তিনি স্থির করলেন–অবশ্য এটার অন্য দিকও আছে। ছেলেরা বড়ো হয়ে উঠলে তাদের রুচি ও প্রকৃতি পৃথক হতে পারে। তখন তাদের পৃথক স্বয়ংপূর্ণ জীবনের প্রতি আকর্ষণ দেখা দিতে পারে। বাড়িটা তৈরি হোক যেমন অনসূয়া বলছে। যদি ওরা এই পুরনো বাড়িতেই থাকতে চায় নতুন বাংলোটা অন্য কোনো ব্যবহারে আসবে। মানুষের একাধিক বাড়ি থাকতে নেই এমন নয়।
অন্দরমহলের উঠোনে নামার সিঁড়ির মুখে থমকে দাঁড়ালেন অনসূয়া। নিজেকে নিয়ে সেই প্রথম জীবনের পরে আর কবে এমন বিস্মৃত হয়েছেন? এ কী করে এলেন তিনি? কী ভাবলেন উনি? আমি কি ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় পেয়ে এমন করে সুমিতিকে পৃথক করে দিচ্ছি? তার কি বলা উচিত ছিলো, এই বাড়ির প্রতিষ্ঠা সুমিতিকে দিয়ে আমার আর তোমার জন্য ছোট্ট একটা বাড়ি করো–এরপরে এত বড় একটা বাড়িকে গুছিয়ে রাখতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়বো?
সদানন্দ এলো।
কিছু বলবে নাকি?
বলবার ছিলো, কিছুদিন যাবৎ আপনাকে পাচ্ছি না।
কী রকম? সান্যালমশাই হাসলেন, কতদিন থেকে পাচ্ছো না?
যেদিন থেকে চারুর দল আপনাকে দখল করেছে।
স্কুলের জন্য টাকা চাই?
না। এবার সদরে গিয়ে কথা বলে এসেছি। কমিটি করে দেবো। সরকার থেকে সাহায্য দিয়ে চালাক।
মতের পরিবর্তন করলে যেন।
বহুদিন আগেই করা উচিত ছিলো। শহরের স্কুলে পড়ে ছেলেরা শহরে থাকছে, গ্রামের স্কুলে পড়েও তারা শহরমুখো হচ্ছে। স্কুল করা মানে গ্রামের বুদ্ধিমান ছেলেদের শহরের দিকে লুব্ধ করা। তাই যদি হবে তবে আর বোঝা বয়ে মরি কেন?
এমন কথা কোনো শিক্ষক বলতে পারে বলে ধারণা করিনি। আপাতত কী ঘটেছে?
রূপুকে ম্যাট্রিক দেওয়াবো কিনা এ-বিষয়ে আলাপ করতে চাই।
এতদিন কী স্থির ছিলো? কেম্ব্রিজের কোর্সে পরীক্ষা দেওয়ার পর কী-একটা হবে, এরকম যেন শুনেছিলাম তোমার মায়ের কাছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ। সেরকমই ছিলো। কিন্তু ভাবছি এদেশের ইতিহাসটার উপরে জোর দেওয়া যায় কি না। মাও বলেছিলেন বটে প্রাচীনের কথা।
এ সম্বন্ধে কি খুব তাড়াতাড়ি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো দরকার?
দু’এক মাসের মধ্যে দরকার হবে।
দু মাস পরে আলাপ করলে হয়?
সদানন্দ হেসে বললো, চারু বোধহয় এখন আসবে?
অন্তত সাময়িক একটা পরিবর্তন যে হয়েছে সান্যালমশাইয়ের জীবনভঙ্গিতে এটা আর গোপন নেই। তার সঙ্গে সঙ্গে তার কর্মচারীদেরও কাজ বেড়েছে। তাদের কাউকে কাউকে একটু বেশি দ্রুতগামী হতে হয়েছে, এবং কারো কারো জীবনধারায় রদবদল হয়েছে।
নায়েব একদিন হন্তদন্ত হয়ে বেরুচ্ছে। তার স্ত্রী বললো, এমন ছুটোছুটি কি এ বয়সে চলে? শরীর শুকিয়ে গেলো যে।
গেলেও উপায় নেই। জামা গায়ে দিতে দিতে নায়েব বললো।
কিছুদিন থেকেই এরকম হয়েছে। কাজ যেন বেড়েই যাচ্ছে।
বাড়াকমা কিছু নেই। বিলমহলে কর্তা নিজে যাওয়ার আগে আমার যাওয়া দরকার। মামার মুখে শুনেছি বিলমহলের দাপটেই তিনি চাকরি ছেড়ে আমাকে বহাল করেছিলেন।
সেখানে কী হচ্ছে এখন, তহসিলদাররা পারে না?
সাহস পায় না। আমিও যে খুব পাই তা নয়। গুলবাঘ দিয়ে জমি চাষ করানো, বুঝতেই পারো।
রসিকতা রাখো।
গৃহিণীর হাত থেকে শরবৎ নিয়ে নায়েব বললো, তোমার জেনে রাখা ভালো বলেই বললাম। সেখানকার চাষীদের গুলবাঘ না বলে গণ্ডারও বলা যায়। তাদের দিয়ে বিল দখল করতে যাচ্ছি।
এমন বিপদের কাজে হাত দিচ্ছো, কর্তা মত দিয়েছেন?
এটা কর্তারই বুদ্ধি। এই ফিকিরেই ত্রিশ বছর আগে হাজার বিঘা খাসজমি বিল থেকে উদ্ধার করেছিলেন। নিজে যা করেছিলেন আমি এখন সেটা করলে খুব একটা রাগ করতে পারবেন না। যদি নিষেধ করেন হুকুম ফিরিয়ে নেবো। না করেই বা উপায় কী? লাখ টাকা খরচ হবে এই চৈত্রের আগে। টাকা আনি কোথা থেকে, যদি জমি না বাড়াই?
স্ত্রীর হাত থেকে পান নিয়ে নায়েব রওনা হলো। পাল্কি খাড়া ছিলো। সে বললো, তেমাথায় থাকগে যা। গাঁয়ের মধ্যে আর পাল্কিতে চড়াস নে, লোকে হাসাহাসি করবে’ নায়েবের লোকজন পাল্কি নিয়ে চলে গেলো। নায়েব হাঁটতে হাঁটতে চারুর বাড়ির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো।
চারু বাড়িতে ছিলো। সে বেরিয়ে এলে নায়েব বললো, এদিক থেকে ছুটি নিয়ে একবার বিলমহলে যেতে হয়। জমি দখল করতে হবে।
সর্বনাশ! মারপিট নাকি?
তার চাইতেও বেশি। বিল থেকে জমি কেড়ে আনতে হবে।
সে তো বিলমহলের লোকরা করে শুনেছি, খাল কেটে, পাড় বেঁধে নৌকো দিয়ে জল ঘেঁচে।
তা করে। গত ত্রিশ বছরে নিজেদের বুদ্ধিতে একশ ঘর বর্গাদার তিনশ বিঘা নিয়েছে। আমি যে এক বছরে হাজার বিঘা চাই। নিজেদের মাইনা বাড়িয়ে নিয়েই তো বিপদে ফেললে। বছরে বারো হাজার টাকা খরচ বাড়ালে। এখন চলো দেখি, বাঁধটা কীভাবে দিলে ছোটো বাঁধে বড়ো কাজ হয়। আর তোমার সেই কী যন্ত্র আছে, পুকুরের জল তুলে ফেলতে, সেটাও চাই।
কর্তাকে বলে রাখবেন, যাওয়া যাবে।
নায়েবমশাই হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করলো, মাঝখানে দীর্ঘদিন সান্যালমশাই ধীরস্থির হয়েছিলেন বটে কিন্তু বিশ-বাইশ বছরের যে লোকটি শুধুমাত্র বন্দুক সম্বল করে বিলমহল শাসন করেছিলো, আর সেই শাসিত বিলমহল দিয়ে বিলকেও শাসন করেছিলো তার মূলগত পরিবর্তন আশা করাই অন্যায়। টাকার প্রয়োজন হওয়ামাত্র তিনি নিজেই বিলমহলে গিয়ে উপস্থিত হতে পারেন।
.
এক সন্ধ্যাবেলায় পরিচিত গলার শব্দে সুমিতি অবাক হলো। ধাত্রী দাসীকে দরজার কাছে বিদায় দিয়ে একা একা এলো ঘরে। তার বেশভূষার ঢিলেঢালা ভাব দেখে বোঝা যায় অনেকটা সময় আগেই সে এসেছে।
