তাই তো বলেছিলাম সদানন্দকে।
সদানন্দ তার হসপিটালের চাকরির কথায় বলছিলো, ওর তেমন ইচ্ছা নেই চাকরিতে ফিরে যাওয়ার।
নিজে প্র্যাক্টিশ করতে চায়?
তোমার একখানা সার্টিফিকেট পেলে সুবিধাই হবে ওর। কিন্তু সদানন্দ দেখলাম ওর অনেক খোঁজখবর রাখে। শুনলাম নাকি মেয়েটি দু-তিন বছর হলো খৃস্টান হয়েছে। হিন্দু সমাজে নাকি ফিরবার উপায় ছিলো না। ইতিমধ্যে নাকি একদিন আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলো, সদরে নাকি এ নিয়ে হৈচৈ হয়েছিলো।
সদানন্দ এত খবর নিচ্ছে কেন? ধাত্রী তার কাজ ফুরুলে চলে যাবে।
সান্যালমশাই বললেন, সদানন্দর কাছে খবরগুলি আপনা থেকেই এসেছে। সদরে এসব মুখরোচক সংবাদ, বুঝতেই পারো।
উত্তর দেওয়ার আগে অনসূয়াকে কুণ্ঠা কাটাতে হলো, তিনি বললেন, এরকম আলাপে আমি অভ্যস্ত নই, তুমি কোনদিকে এগোচ্ছো ধরতে পারছি না।
সান্যালমশাই বললেন, এইসব পরিচয়ের পরেও কি তাকে তুমি দীর্ঘদিন বাড়িতে রাখতে রাজী আছো?
কাজ মেটা পর্যন্ত বলছো?
না। আমি ভাবছিলাম শিশুটিকে মানুষ করার জন্যে যদি ওকে রেখে দেওয়া যায়, কেমন হয় তাহলে?
সুমিতি কি পারবে না? মনসা তো নিজেই পারবে।
সান্যালমশাই একটু চিন্তা করে বললেন, তা হয় না এমন নয়। সেকথা যদি বলো পৃথিবীতে এমন অনেক জিনিস আছে যা না হলেও চলে কিন্তু পেলে সুবিধা হয়। গভর্নের্স বা নার্স যা-ই রাখতে চাও সেটা নিরক্ষর আয়ার চাইতে ভালো। আর তাছাড়া এই ধাত্রী-মেয়েটিও তার নিঃসঙ্গজীবনে একটি বলিষ্ঠ আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে বলে মনে হয়েছে আমার–এই জন্যেই তার পরিচয় দিলাম।
অনসূয়া কিছুকাল নীরব থেকে বললেন, আমি বুঝতে পারছি এটা একটা পরিকল্পনা যার সব দিক চিন্তা করে তুমি এগিয়েছে।
কিন্তু সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটা তোমার মতের অপেক্ষা রাখে। যদি সংগত বোধ করো তাকে কথায় কথায় জানিয়ে রাখতে পারো, তুমি নাতিদের জনে গভর্নেস রাখবে।
অনসূয়ার হাসিটা হঠাৎ প্রকাশ পেলো বটে কিন্তু কয়েক মুহূর্ত থেকেই মনে মনে এটার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন; তিনি হাসিমুখে বললেন, গভর্নেসের জন্য ঘরদোর, নাতিদের নার্সারি, এসবও নিশ্চয় তোমার পরিকল্পনায় আছে?
একটু সলজ্জভাবেই ড্রয়ার থেকে ব্লুপ্রিন্ট বার করলেন সান্যালমশাই। হাতে একটা পয়েন্টার নিয়ে ব্লুপ্রিন্টে একটি জায়গা উদ্দিষ্ট করে বললেন, এঞ্জিনিয়ার বলছে এদিকটায় দোতলা তোলা যাবে না, চুন-সুরকির পুরনো দিনের গাঁথুনির উপরে দোতলা তোলা নিরাপদ বলে মনে হয় না। সিমেন্ট কংক্রিট এবং লোহা দিয়ে সম্পূর্ণ একটা ব্লক তৈরি করতে চায় সে, এটাকে ভেঙে ফেলে।
অনসূয়া অনেকটা সময় ভাবলেন, তারপর ধীরে ধীরে প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বললেন, আমার শ্বশুরের সময়ের এই চুন-সুরকির গাঁথুনি আমার জীবনকালে স্থায়ী হবে এই আমার বিশ্বাস। তোমার বাগানটা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বড়ো। যদি মনে করো নতুন ধরনের কিছু দরকার, কংক্রিটের ক্যাটালগ এনে যথেষ্ট পরিমাণে কাঁচ ও হাল্কা ধরনের আসবাব দিয়ে একটা বাংলোবাড়ি তৈরি করো।
কথা বলতে বলতে প্রিন্টের উত্তর দিকটা অনসূয়া দেখিয়ে দিলেন, বললেন, সুমিতির পক্ষে এই নতুন বাড়িটাই আরামপ্রদ হবে। মনের সঙ্গে মিলবে। সেখানে নার্সারি হোক, গভর্নেসের ঘর।
সোনার চশমার আড়ালে অনসূয়ার চোখ দুটির চেহারা কিরকম হলো দেখবার জন্য চোখ তুললেন সান্যালমশাই, কিন্তু অনসূয়ার চোখে কাঠিন্যের কোনো ছাপ এসে থাকলেও ততক্ষণ সেটা সেখানে ছিলো না।
সান্যালমশাই বিস্মিত হলেন, কিন্তু সে বিস্ময় তার ভাষায় প্রকাশ পেলো না। তিনি বললেন, তোমার দুই ছেলে, অনু, তুমি কি দুখানা নতুন বাড়ির কথা চিন্তা করছো?
না, আপাতত একটি হোক।
কথাটা আগে বলোনি।
অসুবিধা হবে?
না, না। সান্যালমশাই হাসলেন, নতুন করে ব্লুপ্রিন্ট করাতে হবে।
কিছুকাল দুজনে নীরবে বসে রইলেন। তারপরে অন্য কথা হলো, অনসূয়াই নিয়ে গেলেন সেদিকে। তারপর তিনি কাজে গেলেন।
খানিকটা নীরব অবকাশে সান্যালমশাই আবার বিস্ময়ে তলিয়ে গেলেন। যে অনসূয়াকে এতদিন ধরে চিনে এসেছেন এ যেন সে নয়। কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণের ভঙ্গিটা এতদূর বিশিষ্ট যে, প্রায় আট-দশ বৎসরের পুরনো একটা সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেলো সান্যালমশাইয়ের। এই গ্রামের রায়বংশের ছেলে মন্মথ রায় তার সমবয়সী এবং কলকাতার কলেজের সহপাঠী। তিনি এসেছিলেন গ্রামে; নিজের জমিজমার বন্দোবস্ত করাই উদ্দেশ্য ছিলো। শিকারের প্রস্তাব এসেছিলো। বোটে করে বিলে বিলে ঘুরে পাখি শিকার হচ্ছিলো ( কোনো সন্ধ্যায় তারা ফিরতেন, কখনো বোটে রাত কাটতো। একদিন আকস্মিকভাবে সদানন্দ উপস্থিত বিলের ধারে। তার হাতে সিলমোহরকরা চিঠি। তাতে লেখা ছিলো তোমার একবার আসা দরকার। একথা কয়েকটি আষ্টেপৃষ্ঠে সিলমোহরে আটকানো। কী ব্যাপার বলে স্ত্রীর সম্মুখে হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সান্যালমশাই। অনসূয়া ঠিক কি কথাগুলি বলেছিলেন এতদিন পরে তা উদ্ধৃত করা যায় না, কিন্তু তাতে ছেলের বড়ো হওয়ার কথা ছিলো, এবংনৃশংসতা মানুষকে শুধুহৃদয়হীন করে তোলে না, তার শুভবুদ্ধিকেও আড়ষ্ট করে, রুচিকে তামসিক করে–এরকম কিছু বক্তব্য ছিলো। কিন্তু বক্তব্যের চাইতে ভঙ্গিতেই বেশি কাঠিন্য ছিলো। মর্মরের মতো মোলায়েম, শীতলস্পর্শ, সুন্দর, কিন্তু পাথরও বটে। শিকার বন্ধ হয়েছিলো। কিন্তু, বলে ভাবলেন সান্যালমশাই–ওদের পৃথক করে দেবো?
