সান্যালদের প্রায় সকলেরই কিছু কিছু জমি চাষযোগ্য হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্মীমানের লক্ষ্মী। সান্যালমশাইয়ের প্রায় তিনশো বিঘা খাস জমি সোনা ফলার মতো উর্বর হয়েছে। আর তা তিনি গ্রামের চাষীদের মধ্যে মুঠিমুঠি করে বিতরণ করছেন। এমন ঘটনা বিশ বছরে একবার হয় কি না-হয়। ছিদাম এবং ইয়াজের মতো অপরিপক্ক চাষীরা অকারণে জোরে জোরে পা ফেলে বেড়াচ্ছে।
জমি বিলোনোর তারিখটাকে নায়েব কয়েকটা দিন পিছিয়ে এনে সুমিতির ছেলের অন্নপ্রাশনের তিথিটার গায়ে লাগিয়ে দিয়েছে, আর সেই সুযোগ পেয়ে রামচন্দ্র দুশো বছর আগেকার একটা দিনকে যেন উদঘাটিত করে দিলো।
কী দেওয়া যায়, কী দিলে সান্যালমশাইয়ের মান রক্ষা হয় এ নিয়ে আলাপ করতে করতে দু-একজন কৃষক বলেছিলো, ট্যাকা-কড়ি নাই।
ট্যাকা না থাকলিও কড়ি তো আছে।
ওই একই কথা।
ট্যাকা না পারো, কড়ি দ্যাও।
এইভাবে কথার সূত্রপাত। ছিদাম বলেছিলো, বেশ, তাইলে একমুঠ ধান আর একটা লক্ষ্মীর কড়ি দেবো।
তাইলে আমরাও তাই দেবো। তার বেশি না।
বাকিটুকু রামচন্দ্রর পরিকল্পনা।
নায়েবমশাই বিব্রত বোধ করলো। তার কৌশল করে জমি বিলোনোর তারিখ ঠিক করা কোনো কাজেই এলো না। প্রজারা কেউ টাকা আনলো না। চৈতন্য সাহার দোকান থেকে এবং দিঘা থেকে কড়ি এবং নিজেদের ভাড়ার থেকে মুঠি-পরিমাণ ধান সঙ্গে নিয়ে তারা উপস্থিত। হলো। তাসত্ত্বেও নায়েবমশাইকে আমলাদের সঙ্গে উপস্থিত থেকে প্রজাদের ভোজের তদ্বির করতে হলো।
কিছুক্ষণের জন্য সুমিতিকে সোনার টায়রা পরা ছেলে কোলে করে দরদালানে বিছানো সাচ্চা জরির কাজ করা মখমলের জাজিমের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছিলো, প্রজাদের দিকে মুখ তুলে চাইতে হয়েছিলো–সেখানে নামকরা প্রজারা ধান আর কড়ি দিলো তার ছেলেকে।
খবরটা শুনে সান্যালমশাইও বিস্মিত হলেন। কিন্তু সকলে এ-বিষয়টিকে এভাবে গ্রহণ করতে পারলো না। গ্রামের কয়েকজন জোতদার এবং সান্যালদের অন্যান্য তরফের দু-একজন সান্যালমশাইয়ের কাছে আপত্তি জানাতে এলো এবং তারা ভূমিকাতে বললো, এ-বিষয়ে তারা সানিকদিয়ারের হাজিসাহেবের মতও জানাচ্ছে। তাদের আপত্তি শুনে সান্যালমশাই হেসে বললেন, আমি দোষ স্বীকার করছি। এদিকটা আমি বিবেচনা করে দেখিনি। আমি নিজের লাভ-লোকসানই খতিয়ে রেখেছিলাম। ব্যবস্থাটা আমার বিলমহলে বহুদিন আগেই চালু করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর সবকিছুর উপরে, জমি পত্তনি দিলে খাজনা যা পেতাম, এক-তৃতীয়াংশ ফসলেও এখানকার বাজার দামে তার চাইতে বেশি পাবো। তবে এই নিয়ম চিরকাল বহাল থাকবে এমন কথা নয়।
জোতদাররা চলে গেলে সদানন্দ এলো।
আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিলে?
তা শুনলাম। এরকমভাবে নিজের মহত্ত্বকে ধুলোয় লুটিয়ে দিতে প্রথম শ্রেণীর রসিক ছাড়া আর কেউ পারে না।
সান্যালমশাই বললেন, কথা শুনে মনে হয় আমার কাছে কিছু চাইবার আছে তোমার।
না, তা নয়। হিসেবটা আমি কষে দেখিয়েছিলাম বটে যে এক-তৃতীয়াংশ ফসলের মূল্য খাজনার চাইতে বেশি। কিন্তু পত্তনি বন্দোবস্তের নগদ সেলামি যে হিসেবে ধরিনি এটা নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়েছিলো।
কিন্তু, সদানন্দ, এখন যে আমি ঠাকুর্দা হয়েছি। দূরদৃষ্টি ক্ষীণ হওয়ারই কথা।
সান্যালমশাই সেখান থেকে উঠে অন্দরের বসবার ঘরে গিয়ে বসলেন। দাসী গিয়ে খবর দিলো সুমিতিকে, কিন্তু সুমিতির ছেলে তখন ঘুমুচ্ছে। সুমিতি নিজে এলো।
ও যে ঘুমুচ্ছে।
থাক, থাক। ঘুমোক। তোমাকে যে কাজের ভারটা দিয়েছিলাম, হয়েছে?
পছন্দ করে রেখেছি। এনে দেবব ডিজাইনের বইটা?
বিকেলে দিয়ো। কিন্তু কথা কি জানো, মেহগনি কাঠের চালান আনিয়ে নেওয়া কঠিন বলে বোধ হচ্ছে খোঁজখবর নেওয়ার পর। আজকাল ওটা তেমন চালু নয়। বাগানে অবশ্য দুটি গাছ রয়েছে। কিন্তু সীজ করিয়ে নিতে ছ মাস কমপক্ষে।
ঠিক এই কথাগুলির উত্তর দেওয়াই সব চাইতে কঠিন সুমিতির পক্ষে। ডিজাইন পছন্দ করার ব্যাপারে এত অসুবিধা হয়নি। এমন কথা তার কানে এসেছে যেনতুন বাংলোটাতার রুচি অনুসারে নির্মিত হবে। সান্যালমশাই যখন তাকে আসবাবের ডিজাইনের বইটি দিয়ে পছন্দ করতে বললেন তখন তার মনে হলো সে প্রস্তাবে রাজী না হলে হয় অত্যন্ত বেহায়া কিংবা দর্শনীয় ভাবে লজ্জাশীলা হতে হয়। এবং এই দুইরকম অগ্রসরণই তার কাছে দুঃসহ বোধ হয়েছিলো। অবশেষে সে একটা পথ খুঁজে পেলো। সান্যালমশাই যখন বইটা উল্টেপাল্টে দেখাচ্ছিলেন সুমিতি সান্যালমশাইয়ের কেঁকগুলি অনুমান করে নিতে পারলো, এবং সে স্থির করলো সান্যালমশাই জিজ্ঞাসা করলে তার নিজের পছন্দগুলিই সে দেখিয়ে দেবে।
ছ মাস যদি সীজ করতে দরকার হয়, তাই হবে। আমাদের এমন তাড়াতাড়ি কী?সুমিতি একটি নিটোল হাসি ফুটিয়ে তুলো।
ভেবে দেখি। তোমার সিল্কের সুতোর কাটুনিদের কথা শুনেছি। দেখছি।
সুমিতি বেশ লজ্জায় পড়লো। কিন্তু এরপরে কি ‘সে কিছু নয়’ বলা যাবে?
.
এক সন্ধ্যায় অনসূয়া বললেন, এখন কাজ নেই হাতে। তোমার কাছে বসে সেতার বাজাবো?
সান্যালমশাই বললেন, তাই বাজাও।
অনুসূয়া দাসীকে বলেই এসেছিলেন। সে সেতার রেখে গেলো।
পুঁথিঘরের একটি জানলার ঠিক নিচে লাইম গাছটার পুষ্পিত পল্লবগুলি দেখা যাচ্ছে। গাছটার বয়স হয়েছে বলেই হোক কিংবা বিদেশী গাছ, ক্রমশ অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি ক্ষয়িত হয়েছে বলেই হোক, এখন আর তেমন অজস্র ফুল ফোটে না। তবু একটা সুঘ্রাণ আসছে। সেই জানলার পাশে আজ বিকেল থেকে গালিচা পাতা আছে। সান্যালমশাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসে সেই গালিচায় অনসূয়া বসলেন। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সান্যালমশাই আধশোয়া অবস্থায় মনকে পরিপূর্ণ রূপে ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।
