অনসূয়া বললেন, পুরুষমাত্রেই আয়োজন ও আড়ম্বরপ্রয়াসী। কিছুকাল বিশ্রাম করে নিলে এই মাত্র, নতুবা তোমাকে আমি চিনি। ছড়িয়ে না পড়ে, আত্মবিস্তার না করে তুমি পারো না।
সান্যালমশাই বললেন, কথাটা তুমি ঠিকই বলছে। সমিতির সন্তানের মধ্যে আমারই আত্মপ্রতিষ্ঠার আশা অঙ্কুরিত হয়ে আছে। এমন সুযোগ যে আসবে তোমার ছেলের দিকে চেয়ে আমি ভরসা পাইনি।
সদানন্দ চিন্তা করলো : এই কথাগুলি সান্যালমশাইয়ের আত্মগোপনের চেষ্টা নাও হতে পারে। এবং এটা খুবই স্বাভাবিক কারণ হিসাবে তুলে ধরা যায় যে নৃপনারায়ণের রাজনীতিবৃত্তি গৃহস্থ সান্যালমশাইয়ের সমস্ত উৎসাহ নিভিয়ে দিয়েছিলো। আর এদিক দিয়ে সুকৃতির ঘটনাও উল্লেখ করা যায়।
সে বললো, আপনি বললেন সেটা একটা অত্যন্ত প্রবল কিন্তু সাধারণ অনুভব। এরই জন্য উত্তরাধিকার ব্যবস্থা অযৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সেটা আঁকড়ে ধরে আছে। আর এ বিষয়ে সুমিতি মা বোধ হয় আপনাকে সাহায্য করবেন। খোঁজ করছিলেন আমাদের স্কুলে মেয়েদের গরদ, তসর এসবের সুতো কাটা শিখানো যায় কিনা। সেক্ষেত্রে অবশ্য মুর্শিদাবাদ থেকে ওসব কাজ জানে এমন দু’এক ঘরকে এনে এখানে প্রজা করতে হয়।
সান্যালমশাই বললেন, তাও যদি না থাকবে তবে এই ষাটের দিকে অগ্রসর জীবনে কী অবলম্বন করবো। ধর্মে মতি নেই। তৃতীয় শ্রেণীর দার্শনিক হওয়ার চাইতে প্রথম সারির বাঁচিয়ে হওয়া ভালো। একে কি শান্তিনিকেতনের প্রভাব বলবে?না বলাই ভালো। হোক না এটা সুমিতির নিজের চিন্তা। সব দিক ভেবে দেখোনা হয়।
শাদা ঝকঝকে বাংলোটি যে আধুনিকতার চূড়ান্ত হবে তাতে আর সন্দেহ নেই। যারা সান্যালমশাইকে চেনে দীর্ঘকাল ধরে তাদের পক্ষে এর গঠনটাও বিস্ময়জনক বোধ হবে। সহসা যদি সান্যালমশাইকে মর্নিংসুটে দেখা যায় কতকটা তেমনি বিস্ময়ের। এ বিস্ময়বোধকে দূর করতে হলে কল্পনা করতে হয় এটা তার একটি শুভ্র সুন্দর রসিকতা। কথা হলো সদানন্দ পর্দার, সোফার ঢাকনা ইত্যাদির কাপড়ের অর্ডার দিতে সদরে যাবে।
সান্যালমশাই বললেন, রূপু বাংলোটার নামকরণ করেছে সুমিত। তার ইচ্ছা পুকুর থেকে কেটে নিয়ে গিয়ে বাংলোর পাশে আঁকাবাঁকা একটা ঝিল করে দিতে হবে। তাতে থাকবে কাঠের সাঁকো।
অনসূয়া বললেন, ছেলে কি ‘শেষের কবিতা পড়ছে?
তার প্রতি অন্যায় করা হবে যদি তোমরা এতে শেষের কবিতার ছাপই শুধু দেখতে পাও। বরং সে আমাকে বলেছে উত্তরদিকে হওয়া সত্ত্বেও বাংলোর নাম ‘উত্তরায়ণ’রাখেনি সে, ঠাকুর জমিদাররা রেখেছেন বলে।
সদানন্দ হাসলো। সে বললো, বংশের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
তা তুমি মিথ্যা বলেনি। ঠিক কী রকম ছিলো আমার পূর্বপুরুষরা তার বিশ্লেষণ করার মত ঐতিহাসিক বুদ্ধি আমার নেই। তাহলেও কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ যখন একটি বিশেষ দিকে দ্রুত ধাবমান হয়েছিলো তখন যারা সে-গতিতে বাধা দিয়েছে, বাংলাদেশের অন্য অনেক পরিবারের মধ্যে তাদের দলেই ছিলো আমাদের পরিবার। একথা তুমি বলতে পারো, সদানন্দ, আমরা অগ্রসরদের দলে থাকার অনেক সুযোগ নষ্ট করেছি। মানুষ নিজেদের অন্যায়ের সমর্থনেও যুক্তি খুঁজে বার করে। তেমনি মনোভঙ্গিতে ব্যাপারটা চিন্তা করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, রাজা রামমোহনের সময় থেকে এই যে আমরা বাধা হিসাবে কাজ করলাম এর ফল বোধহয় সবটুকু খারাপ হয়নি।
এ যেন দূরস্থিত কাউকে নিয়ে আলাপকরা। সদানন্দ বললো, আপনাদের মতো শক্তিগুলিই বিদ্যাসাগরকে বাধা দিয়েছিলো, ব্রাহ্মদের ব্যঙ্গ করেছিলো।
শুধু একটা দিকই দেখো না। দুর্গোৎসবকে এবং রামপ্রসাদীকে ধরে রেখেছি। বাংলাদেশ হাওয়াই দ্বীপে পরিণত হয়নি কিংবা মেক্সিকোতে।
সান্যালমশাই প্রফুল্ল হাসিতে আবার বললেন, বিদ্যাসাগরকে বাধা দিতে পেরেছিলাম, কেশব সেনকে প্রতিরোধ করতে সশিষ্য রামকৃষ্ণকে পাওয়া গিয়েছিলো, কিন্তু রূপের কাছেই হার মানলাম। ভদ্রলোক দেহের স্বাভাবিক হিসাবে যত অগ্রসর হলেন জরার দিকে তত কি সুন্দরতর হলেন? আমার মনে হয়, সদানন্দ, শ্রীচৈতন্যও রবীন্দ্রনাথের মতোই রূপবান ছিলেন। চৈতন্যর পর সেজন্য রবীন্দ্রনাথই আমাদের আবদ্ধ বিলগুলিতে নতুন জল এনে দিলেন, নতুন পলিমাটি। রূপের প্লাবনে ভেসে যাওয়াই বোধহয় আমাদের জাত্যগুণ।
অনসূয়া বললেন, এটা খুব খাঁটি কথা বলেছে। এইজন্যেই পদ্মও তোমাদের জীবনের চূড়ান্ত বিস্ময়। তাকে ভালোবেসে, ভক্তি করে চূড়ান্ত আঘাত পাচ্ছো তবু নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারছে না। বর্তমানেও দেখতে পাচ্ছি সাময়িকভাবে পদ্মার অনুগ্রহ পেয়ে প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে তোমার চেতনা।
পদ্মার তীরে অনেক ঘটনায় পদ্মা নিজে এসে নায়িকা হয়। কখনো বা তার কোনো কাজ থেকে সাধারণ মানুষের সোজা জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয়। তাদের শ্লথদীর্ঘপথ অতিবাহিত করার ভঙ্গিতে গতি এসে ঘা দিতে থাকে। দু-এক মাসে দু-এক বছরের পথ এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে যায় মানুষ। মাটি এখানে ধ্রুব নয়।
পদ্মা পাঁচ-সাত বৎসর এদিক থেকে ওদিকে ঝুঁকেছিলো। কিন্তু হঠাৎ আবার যেন নাচের ঢঙেই এদিকের দর্শকের দিকে ফিরে তাকালো। ইন্দ্রর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে যেন বরুণের দিকে আঁচলের ঢেউ তুলে এগিয়ে এলো। তার ফলে দাদপুর ভেঙে গেলো। দাদপুরের অনেক মানুষের আশা-ভরসা সেই নর্তকীর পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলা ফুলের মতো নিষ্পিষ্ট হলো। কিন্তু এদিকে পয়স্তি, সিকস্তি হলো। আর তার ক্ষণেকের দৃষ্টিপাতের মতো যে বান এসেছিলো গত বর্ষায় তাতে ভয়ংকর সৌন্দর্যের সামীপে যেমন হয়, দর্শকদের বুকের মধ্যে ধক করে উঠেছিলো, পয়স্তি-সিকস্তি ধুয়েমুছেকপাল ভাঙার দ’হয়ে যাবে এমন আশঙ্কা ছিলো, কিন্তু দেখা গেলো এক-কোমর পলি রেখে গেছে। নর্তকীর দৃষ্টির প্রসাদই নয়, যেন তার আলিঙ্গন। বুড়ো জোয়ান হয়ে উঠবে এমন লক্ষণ দেখা দিলো।
