন্তা করছিলেন না। অনসূয়া আসবার আগে এবং তার পরের অবস্থাটা যেন তুলনা করছিলেন। তিনি বললেন, তুমিও, অনসূয়া, সুকৃতি-সুমিতির মতো শহর থেকে এসেছিলে এই পাট-ধানের হিন্টারল্যান্ডে। এই কথাটাকে বাংলায় ভর’ বলা যেতে পারে। তুমি সঙ্গে করে এনেছিলে সংগীত। সেটা একটা বিদ্রোহ। কিন্তু মানুষের ন্যায়-নীতিবোধ কি রকম হাস্যকর দ্যাখো। অর্গান বাজিয়ে অতুলপ্রসাদের গান করা তোমার মর্যাদায় কোথাও আটকাবে এরকম একটা আবহাওয়া ছিলো বাড়ির। এটা যেন ব্রাহ্মিকা খোপর মতোই তোমার পক্ষে বর্জনীয়। যেন গানকে অবলম্বন করে তোমার কণ্ঠস্বর কেউ শুনবে এটা উচিত নয়। কিন্তু সেতার বাজানো যেন অন্য কোনো ব্যাপার। তুমি শুনলে অবাক হবে, একসময়ে এ নিয়ে আমি খুব চিন্তা করতাম। তখন আমার এরকম একটা বালকোচিত ধারণা হয়েছিলো, সরস্বতীর হাতে বাদ্যযন্ত্র থাকে বলেই যেন আমাদের প্রাচীন আবহাওয়া তোমার সেতারে আপত্তি জানায়নি।
