অল্পবয়সী ধাত্রী, পরীক্ষা দিয়ে পাস করা শুনেই তার উপরে নির্ভর করা যায়। নমস্কার করে সে হেসে বললো, আমি আবার এলাম।
আসুন।
মনসাদিদির চিঠি পেয়েই ভাবছিলাম আসি আসি, কালকের ডাকে গিন্নীমার পত্র পেলাম। দেখতে মনে হয় ভালোই আছেন। আপনি কী বলেন?
সুমিতির মনের কুণ্ঠিত অবস্থায় একটি-দুটি এক শব্দের বাক্য রচনা করার বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলো না। সে রক্তহীনের মতো হেসে বললো, কী বলবো?
ধাত্রী বললো, সে যা বলার আমিই কাল বলবো, এখন মনে হচ্ছে আর একটু কায়িক পরিশ্রম করা দরকার। আপনি বেড়াতে ভালোবাসেন তো? তা হলেই হলো।
সুমিতি কথা বাড়ালো না। ধাত্রী এখানে আসতে পেরে যেন খুশি হয়েছে। সে এ কথা ও কথা তুলে কিছুক্ষণ আলাপ করলো।
ধাত্রী চলে গেলে সুমিতি ভাবলো, এ ভালোই হলো। এভাবে যদি অনসূয়া না আসতেন, এইসব ব্যবস্থার সূচনা না করতেন, তবে তাকে নিজের সম্বন্ধে আর একটি সিদ্ধান্ত নিতে হতো। এক্ষেত্রে সেটা ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো। এটা শহর নয়, মোটর নিয়ে বেরিয়ে পড়লে পথের মোড়ে ক্লিনিক পাওয়া যায় না।
এরপরে আবার লজ্জা এসে তাকে আবৃত করলো। এরপর থেকে সকলের চোখে যে প্রশ্ন কিংবা কৌতূহল প্রকাশ পাবে সেটা যেন এখনই সে সর্বাঙ্গে অনুভব করলো। এ বাড়িতে আসবার পরই যে কুণ্ঠা তাকে নিয়ত বিব্রত করতো, কিছুদিন চাপা থাকার পরে এখন যেন সেটা আবার আত্মপ্রকাশ করলো।
মনসা রহস্যছলে যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলো তাছাড়া আর কেউ কখনও তাকে প্রশ্ন করেনি। অবহেলাও তাকে কেউ করেনি। তার ব্যক্তিগত সুখসুবিধার দিকে একাধিক দাসদাসীর সতর্ক দৃষ্টি নিযুক্ত আছে। তার ব্যক্তিগত পরিচারিকাটি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। সবসময়েই সে ডাক শোনার প্রতীক্ষায় আছে, কিন্তু সম্মুখে এসে যখন দাঁড়ায় নিজে থেকে, মনে হবে যেন ঘটনাটা আকস্মিক। হয়তো সুমিতি বিকেলের দিকে লাইব্রেরিতে যাচ্ছে, পরিচারিকা যেন শূন্য থেকে আত্মপ্রকাশ করে বললো, বিড়োবউদি, আজকাল তো এমন সময়ে আপনারা চা খেতেন মাঝে মাঝে, আনবো?
না, সেটা মনসার খেয়ালে হতো।
পরিচারিকাটি তখন সুমিতির একখানা শাড়ি আলসে থেকে তুলে নিয়ে কেঁচাতে-কেঁচাতে চলে গেলো, যেন এ কাজটার জন্যই এদিকে সে এসেছিলো।
ধাত্রী এসেছে। এবং সুমিতি এখন থেকে আন্দাজ করছে এরা সে ব্যাপারটাকে অবলম্বন করেও একটাউৎসবের আয়োজন করবে। সর্বত্র না-হলেও সে উৎসবে কোথাও কোথাও গভীর আনন্দ বিচ্ছুরিত হবে। তার সন্তানকেও কেউ হয়তো অবহেলা করবে না।
সেদিন রূপুর সঙ্গে দেখা হলো সিঁড়ির গোড়ায়। রূপু অনেক সময়ে পৃথিবীর অনেক সুখবর ও আনন্দ বহন করে আনে। আজও তার মুখচোখ হাসিমাখা। সুমিতি প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়ালো।
রূপু দূর থেকেই বললো, কংগ্রাচুলেসনস্ সিস্টার সু।
কী হলো?
রূপু এত আনন্দের কারণ, এতখানি বিচলিত হওয়ার কারণ বহুদিন পায়নি। দিদিকে যেমন ছোটো ভাই জড়িয়ে ধরতে পারে তেমনি করে সে সুমিতিকে বাহুবেষ্টনে ধরে বললো, তুমি ভালো, কিন্তু এত ভালো আমি জানতাম না। এত ভালো তুমি? এতদিনে যা হোক কিছু একটা হবে এ বাড়িতে।
সুমিতি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু প্রশ্নগুলো নিজের মনে উঠছে আবার নতুন করে। আর পুরনো প্রশ্ন নতুন করে উঠলে প্রায় নতুন চেহারা নেয়। তার বিবাহটা এরকম হলো কেন তা কি আবার প্রশ্ন? সব বিষয়ে যারা অগ্রসর চিন্তার পরিপোষক তারা বিবাহের মতো ব্যাপারে, যা মনসার ভাষায় এক বিপ্লব, মন্ত্রোচ্চারণ এবং ক্রিয়াকাণ্ড, যাতে তাদের বিশ্বাস নেই মেনে নেবে কেন? মানেনি কারণ মানা যুক্তিসঙ্গত নয়। কাউকে আঘাত করার কথা দূরে থাক, কারো কথা চিন্তা করার অবকাশ ছিলো না। আর সেভাবেই তো প্রমাণ করা সম্ভব কারো বাকি জীবনটা আধুনিক থাকবে কিনা।
সুমিতি মনে মনে যেন মনসার সঙ্গে কথা বললো, হ্যাঁ, মণিদিদি, তোমার তুলনাটা হয়তো আমার পক্ষেও খাটে। গর্গার জীবন আর তার ছবি আঁকা এক হয়ে গিয়েছিলো, তোমার জীবন আর সংসার মিলে একটামাত্র নাটক হয়তো যা তুমি রচনা করছে; তেমনি কারো জীবন আর একটা গ্রাম তো এক হয়ে যেতে পারে। কেউ যদি এই গোটা গ্রামটাকেই তার সংসার করে নিতে চায়? তুমি বলবে, নতুন কি? আকাশে বাতাসে এখন গ্রামে ফেরা, গ্রামকে স্বাবলম্বী করার কথা।
সুমিতির মুখে নিঃশব্দ হাসি দেখা গেলো। সে মনে মনে বললো, মণি, না হয় বলো সেই জার্মান ভদ্রলোকের কথা, যিনি কঙ্গোর গ্রামে গিয়ে বাস করছেন। একটু পরে সে আবার তেমন করেই মনে মনে বললো, হয়তো কেউ টেনিস র্যাকেট ত্যাগ করেছে; হয়তো কারো সেই বহু অটেভের অর্গান, যাকে তুমি চার্চ অর্গানের মতো প্রকাণ্ড বলেছে, তা আর কাজে লাগে না; হয়তো গোটা গ্রামটার দারিদ্র্য আর অজ্ঞতার চাপে অন্য কেউ অকালবৃদ্ধা হবে, ততদিন আমার স্বামীর গ্রামটাকেও আমাকে ভালোবাসতে দিও।
কিন্তু সুমিতির চিন্তা সহসা প্রায় আর্ত হলো।
সুকৃতি তার নিজের বোন। কাল্পনিক একটা কলঙ্কের মিথ্যা রটনা থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সে যা করেছিলো তাতে সবরকমেই আত্মহত্যা হয়েছে। অথচ সে নিজে কলঙ্কের–অন্তত এদের চোখে তো বটেই এবং কলঙ্ক মানেই প্রতিবেশীর দৃষ্টিভঙ্গি–উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে এ বাড়িতে এসে উঠেছে। সুকৃতি যে কালের প্রতিভূ সেটা গত হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র কালই কি? সুকৃতিকে যেমন সে সৃষ্টি করেছিলো তেমনি কি আমাকেও করছে?
২২. এরফানের শালা এসেছে
এরফানের শালা এসেছে। তার সঙ্গে গত সন্ধ্যার আলাপের মুলতবী অংশটুকু শেষ করে নিতে অতি প্রত্যুষে আলেফ সেখ ছোটোভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। এরফানের শালা আল মাহমুদ অনেক জানে-শোনে। তার কাছেই আলেফ জানতে পেরেছে তার মতো গ্রাম্য লোকদের ছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয়রা চিন্তা করছেন। পুত্রের ভবিষ্যতের কল্পনায় সুখী হয় না এমন পিতা পৃথিবীতে কে আছে?
