কিন্তু তার স্বভাবসিদ্ধ প্রথায় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আলেফ বিব্রত বোধ করলো। গত সন্ধ্যায় যে-সব আলাপ হয়েছিলো তার মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধেও অনেক কথা ছিলো। এ বিষয়ে বয়োবৃদ্ধ আলেফের তুলনায় এরফানের যুবক শ্যালক আল মাহমুদ বেশি উৎসাহ প্রকাশ করেছিলো। পরে কুটুম্বের চোখে হীন প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে ধর্ম সম্বন্ধে বেশ খানিকটা ঝোঁক দিয়েই কথা বলেছিলো আলেফ। নমাজ না করে এত সকালে আসা ভালো হয়নি।
আল মাহমুদ বেরিয়ে এলো।
সে কিছু বলার আগেই আলেফ বলে উঠলো, আজ বড়ো কাহিল লাগলো ভাই, নমাজ পড়া হলো না।
আল মাহমুদ শহরের ছেলে, যুদ্ধে গিয়েছিলো, কিছু লেখাপড়া শিখেছে। মোটরগাড়ির কাজে আছে; উচ্চাভিলাষ আছে কালক্রমে নিজে গাড়ি কিনে ভাড়া খাটাবে। সে কৌশল করে বললো, আমিও গেলাম না মসজিদে। গোসল না করে নমাজে বসতি ভালো ঠেকে না। এখানকার জলে গোসলের সাহস হলো না।
আলেফ স্বস্তি পেলো।আল মাহমুদের চায়ের বন্দোবস্ত ছিলো। চা-তামাকের সঙ্গে গল্প জমে উঠলো।
গত সন্ধ্যার আলাপের একটা বিষয়ের জের টেনে এনে আলেফ বললো, তা তোমার শহরের ফুড় কমিটির সেক্রেটারি তুমি হইছো?
শহরের না, পাড়ার কমিটির। লোকজনের দরখাস্ত নিতি হয়, পাস করতি হয়। যে যত বড়োই হোক কমিটির কাছে না আসে তেল চিনি কাপড় পাওয়ার উপায় নাই। হেঁদু পূজা করবি, তাও আমার কাছে আসতি হয়।
তুমি ভালোই করছে, আল্লা তোমার উন্নতি করবি।
আপনার গাঁয়েও তো কমিটি হবি।
কই? শুনি নাই তো।
তখন আল মাহমুদ ব্যাপারটা আর একটু খুলে বললো। সাপ্লাইয়ের এক অফিসার এসে এ বিষয়ে এরফানের সঙ্গে আলাপ করেছিলো। আল মাহমুদ নিজে এবং তার বোন অর্থাৎ এরফানের দ্বিতীয় স্ত্রী এরফানকে কমিটিতে থাকতে অনুরোধ করেছিলো, কিন্তু এরফান তাদের কথা হেসে উড়িয়ে দেয়নি শুধু বলেছে, চাষার ছেলে চাকরি করছি সেই অনেক। আলেফ বললো, তোবা, তোবা, ওর আর বুদ্ধি হবি নে। নিজের বাপ বড়োবাপকে গাল দেওয়া হয়, তা বোঝে না। কও, মামুদ।
তাছাড়া কী। হলাম বা চাষা। তা বলে কি চেরকালই চাষা। ইংরেজ আসার আগে আমরা ছিলাম ভদ্দরলোক আর হেঁদুরা ছিলো চাষা। তারা লেখাপড়া শিখলো, ইংরেজের চাকরি পালো, ভদ্দরলোক হলো, আর আমরা চাষা হলাম। এখন যদি সব চাকরি আমরা পাই, তাইলে?
কথাটা মনে লাগলো আলেফের। চৌকিতে তিনটি টোকা দিয়ে সে বললো, খুব কইছো।
আলেফ ফুর্সিতে গভীর মনঃসংযোগ করলো। চিন্তার রেখা পড়লো তার কপালে। তাজ্জব! এমন খবরটাও এরফান তার কাছে লুকিয়েছে। এরফান নিজে সেক্রেটারি হতে চায় এমন ধরনের কথা তার সম্বন্ধে আর ভাবা যায় না। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে আলেফ বললো, আমার কি মনে হয় জানো, এরফান গোল বাধাবি। সারাজীবন সেকয়ে আসছে–ছাড়ো, ছাড়ো, কাম নি। এতেও তাই কবি।
তা হবি কে? ধরেন যে, গাঁয়ের মধ্যি আপনের ছাওয়ালের মতো ছাওয়াল কার! সে কি চাষার ঘরে মানায়?
আলেফের মনে গত রাত্রিতে কিছুটা উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়েছিলো। আজ সকালেই সে দ্বিপ্রহরের মতো উত্তেজনায় পূর্ণ হয়ে উঠলো। ফুর্সিতে ঘনঘন টান দিয়ে সে বললো, তুমি এক কাম করবা ভাই, সে সময়ে আসবা।
সন্ধ্যার পর আলেফ আবার এরফানের বাড়িতে গেলো।
আল মামুদ, আছো না?
না, সে এসফন্দিয়ার গেছে তার গাড়ি চালাতি। এরফান বললো। এটা ব্যঙ্গ, তবে এরফানের বিদ্রুপে সহসা রাগ করা যায় না। আরো মসৃণ হয়েছে তার গলার স্বর, অধিকতর শান্ত হয়েছে। দৃষ্টি। সামান্য কয়েক দিনের নমাজেই এগুলি সে অর্জন করেছে।
আলেফ বললো, ঠাট্টা করে না, কুটুমকে অমন কয়ো না।
এরফান নিঃশব্দে হাসলো কিন্তু মনে মনে বললো, যদি জানতে সে আর তার ভগ্নী কেমন করে মানুষের জীবনের শান্তি ব্যাহত করতে পারে তাদের নিজেদের অন্তরের অসন্তোষ উৰ্গীৰ্ণ করে, তাহলে আমার এই বিদ্রূপকে তোমার প্রশ্রয় বলেই বোধ হতো।
আলেফ বললো, একটা কামে আলাম। খবর শুনছো না?
রোজই শুনতিছি, কোনটা কও?
কমিটি নাকি কী হবি?
হবি তো এই মাসেই।
তাইলে সেক্রেটারি কে হয়?
এরফান সহসা হো হো করে হেসে উঠলো।
যেন কিছুই হয়নি, যেন কিছুমাত্র বিচলিত হয়নি সে, এমনি মুখ করে ফুর্সিটা ঘুরিয়ে নিয়ে নিবিষ্টভাবে ধূম্রজাল রচনা করতে লাগলো আলেফ। এরফানের হাসি থামলে অবশেষে সে বললো, একটা কথা আজ কবো তোমাক। ছাওয়ালের কথা ভাবো? কি বলো ভাবো না?
তা ভাবি, বংশের তো ঐ একই ছাওয়াল। কিন্তুক এ কথা আজ হঠাৎ তোলো কে?
না, তুলি না। ভাবে দেখো, তাই কই। শহর কৈলকাতায় পড়ে তোমার ছাওয়াল। তাক হাকিম-হেকিম করবের চাও। আমার কী দুঃখ যদি বাপ বলে না মানে। কিন্তুক তোমাকেও যদি চাচা গণ্য না করে?
কও কী? এরফান মৃদুমন্দ হাসতে লাগলো।
আলেফ বুঝতে পারলো যুক্তিটা বানচাল হয়ে গেলো।
সে এবার সোজাসুজি কথাটার অবতারণা করলো, তাইলে তুমি সেক্রেটারি হও।
না, ঝামেলা।
তাইলে আমাক হতি হয়।
সে তো মামুদের কথাতে বুঝছি। কিন্তুক গাঁয়ের লোক তোমাক সেক্রেটারি করে কেন?
আলেফ খুব তাড়াতাড়ি একটা প্রত্যুত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেলো। ভাবলো, তাই তো, কী জন্য গ্রামের লোকরা বিশেষ একজনকে মনোনীত করে ঠাহর হচ্ছে না। সে করুণ করে বললো, তুমি আমি দুজনে চেষ্টা করলি চরনকাশির ভোট তো পাবোই। আল মাহমুদ আসবি, সেও চেষ্টা করবি। যদি কও, ছাওয়ালেক ডাকি, সেও দু’চার কথা কবের পারবি। কেন্ এরফান, চেষ্টা করবা না?
