একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়লো এরফানের। ভাইয়ের জন্য দুঃখ বোধ হলো। এত বয়েস হয়েছে তবু প্রাণের ভিতরটা অল্পবয়সের গরম রক্তে পুড়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত সুরে সে বললো, করবো।
আলেফের দাড়িটাকা প্রকাণ্ড মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
গ্রামের সাধারণ লোক যত বিস্মিতই হোক, তবু খানিকটা আগ্রহ নিয়ে শুনলো, মাতব্বরস্থানীয়েরা কথাটা তাচ্ছিল্যভরে উড়িয়ে দিয়ে বললো, তা লিবেন ভোট। অন্য কেউ হলে এতে খুশি হয়ে উঠতো কিন্তু আলেফ এদের সরলতায় বিশ্বাস করতে পারলো না। তার ধারণা হলো, এটা গ্রামবাসীদের একটা কূটকৌশল, তাকে তার উদ্যম থেকে নিরস্ত করে প্রস্তুতি থেকে দূরে রাখার। তাহলেও সেটা নিজের গ্রাম। আসল যুদ্ধক্ষেত্র চিকন্দি। সেখানে লোকসংখ্যাও বেশি। সেখানে দুধের ছেলেরাও টক্ট করে কথা বলে।
চিকন্দির প্রবেশপথে আলেফের দেখা হলো ছিদামের সঙ্গে।
আলেফ বললো, কোন গাঁয়ে থাকা হয়?
চিকন্দি।
হয়? আমার কোন গাঁয়ে থাকা হয় জানো?
জানি, চরনকাশির পাকামজিদ আপনের।
খুশি খুশি মুখে গদগদ স্বরে আলেফ বললো, চেনো তাইলে। তা তুমি কার ছাওয়াল?
শ্রীকৃষ্টদাস।
সে তো বন্ধুলোক আমার। ভালোই হইছে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে। তোমার বাড়ি যাতেছি।
কেষ্টদাসের বাড়িতে কেষ্টদাস ছিলো, রামচন্দ্র ছিলো। আর আলেফ ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেলো তাদের কথা হচ্ছে কমিটি নিয়ে।
রামচন্দ্র বলছিলো, যে ছাওয়াল, সে হয়তো আবার গান বাঁধবি।
শ্রীকৃষ্ট বললো, তা গান বাঁধলি কী হবি, সব তো চ্যাংড়ামো কথা না। চৈতন্য সা ছাড়া আর কার দোকান আছে সরকারের চোখে পড়ার মতো, কও?
তা হোক আর না হোক। যদি সেসব হয়ই চৈতন্য সাক একটু সাহায্য করা লাগবি। ধরো যে তার তো অন্যায় করছি একদিন, একটু উপকার করা লাগবি। রামচন্দ্র বললো।
ঠিক এই সময়ে মঞ্চাবতরণ করলো আলেফ।
আসেন, আসেন।
আলাম বেড়াতি বেড়াতি। কী দিনকাল হলো কন্?
কথাটা আলেফের মুখে মানায় না। রামচন্দ্র হাসিমুখে গোঁফ চারিয়ে দিয়ে বললো, আপনের তো ভালোই হইছে জোলার ধান।
হইছে, না? কথাটা আলেফ অনুভব করলো, কিন্তু এক মুহূর্তমাত্র। নিজের চিন্তার একপ্রান্তে ধানের রং লাগতে লাগতে আত্মসংবরণ করলো সে। নিঃসংশয়ে কমিটির কথাটা চাপা দেওয়ার কৌশল এটা। আলেফ তাড়াতাড়ি কমিটির প্রান্ত চেপে ধরে বলে উঠলো, আল্লা, আল্লা! দিনকালের কথা কয়েন না, মণ্ডল। জোলাই-বা কি, দোলাইবা কি। ধানপানে আর মন দেওয়া নাই। কমিটির কথা কী কতিছিলেন, কন্ শুনি। বাজে বাজে কথা ক, কাজের কথায় প্রাণের কষ্ট বাড়ে।
রামচন্দ্র বললো, তা কমিটি করতিছে সরকার। সস্তায় নাকি কাপড় দিবি, তেল চিনি দিবি। সোবানাল্লা! সরকার ফেল পড়বি নে? তা পড়ে না বোধায়। সরকার দোকান করবি, সেই দোকানটা পাতে চায় চৈতন সা।
আচ্ছা মজা হইছে। আলেফ যেন পরম কৌতুকে হেসে উঠলো। বাঁচে থাকলে আরও কত দেখবো। কমিটিও কি তাই হবি নাকি, মণ্ডল?
তাই তো শুনি।
আলেফ বারদুয়েক দাড়িতে হাত বুলিয়ে যেন চূড়ান্ত কৌতুকে হা হা করে হেসে উঠলো, তাইলে বুঝলা না, মণ্ডল, আমাকেই আপনেরা দশজন কমিটির হেড করে দেন। হাজিসাহেব রাগ করবি নে বোধায়। তার চায়ে দশ শালের ছোটো হলেও হবের পারি, কিন্তুক দাড়ি আমার বেশি পাকা, কী কন্ গোঁসাই?
শ্রীকৃষ্ট বললো, তা হন, আপনেই হন। একজন হলিই হলো।
রামচন্দ্র, কী কন্?
রামচন্দ্র শ্রীকৃষ্টর মতো লঘুস্বরে বললো, হন না, আপনেই হন।
আলেফ এবার আর হাসলো না। শ্রীকৃষ্ট রামচন্দ্রর মুখ থেকে প্রগর্ভ হাসি যে কথা টেনে বার করেছে কৌতুক করলে সেটা লঘু হয়ে যাবে। আলেফ অনুভব করলো, তার একমাত্র করণীয় হচ্ছে কথাটার চারিদিকে গম্ভীর আলাপের ঠাসা বুনুনি বোনা। ক্রমশ আলাপটাকে টাকার লেনদেনের মতো কঠিন করে তুলতে হবে। গম্ভীর কথাবার্তার মাঝখানে পড়ে দানা বাঁধতে থাকবে কথাটা, অবশেষে প্রতিশ্রুতির মতো নিরেট হয়ে উঠবে।
আলেফ বললো, তামাক খাওয়াবেন না, কেন্ গোঁসাই?
নেচ্চায়। শ্রীকৃষ্ট তামাকের জোগাড়ে গেলো।
আলেফ আবার বললো, কী কথাই শোনালেন আজ, মণ্ডল। কমিটি। তা সত্যি হবি? তা ধরেন যে বুড়া হলাম, ধৰ্ম্মকম্ম করা লাগে, দানধ্যান করা লাগে। গরিব তো। পরের ট্যাকায় যদি খোদার খেদমত হয়ে যায় মন্দ কী। গজবের কালে ইস্রাফিল কবি- আলেফ থামলো, গজবের সময়ে ইস্রাফিল কী বলে সেটা চট করে খুঁজে পেলো না। শ্রীকৃষ্টর হাত থেকে তামাক নিয়ে জোরে জোরে কয়েকটা টান দিয়ে সেবললো, বুঝলেন না, আমি আজ ঢোল দিয়ে বেড়াবো গাঁয়ে গাঁয়ে, রাম-চন্দ্র-শ্রীকৃষ্টরা কইছেন আমাকে কমিটির সেক্রেটারি করবি।
‘তা কন্।
কিন্তু ছিদাম এদের থেকে খানিকটা দূরে উবু হয়ে বসে মাটিতে আঁকিজুকি কাটছিলো। সে মাথা নিচু করে অন্যমনস্ক হওয়ার ভঙ্গিতে বসলেও কান দুটি সজাগ রেখেছিলো। সে বললো, দশজনে মানবি কে আপনেক, আপনি দশজনের কী করছেন?
জ্যাঠা ছেলেটির কথায় ক্রোধের উদ্রেক হয়েছিলো আলেফের। কিন্তু ক্রোধের সময় নয়। এটা। আলেফ যে-সে করে একটা হাসি টেনে আনলো মুখে, বললো, কেন্ করি নাই? শোনো নাই আমার মজিদের কথা? কেন, মক্তবটা দ্যাখো নাই?
বাপ-জ্যাঠার সম্মুখে ছিদাম চুপ করে গেলেও আলেফের বুকের পাশে সে নিয়ত খচখচ করতে থাকলো। ছিদাম যা বলেছে সেটা বোঝার বয়স আলেফের হয়েছে বৈকি।
