আজই আকস্মিকভাবে চোখে পড়লো তা নয়, এর আগেও এসব লক্ষ্য করেছে রামচন্দ্র। বাড়িটার চেহারা আর ফিরলোনা, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে আবার ধান উঠেছে। দুর্ভিক্ষের ক্ষতচিহ্নের মতো শোকটা রয়েই গেলো। সনকা কিন্তু একটি অদ্ভুত কথা বলেছিলো একদিন। বাল্যকালে তার দুরন্তপনায় রুষ্ট হয়ে এক প্রতিবেশী বলেছিলো তার মাকে-সনকানাম রেখেছে আহ্লাদ করে, ওর ভাগ্য সনকার মতোই হবে। এ যেন এক ধরনের সান্ত্বনা যে এই সন্তানশোক তার ভাগ্য-নির্ধারিত, যেমন তার নাম সনকা হওয়া, কিংবা রামচন্দ্রর মতো প্রচণ্ড স্বামী পাওয়া।
একরাত্রিতে রামচন্দ্র স্ত্রীকে বললো, মহিম সরকার যে কী হয় তোমার?
বাপের পিসাতো ভাই।
শুনছি নাকি সে তার ছোটোমিয়ের বিয়ে দেয়।
তা দেওয়া লাগে। চোদ্দ পনরো বছর হলো বোধায়।
অন্যের ছেলেমেয়ের বিয়ের কথা শুনলে নিজের ছেলেমেয়ের বিয়ের কথা বয়স্ক লোকদের মনে হয়। কিছুকাল বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রামচন্দ্র বললো, কে, তোমার মুঙ্লার আবার বিয়ে দিতে হয় নাকি?
তা কি আর আমি দিবো? তুমি শ্বশুর, তার বাপ এখনো বাঁচে।
এরপরে অনিবার্যভাবেই মেয়ের কথা মনে পড়লো। দুজনের দীর্ঘশ্বাস দুজনের কানে গেলো। রামচন্দ্রর মনে হলো একটি ছোটোবউ এসে যদি এ-বাড়ির ঘর-দরজায় ঘুরঘুর করে বেড়ায় তাহলে সনকার নিঃসঙ্গতা কিছু কমে।
কাজকর্ম আজকাল কম। মহোৎসবের জন্য যে-চাদরটা মুঙ্লা তার জন্য কিনে এনেছিলো সেটা কাঁধে ফেলে অনির্দিষ্ট গতিতে পথ চলতে চলতে সে একদিন সানিকদিয়ারের পথ ধরলো। নিজে সে চিকন্দির অধিবাসী হলেও তার অধিকাংশ জমি সানিকদিয়ারে। কাজেই সানিকদিয়ারে তার যাওয়া-আসা আছে। সানিকদিয়ারে পৌঁছে তার মনে হলো–এখানে কেন এলাম। সে কি এখন হাজিসাহেবের বাড়িতে যাবে? না, তার দরকার নেই। সেখানে ছমিরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা হতে পারে এবং কমিটির কথায় অপ্রিয় কথা উত্থাপিত হতে পারে। ছমিরুদ্দিন জানে ছিদাম ও মুঙ্লার দল আজকাল ফুড় কমিটি নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করছে। এরপর তার মনে হলো,
সে মহিম সরকারের বাড়িতে যাবে। সেখানে খবর আছে।
মহিম সরকারের বাড়িতে পৌঁছতেই সে সমাদৃত হলো। মহিম সরকার নিজে এগিয়ে এলো।
আসেন, জামাই।
রামচন্দ্র নমস্কার করে বললো, ভালো আছেন, কাকা? আসলাম একটু খোঁজখবর নিতে।
প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার পর গালগল্প হলো। বেলার দিকে লক্ষ্য রেখে রামচন্দ্র বললো : এবার উঠবের হয়।
তাও কী হয়? ছান-আহার এখানেই হবি। আমি লোক পাঠায়ে মিয়েক খবর দিতেছি। রামচন্দ্র ‘না’ ‘না’ করতে মহিম সরকার তার ছোটোছেলেকে ডেকে বললো, এঁয়াক চেনো, বলাই? তা না-চেনো, চিকন্দির রামচন্দ্র মণ্ডলের বাড়িতে যায়ে কয়ে আসো মহিম সরকার, কয়েছে জামাই এ-বেলা তার বাড়িতে থাকবি। মহিম সরকারের ছোটো ছেলে রামচন্দ্রর দিকে চোরাদৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে চলে গেলো।
স্নানাহারের পর রামচন্দ্র বললো, কাকা, জমি নাকি বেচেন?
না। মিয়ের বিয়ে দিতে হবি। তা এক পাত্র পাই শহরে। ভাবছি, মিয়ের নামে জমি, সে কি আর শহর থিকে ভোগ করবের আসবি? তার চায়ে নগদ টাকা করে দিবো। কে জামাই, জমি নিবেন? তা নিলেও সুখ পাই। ভাববো, এক জামাই না নেয়, আর এক জামাই নিছে; জমি ঘরের বার হয় নাই। কিন্তুক’
কী কিন্তুক, কন্ জামাই। জমি নিবের চায় ছমিরুদ্দিন, সে শাসায় অন্য কেউ আগালে। আমি ভাবছি ছমিরেক আসবের দেবো না আমার জমির পাশে। ঐ জমিটুকের এক লপ্তে আমার আর দুই মিয়ের জমি আছে। পাশে ছমিরুদ্দিন জমি নিলে মামলা কাজিয়া হবের পারে।
কিন্তুক—
রামচন্দ্রর কিন্তুকের অর্থ তিন হাজার টাকা ধাঁ করে বের করে দেবে এমন ক্ষমতা তার নেই। আর তাছাড়া দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এক কাঁধে জমি আর এক কাঁধে ঋণ নিয়ে আগেকার মতো চলার দুঃসাহসও যেন তার কমে গেছে।
রামচন্দ্র বসে বসে গোঁফ পাকাতে পাকাতে হঠাৎ বলে ফেলো, কেন, কাকা, এমন জামাই যদি হয়, মিয়ে আপনার চোখের উপরে থাকে, জমি আপনার বেচা লাগে না।
জমি কে বেচবের চায়? মিয়ে চোখের উপরে থাকে জমি ভোগ করবি এমন জামাই কনে পাই?
কাকা, মুঙ্লা দেখছে?
মুঙ্লা?
হয়, মুঙ্লা।
যে-মুঙ্লার তুমি বাপ হইছে?
তার বাপ এখনো বাঁচে।
তাইলেও, তোমার জমিজিরাত দ্যাখে সেই ছাওয়াল?
হয়।
হুম। মহিম সরকার তার ডাবা হুঁকোয় মুখ দিয়ে মুহুর্মুহু ধোঁয়া টানতে লাগলো। তারপর ‘ধরেন’ বলে হুঁকোটা রামচন্দ্রর হাতে দিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো। প্রায় পনরো মিনিট পরে
মহিম ফিরলো। তার সঙ্গে তার সাত ছেলে।
মহিম সরকার বললো, কিন্, জামাই, মুঙ্লার কথা কী কবেন।
কী আর কবো। তার বাপ বাঁচে। মুঙ্লা আমার কাছে থাকে।
মহিম সরকারের বড়োছেলে বললো, লোকে তো জানে মুক্ল আপনের ছাওয়াল।
তা কয় লোকে।
মহিম সরকারের মেজোছেলে বললো, মানুষ বলাবলি করে আপনের সম্পত্তির সেই হার।
তা কউক, মিথ্যা কী কয়?
মহিম সরকার বললো, মুঙ্লার বিয়ে দিবেন, জামাই?
না দিয়েই বা কী করি, কন্।
রামচন্দ্র বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরলো। পথে কথাটা সে ভাবলো। এ কথা স্পষ্ট কোথাও উচ্চারিত হয়নি যেমুঙ্লার সঙ্গে মহিম সরকারের মেয়ের বিবাহের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু রামচন্দ্র মুঙ্লার কথা উত্থাপন করেছিলো এবং মহিম সরকার সপুত্রক তাকে প্রশ্নাদি করেছিলো এই সম্ভাবনাকে সম্মুখে রেখে। রামচন্দ্র ব্যাপারটাকে দুদিন গোপন করে রাখলো, তারপর স্ত্রীকে বললো, এমন বিয়ে হয় নাকি?
