একদিন গোরুগাড়ি করে সনকা মহিম সরকারের বাড়িতে গিয়ে একবেলা কাটিয়ে এলো, আর একদিন দুই বেটা বউকে সঙ্গে নিয়ে সস্ত্রীক মহিম সরকার রামচন্দ্রর বাড়িতে এলো। এরপরে একদিন রামচন্দ্র মুঙ্লার বাবার কাছে গিয়ে অনেক আলাপ করে এলো। তারপর রাষ্ট্র হলো মহিম সরকারের ছোটোমেয়ের সঙ্গে মুঙ্লার বিবাহ হচ্ছে।
বিবাহের তখনো কিছু দেরি আছে। একদিন ছিদাম এসে অত্যন্ত ভক্তিসহকারে রামচন্দ্রকে প্রণাম করলো। রামচন্দ্র ‘আহা-হা, করো কী, করো কী বলতে বলতে ছিদাম প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়ালো। রামচন্দ্র তাকে শাসনের ভঙ্গিতে কাছে টেনে নিয়ে বললো, গোঁসাই অধিকারীর ছাওয়াল হয়ে আমার পায়ে হাত দেও, এ কী কথা?
কেন্, জ্যাঠা, আপনে আমার জ্যাঠা হবের পারেন না?
এ কথা কও যে।
গাঁয়ের লোকে কয়–
কী কয়?
এমন পাকা বুদ্ধি আর কারো দেখি নাই, একটানে পনরো বিঘা জমি ঘরে উঠলো। ছিদামের ভঙ্গিতে চপলতা ছিলো কিন্তু রসিকতা ছিলো না। সে যেন পথের উপরে দাঁড়িয়ে পথপ্রদর্শককে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানাতে গিয়ে আলোক-বিহ্বল হয়ে মন্ত্রের গাম্ভীর্য ভুলে গেছে।
মাসদুয়েকের মাথায় বিবাহের দিনটি এসে পড়লো। দিঘা থেকে ভাড়াকরা ডে-লাইট এনে, সানিকদিয়ারের জীবন ঢুলির ডোল-ডগর বসিয়ে, গাঁয়ের লোকজনকে আদর-অভ্যর্থনা করে বউ ঘরে তুলো রামচন্দ্র। বিবাহের দিনেই কাগজে কাঁচা লেখার কাজ শেষ হয়েছিলো, তিন-চার দিন পরে দুখানা গোরুগাড়ি করে রামচন্দ্র ও মহিম সরকার সদরে গিয়ে সম্পত্তি রেজেস্ট্রি করে এলো।
মুঙ্লার বাবা এসেছিলো। যে শিশু-মুঙ্লাকে রামচন্দ্রর হাতে প্রায় দত্তকের মতো সে অর্পণ করেছিলো তাকে দেখে চিনতেই পারলো না চট করে। তার পরিচয় পেয়ে মহিম সরকার অবশ্য তাকেও যথাযোগ্য সমাদর করেছিলো।
কিন্তু হুঁশিয়ার মহিম সরকার।নগদ খরচ করতে নারাজ। বরযাত্রীদের ভালো করে খাওয়ালো সে, গহনার অধিকাংশ রামচন্দ্রকেই দিতে হলো। কিছু ঋণ হলো তার।
মুঙ্লার বউয়ের নাম ভান্মতি । মহিম সরকারের নিকষ কৃষ্ণ রং পায়নি সে কিন্তু দেহগঠন পেয়েছে। অত্যন্ত স্বাস্থ্যবতী মেয়ে। চোদ্দ-পনরো বছর বয়স হলো, কিন্তু পূর্ণতায় তাকে বিশ বছরের বলে ভুল হয়। প্রথম দিন যখন সে নববধূর পোশাক ছেড়ে সংসারের কাজে নামলো, সনকা তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিলো।
ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারলেও আরো ভালো করে জানার জন্য ভান্মতি মুঙ্লাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার মা কাঁদলেন কে?
বলা উচিত কিনা এই ভেবে মুঙ্লা চুপ করে রইলো।
ভান্মতি আবার বললো, আমি আসে কি খারাপ করলাম?
এ অবস্থায় মুঙ্লার বয়সের একটি ছেলে যেমন করে পারে তেমনি করেই মুঙ্লা বললো, তুমি এ বাড়িতে আলো আনছো।
ভান্মতি সুর বদলে বোকার অভিনয় করে বললো, হয়, বাবা তোমাক একটা বিলেতি হারিকেন দিছে।
ঘরের কোণে একটা নতুন হারিকেন মৃদুভাবে জ্বলছিলো। সেটাকে দেখিয়ে ভান্মতি খিলখিল করে হেসে উঠলো। কিন্তু মুঙ্লা হাসিতে যোগ দেওয়ামাত্র শাসনের ভঙ্গিতে বললো পাশের ঘরে ওনারা আছেন।
কিছুপরে ভান্মতি বললো, শ্বশুরেক দেখলে ভয় করে কিন্তুক আমার শাশুড়ির মতো মানুষ আর কনে পাবো। আমার বউদিদিদের চাইতে অনেক ঠাণ্ডা।
.
কিছুদিন যেতে না যেতে অসুবিধা হলো ছিদামের। কিছুদিনের মধ্যে সে আর মুঙ্লা সুহৃৎ মিত্রই হয়নি, অবিচ্ছেদ্য সঙ্গীও হয়েছে। গ্রামের পথে একজনকে দেখলে আর-একজনকে যে কাছাকাছি পাওয়া যাবে তা আন্দাজ করে নেওয়া চলে। সেই মুঙ্লা এমন হলো যে নিজে থেকে আসে না, ডেকে আনলে ছটফট করে।
একদিন ছিদাম কথাটা পদ্মকে বললো, কে, এমন হয় কেন?
পদ্ম কিছু না বলে হাসলো।
ছিদাম বললো, এবার ধান রোপার কী করবো ভাবে পাই না।
কে, গতবার কি আমি পারি নাই?
পারছো, লোকে কিন্তু ভালো কয় নাই।
পদ্ম একটু ভেবে বললো, ধান রোপার সময় সে আসবি। তার খেতের জন্যি তোমাকে ডাকবি।
কিন্তু এসব মনোভাব প্রকাশের দুর্বল চেষ্টামাত্র। ছিদাম বাল্যে মাতৃহারা। পিতা উদাসীন। পদ্মর কাছে সাহচর্য ও স্নেহ পেয়েছে বটে কিন্তু মুঙ্লার কাছে যা পেয়েছে তার তুলনা হয় না। বুক ভরে ওঠার, শরীরে শক্তি এনে দেওয়ার মতো কিছু অন্য কেউ দেয়নি তাকে। সারাদিন একত্রে কাজ করেছে তারা, তবু ছিদামের ধান পৌঁছে দিয়ে যখন মুঙ্লা বাড়ি ফিরবে বহুদিনের অদর্শনের পর যেমন হতে পারে, তেমনি করে দুজনে দুজনকে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ করেছিলো। এটা একটা সূচক ঘটনা।
একদিন পদ্ম বললো, ছাওয়ালের বিয়ের কথা ভাবো নাকি?
কেষ্টদাস বললো, ভাবে কী করি!
ছাওয়ালের মন খারাপ তাই কলাম।
কারণটা কেষ্টদাস বুঝতে পারলো কিন্তু উদাস ভঙ্গিতে সে বললো, আমি কি রামচন্দ্র, যে নাম শুনলে মিয়ে নিয়ে আসবে লোকে?
কানাঘুষায় কথাটা শুনে ছিদাম কিন্তু পদ্মর উপরে রাগ করলো।
বিয়া দিবা? চৈতন্য সার ধার এখনো শুধি নাই। খাবা কী? পরবা কী?
কথাটায় পরুষ সুর থাকায় পদ্ম হকচকিয়ে গেলো, একটু অপমানিত বোধ করলো সে। কিন্তু ছিদাম যখন চলে যাচ্ছে তখন তার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে পদ্মর মনে হলো : কথাটা ও মিথ্যা বলেনি। যদি শক্তিহীন পিতা এবং নিঃসম্পর্কিত একটি স্ত্রীলোককে প্রতিপালনের ভার ওকে বইতে না হতো তবে নিজের মনের মতো একটি স্ত্রী নিয়ে গৃহী হবার পক্ষে ওর শক্তি যথেষ্টই আছে। মনের গভীরতর স্থানে প্রবেশ করে পদ্ম স্থির করলো, দুইটি পুরুষের স্ত্রী হয়ে কালযাপন করার পর তার বোঝা উচিত ছিদামের মনের অবস্থাটা কী হতে পারে। কোনো কড়া কথা ছিদামকে বলা উচিত নয়, আর বোধহয় একটু হেসে কথা বলা উচিত।
