এরফানকে বলতে ভরসা হয় না। সে হয়তো হাসতে হাসতে বলবে, কে, বড়োভাই,ব্যালে কামড় বসাইছো?
দুতিনদিন চিন্তা করে আলেফ আল মাহমুদকে চিঠি লিখলো : অপর এথা সকল মঙ্গল জানিবা। পরে সমাচার এই, তুমি খৎ পাইয়াই চলিয়া আসিবা। কমিটি এ মাহিনাতেই হইবে। তুমি না আসা ত আমার কোনো গতি নাই।
আল মাহমুদ যে এসব ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী সেটা বোঝা গেলো। চিঠি পাওয়ার দুদিন পরেই নিজের কাজকর্ম ফেলে সে চরনকাশিতে এলো। প্রথম দিনটা সে এবাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ালো, দ্বিতীয় দিনের প্রত্যুষে সে আলেফের মসজিদে জমায়েত ডাকলো।
জন পঞ্চাশ লোক এসেছে। কৌতুকপ্রবণ চাষীদের গালগল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উঠে আল মাহমুদ বললো, ভাইসব, আপনাদেক একটা কথা কবো। এই সুরে বাংলার মালেক হতেছি আমরা মোসলমানরা। ইংরেজ আমাদেক দাবানের জন্য রাজ্য কাড়ে নিয়ে হেঁদুকে বড়ো করছিলো। এতদিনে ইংরেজরা বুঝছে সরকার চালাবের ক্ষমতা হেঁদুর নাই। তাই এখন আমাদের ডাকে নিয়ে রাজ্য চালাবের কইছে। আপনেরা গৈগাঁয়ে থাকে খবর পান না, কৈলকাতা নামে এক শহরে আমরা হেঁদুদেক দাবায়ে দিছি। আমাদের মোসলমান উজির আপনাদেক ত্যাল, কাপড়, চিনি পরাবি। তা কন, মাঝখানে হেঁদুক আসবের দেওয়া কেন্? আমাদের সেখসাহেব এই মজিদ করছে। তার মতো বড়ো মোসলমান কে আছে? মোসলমানদের মধ্যি তার বড়ো কে? তাই কই, চিরকাল ঘেঁদুর দাবে না থাকে, ভাইসব, মাথা উঁচু করে ওঠেন। সেখসাহেবেক কমিটির সেক্রটারি বানান।
শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। অধিকাংশই পরস্পরের কাছে আল মাহমুদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলো।
ফিরতি পথে তাদের কেউ কেউ আলোচনা করলো, তাইলে কমিটি তোমার হেলাফেলার না।
না বোধায়।
ভাবেচিন্তে কাম করা লাগে, মামু। কইছিলাম সেখসাহেবেক সেক্রেটারি করবো। সে কথাও আবার ভাবে দেখা লাগে।
কিন্তু আল মাহমুদ চালে একটা ভুল করে বসলো। তার জমায়েতের কথা যখন তিনখানি গ্রামে আলোচ্য হয়ে উঠেছে, যখন আলেফ সেখের নাম লোকের মুখে মুখে ফিরছে, বোড়ের কিস্তি দিয়ে বসলো সে তেরচামুখো ঘোড়ার পথে লক্ষ্য না রেখে। হাজিসাহেবের নাকের নিচে সানিকদিয়ারে তার বাড়ির লাগোয়া মসজিদে নমাজের পরে এক জমায়েত ডেকে বসলো সে।
জমায়েত ভাঙলে হাজিসাহেব আলেফ সেখকে কাছে ডাকলেন।
ছাওয়ালডা কে?
আলেফের মনে খুশি ছিলো। বিগলিত স্বরে সে বললো, জে, আমার ভাই এরফানের কুটুম। উয়ের শহরে ও কমিটির সেক্রেটারি হইছে।
ভালো, ভালো।
আলেফ উৎসাহিত হয়ে বললো, ও খুব ধরছে আমাকে, কয় যে, আপনেও সেক্রেটারি হন গাঁয়ের।
ভালো। কিন্তুক একটা কথা ও চ্যাংড়ামানুষ বুঝবের পারে নাই, তুমি ওক বোঝাও নাই কে? গাঁয়ে সেক্রেটারি হবা ভালো, কিন্তু বাইরের লোক আসে কে? আর কৈলকাতা খেস্টান শহরের কথা এখানে কে?
আলেফের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো। সে আশেপাশে চেয়ে দেখলো বহু কান উৎকর্ণ হয়ে, শুনছে হাজিসাহেবের কথা, বহু দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে হাজিসাহেবের উন্নীত তর্জনীর দিকে।
হাজিসাহেব বললেন, সবার মালিক সিরাজদেল্লার কথা কলো। কও, সে বিপদ তো অন্য দেশের লোক আসে। কয় যে তোমরা পাঁচ হাজার কয় শ আর হেঁদুরা চার হাজার কয়শ। তা হউক, হেঁদুক দাবাবা কে? আর তারা কী দাববি? হেঁদুর ছাওয়াল ইংরেজেক দাবায়। তোমার ঐ পাঁচে আর চারে নয় হাজারে দাঙ্গায় যদি ইংরেজ-দাবানো হেঁদুর ছাওয়াল ভেড়ে, তবে তোমার এক হাজার বেশি কী করে? তোবা! তুমি সেক্রেটারি হবা কিন্তু আদমজাদেক পয়মাল করবা কে?
বাড়িতে ফিরে আলেফ গুম হয়ে বসে রইলো।
পরদিন আলেফ আল মাহমুদকে বললো, দ্যাখো, ভাইসাহেব, ও কাম কোরো না।
বিস্মিত ব্যথিত আল মাহমুদ বললো, কন্কী, কেন্? ঘাটে ভিড়ানো নৌকা ডুবায়ে সাঁতার পানি?
গাঁয়ের লোক বুঝবের পারে না।
ইন্সে আল্লা। বোঝাবো, বুঝায়ে আমি ছাড়বো। আমি লীগের কাম করি।
আল মাহমুদের বেরুবার পোশাক পরাই ছিলো, সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এখন আপনার সাথে মেলা কথা কবার টাইম নাই।
যাও কোথায়?
চিকন্দিতে জমায়েত হবি। সান্যালগরে বাড়ির গেটে খানটুক্ জমি আছে সেখানে হবি।
আহা, করো কি?
আপনে না চাইলেও আমার কাম চলবি, এ লীগের কাম।
সে চলে যেতে বিতৃষ্ণায় আলেফ কালো হয়ে উঠলো। সময়ের সঙ্গে দুর্ভাবনা এলো। কিছুটা সময় ধরে আল মাহমুদের রক্তাক্ত আহত দেহ তার কল্পনায় ভাসতে লাগলো।শহরের ভদ্রব্যক্তি বলতে যে নির্জীব শ্রেণীকে বোঝায় তেমন নয় সান্যালরা।
দুপুরের রোদ পড়ে গেলে আলেফ তার মসজিদের সম্মুখে এক টুকরো ছায়াশীতল মাটিতে বসে তার ভাগ্যের কথা ভাবছিলো। কী আশ্চর্য, সবই কি, সকলেই কি তার বিরুদ্ধে যাবে? এই দ্যাখো আল মাহমুদকে সে ডেকে নিয়ে এলো, এখন সে-ই হলো পরম শত্রু। জ্যামুক্ত শরের মতো, সামুদ্রিক কলসের দৈত্যের মতো তাকেও আর বশে আনা যাবে না। এইটাই বাকি ছিলো-সান্যালমশাইয়ের সঙ্গে অকারণ প্রাণক্ষয়ী বিবাদ খুঁজে বার করা।
নির্বাক নিস্তব্ধ মসজিদের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আলেফের প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠলো। প্রাণের সবটুকু বেদনা কারো কাছে বলার ইচ্ছা হলো তার। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে প্রথমে মসজিদের বাঁধানো চত্বরে উঠে দাঁড়ালো, তারপর ধূলিভরা পায়ে মসজিদের দরজার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। অশুচি অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করতে দ্বিধা হলো, কিন্তু নিজে যে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সেখানে প্রবেশ করার দ্বিধা সহজেই সে জয় করতে পারলো। মসজিদের দূরতম কোণটি প্রায় অন্ধকার। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার দীর্ঘনিশ্বাস পড়লো। তারপর তার বেদনা ভাষা পেলো। বললো সে, খোদা, আমি কী অন্যাই করছি, কও? কমিটির সেক্রেটারি হবের চাই, তা কি গুনাহ্? এই দ্যাখো, আল মাহমুদ কী বিপদে ফেলালো আমাকে। বুক ভাঙে যাতেছে আমার। আর কেউ না বুঝুক, তুমি তো বোঝো? খোদা রহমান, আমার জন্যি কি কমিটির সেক্রেটারি নাজেল-মঞ্জুর করবা না? আর তা যদি না করো তবে আমি যে তোমার কাছে এত কথা কলাম সে যেন কেউ না জানে। আর আল মামুদ যেসব কথা কতিছে সেসব লোকের। প্রাণের থিকে মুছে দেও।
