প্যান্টকোট-পরা লোকটি বললো, তাহলে এখানকার কমিটি তৈরি হলো?
সভা সমস্বরে জানালো, তা হয়েছে।
এরফানের সঙ্গে আলেফের দেখা হলো পথে।
এরফান প্রশ্ন করলো, দমদম করে যাও কতি?
আলেফ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললো, সান্যালমশাই ডাকে পাঠাইছে। তুমি চলে আসলা যে?
থাকে আর করবো কী?
আলেফের মুখ রক্তহীন হয়ে গেলো, তাইলে আমি আর যাই না। মনে কয়, আল মামুদের বক্তৃতার কথা হইছে।
দুজনে বাড়ির পথ ধরলো।
পথ চলতে চলতে এরফান বললো, কেন্ ভাই, সেক্রেটারি হবের চাও?
আলেফ একটা কটু কথা বলতে গিয়ে থামলো৷ তিরস্কার ও অভিমানপূর্ণ দৃষ্টিতে সে ছোটো ভাইয়ের মুখের দিকে খানিকটা সময় চেয়ে রইলো।
এরফান হেসে বললো, হবা তো হও।
তার মানি?
সান্যালমশাই তোমাকে সেক্রেটারি করছে।
আল্লা রসুল!
নীরবে কিন্তু অস্থিরভাবে খানিকটা পথ চলে অবশেষে আলেফ ভাবলো, আল মামুদেক হৈচৈ করবের মানা করো। সে যে না কয় তার বক্তৃতায় কাম হইছে। সান্যালমশাই শুনলে ভাবে কী?
হয়! এরফান বিস্ময়ের ভান করলো, যেন আল মাহমুদের কথা এই প্রথম শুনলো সে।
ওর আর এ-গাঁয়ে থাকে কাম নি, চালান করে দেও।
তিন-চারদিন মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় কেটে গেলো আলেফের। পঞ্চম দিনে চৈতন্য সাহা এসে কিছু ছাপানো কাগজপত্র, কিছু বইখাতা দিয়ে গেলো।
চৈতন্য সাহা চলে গেলে ছেলেকে সুখবরটা দেওয়ার জন্য পত্র লিখতে বসলো আলেফ। সুসংবাদটা ফলাও করে বর্ণনা করে অবশেষে সে যা লিখলো তার মর্মার্থ এইরকম :
তুমি একবার এসে দেখে যেয়ো। আর আসবার সময়ে আমার জন্যে একটা টুপি এনো। লাল ফেজ না। কালো লোমলোম একরকম টুপির কথা গতবার বলেছিলে, সেইরকম এনো। আর-এক কাজ করবা, কলকাতায় পাঠান যদি থাকে খোঁজ করবা তারা কাবুলি-পাগড়ি বাঁধে, টুপি পরে। মনে রাখবা আমরা পাঠানবংশের।
২৩. ইতিহাসের এ অধ্যায়কে
ইতিহাসের এ অধ্যায়কে মুঙ্লার বিবাহ-খণ্ড বলা যেতে পারে। কিছু জমিজমা হস্তান্তর হবে এমন খবর এনেছিলো ছিদাম। এমন সব খবর আজকাল তার কাছে
সবসময়েই পাওয়া যায়। এমন নয় যে সে জমি কিনবে। তার চাইতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অভাব থাকতে পারে অন্য অনেকের, কিন্তু তাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে। আলেফ সেখ, ছমিরুদ্দিন, গহরজান, মিহির সান্যাল ছাড়াও মুকুল রায় আছে, রেবতী চক্রবর্তী আছে।
কেষ্টদাস বললো, ছিদামের কাছেই শোনেন।
রামচন্দ্র বললো, ছেলেমানুষ কী বলতে কী শুনছে।
ছিদাম ঘরে ছিলো, সে বললো, না জ্যাঠা, খবর ঠিক। সানিকদিয়ারের সকলেই জানে মহিম সরকার জমি বেচবি।
কেন, তার কীসের অভাব? শুনি তার আট বেটা পাঁচ মিয়ে সবাই বাঁচে।
তা আছে। তার সকলের ছোটোমিয়ের বিয়ে দিবি, তাই নাকি জমি বেচবের চায়। কয় যে কবে আছি কবে নাই। তখন ছোটোমিয়ের বিয়ে তার দাদারা দিবি কিনা দিবি, ঠিক কী। তা ছোটোমিয়ের নামে চৌদ্দ বিঘা জমি লেখা আছে, সে জমি বেচে নগদ টাকা করে ধুমব্রাকে বিয়ে দিবের চায়। এক পাত্র নাকি জুটছে।
ছিদাম কাছে এসে বসলো। তার কাছে জমিজিরাতের খবর ছাড়াও গ্রামের সাধারণ খবরও পাওয়া যায়, বিশেষ করে কোথায় কোন অন্যায় অবিচার হচ্ছে তার লম্বা ফর্দ। রামচন্দ্র ও কেষ্টদাস কচিৎ কখনো প্রতিকারের পথ বাৎলায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুপ করে থাকে। একদিন কেষ্টদাস রাগ করে বলেছিলো, না রে বাপু, যত রাজ্যের লোক তোর কাছেই বা লাগায় কেন্ এত কথা। নালিশ করার লোক কি তাদের নাই আর?
এ ধরনের কথায় ছিদাম অপ্রতিভ হয় না। সে হয়তো বলে বসে, যা-ই কও, চিতে সা আবার শয়তানি লাগাইছে, তার জোগানদার ছমিরুদ্দিন না আলেফ সেক বুঝি না। বেশি দাম হলিও এতদিন জিনিস পাতে, এখন পাও না কে?
আজ ছিদাম সেসব কথা বললো না। মহিম সরকারের জমিজিরাতের কথা নিয়েই মশগুল হয়ে রইলো।
রামচন্দ্র ছেলেমানুষকে ঠাট্টা করার সুরে বললো, তুমি যদি নেও জমি, দামদস্তুর করতে পারি।
আমি! ছিদাম হেসে ফেলো। দাম শুনি তিন হাজার।
বাড়িতে ফিরে রামচন্দ্র দেখলো বাইরের দিকে কেরোসিনের কুপির আলোয় বসে মুঙ্লা গোরুর জন্য খড় কুচোচ্ছে। রামচন্দ্রর স্ত্রী সনকা দিনের বেলাতেই রান্নার কাজ শেষ করে রাখে। চাঁদের স্নান আলো ভিতরদিকের বারান্দায় যেখানটায় পড়েছে সেখানে নিঃসঙ্গ সনকা নীরবে বসে আছে। কোনো কাজ নেই, নিজেকে ব্যাপৃত রাখার জন্য কোনো অকাজের কাজও সে আবিষ্কার করেনি। চিরদিনই সে স্বল্পভাষী। সংসারের আঘাতে সে আরও অন্তর্মুখী হয়ে গেছে। দিনের বেলায় সংসারের কাজ থাকে, পাড়াপড়শী দু’একটি স্ত্রীলোক আসে। কিন্তু সন্ধ্যার পর রামচন্দ্র কথা বলার জন্য কেষ্টদাসের বাড়িতে কিংবা অন্যত্র যায়, মুঙ্লা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন স্তব্ধতাই সনকার সঙ্গী। রামচন্দ্র নিরুপায়। পুরুষ হয়ে স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার অর্থ, মন ও দেহ দুটিকেই নষ্ট করা। বোষ্টমরা স্ত্রীদের সাহচর্য দেয় বলেই তারা পৌরুষহীন।
গায়ের জামাটা ঘরে খুলে রেখে এসে রামচন্দ্র বললো, আসলাম। রামচন্দ্রর স্ত্রী উঠে দাঁড়ালো, মুঙ্লার কাছ থেকে কুপি চেয়ে এনে রামচন্দ্রর হাত-পা ধোবার জল, গামছা, খড়ম এগিয়ে দিলো।মুঙ্লা এসব কাজে তার শাশুড়ির সহায়তা করে। সে তামাক সেজে এনে দিলো। বারান্দার নিচু জলচৌকিটায় বসে তামাক খেতে খেতে রামচন্দ্র লক্ষ্য করলো কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে মুঙ্লা হাতমুখ ধুচ্ছে। সনকা কুপি নিয়ে রান্নাঘরে ভাত বাড়তে গেছে।
