তখন তার মনে হলো, এখনই সে স্টেশনে ছুটে যাবে। রেল কোম্পানির যত লোক আছে সকলকে সে জিজ্ঞাসা করবে মাধাই কোথায় গেলো।
কিন্তু দুর্নিবার একটা অভিমানও হলো তার–কেন, চলেই যদি যাবা আমাকে কলেই হতো সেদিন? ঝরঝর করে জল নামলো চোখ থেকে। অন্ধের মতো কিন্তু দ্রুতপায়ে টেপির মায়ের বাড়ির দিকে সে হেঁটে যেতে লাগলো।
কখনো সে নিজেকে দুষলোবেশ হইছে! মাধাই কি হারমোনিওয়ালা!
দুদিন সুরতুন ঘর থেকে বার হলো না। তৃতীয় দিনে টেপির মা ফিরলো।
একা যে?
গোঁসাই ঘর ভোলার জায়গা দ্যাখে।
সে কী! কেন্?
তা শোনো নাই? এদিকে ইটের ভাটা হবি। তার জন্যি না, গোঁসাই কয় সে-জায়গা এর চায়ে ভালো।
ও কী?
আসতে আসতে দেখলাম পথে পড়ে আছে বনবিলাই। নিবি?
কী করবো?
পোষ না কেন।
আহারাদি করে, গোঁসাইয়ের জন্য ভাত নিয়ে টেপির মা চলে গেলো। দুপুরটা সুরতুন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। বনবিড়ালটার সামনের একটা পা ভেঙে গেছে। সেটা ঘরের এক কোণে বসে সুরতুনের দিকে প্যাটপ্যাট করে চেয়ে রইলো। টেপির মায়ের কথা মনে এলো। কোথায় এর চাইতে ভালো জায়গা পেলো কে জানে। এ ঘরগুলির জন্য এতটুকু মোহ আছে বলে মনে হয় না, যদিও হয়তো এর কিছু কিছু অংশ এখান থেকে নিয়ে যেতে পারে তারা। কিংবা যদি সুরতুনের প্রয়োজন হয় এখানে ঘর এমনই থাকবে।
উদাস কথাটা সুরতুন জানে না কিন্তু একটা ঔদাস্যে তার মন ভরে উঠলো। দুপুরের পর একসময়ে চাল আনার ঝোলাটায় তার সামান্য যা সম্বল তা পুরে নিয়ে সুরতুন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো। কোনদিকে যাবে তার কোনো স্থিরতা নেই। _ চলতে শুরু করে তার মনে হলো বনবিড়ালটার কথা। বিস্মৃতপ্রায় অতীতে তার যে বনবিড়াল পুষবার সখ ছিলো তা মনে হলো।
বনবিড়ালটাকে কোলে তুলে নিয়ে সুরতুন বললো, মাদী! তা মিয়েমানুষ হয়ে পরাক্রোম দেখাবের যাওয়া কে?
প্রাণীটি হিংস্র। সেটার আহত পাটাকে বাইকে রেখে অন্য থাবাগুলি চটের থলি দিয়ে ঢেকে নিলো সুরতুন।
২১. কালের হিসাবে তিন-চার মাস
কালের হিসাবে তিন-চার মাস সময় পিছিয়ে গিয়ে সুমিতিদের লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মনসার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে। দু মাসের ছেলেটিকে নিয়ে সে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছে।
অনসূয়া ক্লান্তি বোধ করছেন। তার সংসারে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে কিছুকাল থেকে। সদর থেকে মজুর মিস্ত্রি মিলে প্রায় দশ-পনেরোজন এসেছিলো।চারুর তত্ত্বাবধানে তারা খিড়কির ঘাট থেকে কাছারীর বারান্দা পর্যন্ত বাড়ির যেখানে-সেখানে বাঁশ বেঁধে বেঁধে মেরামত করে বেড়ালো প্রায় পনরো-বিশ দিন। তারা চলে গেলো, এলো একদল উড়ে মিস্ত্রি, প্রায় তাদের সঙ্গে সঙ্গে এলো লোহালক্কড় যন্ত্রপাতি। তাদের কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। তাদের অধিকাংশ চলে গেলেও এখনো কয়েকজন আছে। চারু এদের তত্ত্বাবধান করে না শুধু, এদের কাছে কিছু কিছু কাজও শিখছে। এরা ইলেকট্রিকের এবং জলের কলের মিস্ত্রি। এদের কয়েকজন নাকি ছোটো ডায়নামোটা চালানোর জন্য থেকে যাবে। অন্দরের সেই স্তব্ধ শান্তি আর নেই।
আজ থেকে ঠিক পনেরো দিন আগে এমনি একটি সাময়িক ব্যবস্থার শেষ পর্যায় শেষ হয়েছিলো। গ্রামের ডাক্তারের পরামর্শে সদর থেকে ডাক্তার আর তার পরামর্শে একজন যাত্রী এসেছিলো। সদরের ডাক্তার সপ্তাহে একদিন করে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতো। ধাত্রী একটানা প্রায় তিন মাস ছিলো। সদরের ডাক্তার বেশ জোর দিয়েই বলেছিলো, স্বাস্থ্য কিছু খারাপ তা নয়, আজকাল আমরা অকারণে রিস্ক নিতে চাই না।
ধাত্রী যাওয়ার আগে হাসতে হাসতে বলেছিলো, আবার তো আসতে হবে।কী বলা উচিত সহসা অনসূয়া খুঁজে পেলেন না। সে যে সুমিতিকে ইঙ্গিত করেছে এ তত সহজেই বুঝতে পারা যায়, কিন্তু সুমিতির ব্যাপার কি সত্যি তাই? এ যদি কেউ জানতে পারে যে তিনি চোখের সম্মুখে মেয়েটিকে রেখেও বুঝতে পারেননি তাতে এটাই প্রমাণ হবে এ বাড়ির শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে এমন একটি ব্যবধান আছে যে এমন একটি ব্যাপারও শাশুড়ির চোখে পড়েনি। অনসূয়া কোনো কথায় না গিয়ে বলেছিলেন, যদি রাখি এখানে, তোমাকেই আবার আসতে হবে বৈকি।
কথাটা এখন মনে হলো। এ বাড়ির অন্য কারো মুখে কথাটা উচ্চারিত হওয়ার আগেই তারই মানানো উচিত দু-একজন বর্ষীয়সীকে। তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবে, শুধু তিনি আলোচনাটা কীভাবে গ্রহণ করবেন তা বুঝতে না পেরে হয়তো চুপ করে আছে।
কিন্তু তারও আগে। এটা সুমিতির মর্মপীড়ার কারণ হতে পারে, এই উপেক্ষার ভাবটি। অনসূয়া সুমিতির ঘরে গেলেন।
অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার : তাঁর বাড়ির এই ঘরখানিতে যা নাকি তার নিজের মহলের অঙ্গীভূত, সেটায় আজ প্রায় চার মাস পরে আবার এই এলেন। অথচ এর আগে এটায় সপ্তাহে একবার আসতেন দাসীদের ঝাড়পোঁছের কাজ তদ্বির করতে। ঘরে ঢুকতে গিয়ে সুকৃতির ছবিটিতে চোখ পড়লো প্রথমে। তারপর সুমিতির ছোটো লিখবার টেবিলটিতে। টেবিলটার উপরে দু-তিনখানা বই, তার পাশে একটা জাপানি ভাস-এ একটা লাল গোলাপ রাখা হয়েছে, সুমিতির কলম আর প্যাডের কাছে একটি পোস্টকার্ড সাইজের ফটো। মায়ের চোখ, ফটোতে ছেলের চেহারা আবিষ্কার করার জন্যে ফটোকে তুলে নেওয়ার দরকার হলো না, মাথা নিচু করে দেখতেও হলো না। কিন্তু ফটোতে চেহারা এত অস্পষ্ট যে কখনো কারো তৃপ্তি হতে পারে না। আর গোলাপ ফুলটিও যেন কেমন বিবর্ণ। একটা যেন সংকোচের ভাব কোথাও ছড়ানো রয়েছে।
