সুমিতি জানলার গোড়ায় একটা সোফায় বসে ছিলো। সোফাটার পিঠের আড়াল থেকে সুমিতিকে দেখা যায়নি। অনসূয়া ফিরতে গিয়ে তাকে দেখতে পেলেন।
সমিতি!
সাড়া দিয়ে সুমিতি উঠে দাঁড়ালো।
অনসূয়া এগিয়ে গিয়ে সুমিতির সোফাটায় বসে তাকেও বসতে বললেন। অনসূয়া বললেন, ধাত্রীকে এখন খবর দেওয়া দরকার। সে এসে থাকুক এখানে, কি বলল? অকস্মাৎকথাটা শুনে সুমিতি লজ্জায় সিঁদুরমাখা হয়ে গেলো। সোজা হয়ে বসে থেকে যতদূর সম্ভব মুখ নামানো যায় তেমনি করে সে নিচের দিকে চেয়ে রইলো। তার স্বামীর মায়ের পক্ষে এমন প্রশ্ন তো খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যহ দেখা হয় না বলে প্রশ্নটা এতদিন ওঠেনি। সংকোচে ও কুণ্ঠায় মনসাকে সে ঘোষণা থেকে নিরত করেছিলো বলে বাড়ির সর্বত্র প্রচারিত হয়নি। কিন্তু যে দাসী তার ব্যক্তিগত হয়ে দাঁড়িয়েছে তার চোখেই হয়তো ধরা পড়েছে। ধাত্রীর চোখে ধরা না পড়লেই অবাক হতে হতো। অনসূয়া বললেন, প্রথম সন্তান কিনা, তাই একটু সাবধানে থাকতে হয়। তুমি কি এখানেই থাকবে?
কিন্তু সুমিতি কোথায় থাকবে এ প্রশ্নটা করা তার উচিত হয়নি। প্রথম কথা ওই যে, এই মেয়েটি অন্য সব বিষয়ে যত অভিজ্ঞ হোক, সন্তানবহন এই প্রথম করছে, এবং তার পক্ষে কোন অবস্থায় কী করা সম্ভব এবং নিরাপদ এটা অনসূয়ারই বলে দেওয়ার কথা। দ্বিতীয় কথা, তাদের কলকাতার বাড়িতে এখন কারা আছে এবং তাদের পক্ষে এমন একটি দায়িত্ব গ্রহণ করা সম্ভব কিনা সেটাও চিন্তা করে দেখা দরকার।
সেজন্য অনসূয়া বললেন, এ সময়ে অনেক কিছু চিন্তা করে এগোতে হয়। ধাত্রী এসে বলুক এখন ট্রেনে চলা তোমার পক্ষে সম্ভব কিনা, তারপর আমি তোমাদের বাড়িতে চিঠি লিখবো। যদি সবদিক দিয়ে সুবিধা হয়, তবেই যাওয়ার কথা চিন্তা করা যাবে।
অনসূয়া কিছুমামুলি উপদেশ দিয়ে চলে গেলেন। ঘর থেকে বেরুতে বেরুতে তিনি বললেন, ফুলটা শুকিয়ে গেছে, ঝি-চাকরের এদিকে দৃষ্টি নেই কেন?
.
অনসূয়া কয়েকটি দিন ধরে দেখলেন–এ কখনো প্রকাশ করা চলে না যে, সুমিতির ব্যাপারগুলি তার মনঃপুত হয়নি। নিজের মনেও তিনি অনেক যুক্তির সাহায্যে একয়েকটি দিনে। প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এ সন্তানকে না মেনে নেওয়াটা একটা গর্হিত অন্যায়। সেই যুক্তিগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মহাভারত ও অন্যান্য গ্রন্থের সাহায্য নিতে হয়েছে তাকে।
কিন্তু সে যেন আলো দিয়ে অন্ধকার সরিয়ে রাখা, কৃত্রিম কিছু এই মনোভঙ্গি। হৃদয়কে যুক্তির প্রাবল্য দেখিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে মস্তিষ্কের কাছে মাথা নত করতে। কয়েকদিন আগে এক সন্ধ্যায় অন্য একটি বিষয়ে আলাপ করতে করতে মস্তিষ্ক এবং হৃদয় নিয়ে একটা আলোচনা উঠে পড়েছিলো। রূপু যোগ দিয়ে চূড়ান্ত আপাত সত্যটা বলেছিলো :হৃদয় মানুষকে রক্ত জোগাতে পারে, চালাতে পারে না। সান্যালমশাই মস্তিষ্কের জয় ঘোষণা করেছিলেন; অনসূয়া নিজে যুক্তি দিতে ইতস্তত করলেও বলেছিলেন: মানুষ হৃদয়ের সাহায্যে আহার গ্রহণ করে, গান করে, বন্ধু সংগ্রহ করে। সদানন্দ বলেছিলো: আমি এ কথা হলপ নিয়ে বলতে পারি পৃথিবীর সবগুলি আবিষ্কারের পিছনে আছে হৃদয়। কল্পদ্রষ্টা না হলে, হৃদয়বেগে বেগবান হতে না পারলে গভীর চিন্তা করা যায় বটে, আবিষ্কার বা সৃষ্টি করা যায় না। কথাগুলি নতুন নয়। একখানি ইংরেজি মাসিক পত্রিকায় লেখা সদানন্দর একটি প্রবন্ধে এরকম কথা ছিলো বটে। সে বলেছিলো, মস্তিষ্ক দিয়ে ভূতার্থকে বিশ্লেষণ করা যায়, দুয়ে আর তিনে দশ করা যায় না। হৃদয় এই দশের সংবাদ না দিলে কাব্যও হয় না, কোয়ান্টাম থিয়োরিও না।
অনসূয়া যে চিঠিটা লিখেছিলেন সেটা লেখা হলো না। মৃদুস্বরে দাসীকে ডেকে খবরের কাগজ আনতে বললেন।
কাগজে চোখ রেখে একটি-দুটি খবর নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে অনসূয়া ভাবলেন : এ কী সমস্যা! জীবনের যে স্তরে এসে ভাবা গিয়েছিলো হৃদয়, মস্তিষ্ক ও দেহের একটি সামঞ্জস্য হয়ে গেছে তখনই আবার তরঙ্গ-উৎক্ষেপটা দেখা দিলো। তিনি ভেবেছিলেন সুমিতির এ বাড়িতে আসবার অভিনবত্ব এ কয়েক মাসে পুরনো খবরের কাগজের মতো অনুল্লেখযোগ্য হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক যে সময়টা ধরে সেটা হওয়া দরকার তখন যে তিনি সহজ হয়ে চলেননি তার প্রমাণ যেন সুমিতির অন্তর্বত্নী হওয়ার ব্যাপারে লক্ষ্য না রাখা। হৃদয়বিমুখ না হলে এমন হয় না। তিনি বুদ্ধির সহায়তায় যাকে গ্রহণ করেছেন ভেবেছিলেন, তার বেলাতেই এমন হলো।
দাসী এসে খবর দিলো কর্তাবাবু ডাকছে।
সেই পুরনো স্টাডির রূপগত পরিবর্তন হয়েছে। দেয়ালগিরি অপসারিত, সান্ডেলিয়ার ঝাড়টি অপসৃত নয় কিন্তু অকারণে রয়েছে বলে মনে হয়। অভ্যস্ত চোখে দেয়ালগিরির অভাব যাতে বোধনা হয় সেজন্য পোর্শলেনের প্লেট দেয়াল কেটে বসিয়ে তার আড়ালে অতি নিষ্প্রভ বা থেকে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলোগুলির একটি যেখানে ছবিতে আঁকা চাঁদের কিরণের মতো মরক্কো বাঁধানো ব্লটিং প্যাডের উপরে পড়েছে সেখানে দুটি হাত একত্র করে সান্যালমশাই কথা বলার জন্য প্রস্তুত হলেন। তার বাঁ হাতের তেলোর বড়ো তিলটি এবং ডান হাতেরনীলাটি অনসূয়ার লক্ষ্যে এলো। সান্যালমশাই বললেন, তোমার ধাত্রী এসে যাচ্ছে কাল। চিঠি দিয়েছে। সে তো এখন এখানেই থাকবে?
